আদিম অর্থনীতি ও শ্রেণীর উৎপত্তি

খায়রুল হাসান জাহীন

বহু প্রাচীন এই পৃথিবীতে টিকে থাকার সংগ্রামে হারিয়ে গেছে বহু প্রানীর অস্তিত্ব। অস্তিত্বের এই লড়াইয়ে মানুষ সবচেয়ে লড়াকু জীবদের মধ্যে একটি। মানুষের দৈহিক গঠন, বুদ্ধির চর্চা অন্যান্য প্রানীর চেয়ে উন্নত হওয়ায় প্রতিকূল প্রকৃতির সাথে লড়াই করে টিকে থাকা অনেকটাই সহজতর হয়েছে। কিন্তু মানুষ যে সব সময় নিজের স্বাভাবিক অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ব্যবহার করেই নি জেদের অবস্থার উন্নতি করেছে তা নয়। নিজেদের হাতের কাজকে আরো সহজ করতে মানুষ ব্যবহার করেছে কৃত্রিম হাত অর্থাৎ, হাতিয়ার।
একদম শুরু থেকেই অবশ্য হাতিয়ারের ব্যবহার হয়নি। হাইডেলবার্গ মানুষেরা হাতের কাছে যা খাদ্য পেতো তাই খেতো। যদিও বা কখন লাঠি বা এ জাতীয় কোনো হাতিয়ার ব্যবহার করা হয়েছে সেটাও একদম Raw ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। হাতিয়ারে বিশেষ কোনো পরিবর্তন তখন আনতে পারতো না হাইডেলবার্গ মানুষ। 

হোমো হাইডেলবার্গ মানুষ

দ্বিতীয় আর তৃতীয় বরফ যুগে (আইস এজ) মানুষ খুব বেশী উন্নতি করতে পারেনি। প্রকৃতির কাছে এক রকম অসহায় ছিলো মানুষ। এই যুগে মানুষ কোনো হাতিয়ারও তৈরী করতে পারেনি। তৃতীয় আর চতুর্থ আইস এজের মাঝখানে মানুষ হাতিয়ার বানাতে শিখে। আর তখন থেকেই মানুষের জীবনে পরিবর্তনের শুরু।
মানুষের প্রথমও হাতিয়ার পাথর। অন্য পাথরে পাথর ঘসে তাকে মসৃণ করে ব্যবহার করতো মানুষ। জানা যায়, মানুষের প্রথম হাতিয়ারটি ছিলো বড়সড় বাদামের মত। এটি দিয়ে আঘাত করা যেতো, ঘা মারা যেতো, কাটা যেতো আবার হাতলে লাগিয়ে জিনিসটাকে আরো উন্নত করা যেতো। হাতিয়ারের এই আবিষ্কার মানুষের জীবন-যাত্রায় স্বচ্ছন্দ এনে দিলো। উৎপাদনের পরিমাণ বেড়ে গেলো।
হাতিয়ার হাতে মানুষ শিকার ও ফলমূলের সন্ধানে জঙ্গলে ঘুরে বেড়াতো। রক্তের সম্পর্ক যাদের মধ্যে ছিলো, তাদের নিয়ে এক একটা ট্রাইব গঠিত হত। শিকার করা বাদেও তাদের দলবদ্ধ হয়ে থাকার প্রধান অনুপ্রেরণা ছিলো নিরাপত্তা।
এইসব দলগুলোর সদস্যরা নিজেদের মধ্যে একজনকে দলনেতা ঠিক করে নিতো। সে শিকার বা ফলমূল সংগ্রহে কার কী ভূমিকা হবে তা ঠিক করে দিত। শিকারে যেতো দলের বয়স্ক পুরুষেরা। মেয়েদের কাজ ছিলো ফলমূল আহরণ, খাবার তৈরী, শিশুদের যত্ন নেয়া। অর্থাৎ, শ্রম বিভাগের কিছুটা এই সমাজেও ছিলো। মানব সমাজের প্রথম শ্রম বিভাগ তাই ছিলো নারী আর পুরুষের মধ্যে।
পুরুষেরা শিকার করে আর নারীরা ফলমূল সংগ্রহ করে যা পেতো তা ছিলো সবার সম্পত্তি। দিনশেষে সবাই মিলে তাই খেতো। প্রতিদিনের খাবার পাওয়া ছিলো অনিশ্চিত। দেখা যেতো কোনো দিন প্রচুর খাবার থাকে, কোনো দিন একেবারে শূন্য। যেদিন বাড়তি খাবার হতো সেদিনের খাবার থেকে কিছু সঞ্চয় করে রাখাও সম্ভব ছিলো না। আদিম শিকারীদের এই যৌথজীবনের ভিত্তি ছিলো সমতা। একে আমরা বলি আদিম কমিউনিস্ট উৎপাদন প্রণালী।
এই সমাজের মধ্যে আমরা যেসব বৈশিষ্ট্য পাই তা হলো-

• প্রথমত, সবাই মিলে উৎপাদন করতো।
• দ্বিতীয়ত, সবাই মিলে ভোগ করতো।
• তৃতীয়ত, কোনো রকম শ্রেণিভেদ ছিলো না।
• চতুর্থত, কোনো কিছু সঞ্চয় করাও সম্ভব ছিলো না।

কিন্তু মানুষের এই সমাজব্যবস্থা খুব বেশীদিন টিকলো না। আদিম সমাজের মানুষেরা নতুন নতুন হাতিয়ার তৈরী করতে শিখলো। পাথরের বর্শা, কোদাল এবং কাঠের তীর-ধনুকের আবিষ্কার শিকারকে আরো সহজ করে দিলো। নিয়েনডারথেল মানুষেরা আগুনের ব্যবহার শিখে। এই আগুন তারা বনের মধ্যে ঘটে যাওয়া দাবানল থেকে সংগ্রহ করতো। আগুন জ্বালানো তারা তখনো শিখেনি।

হোমো নিয়েনডারথেল মানুষ

নতুন হাতিয়ার আর আগুন মানুষের জীবনকে আরো বদলে দেয়। তখন মানুষ আর কাঁচা মাংস খেতো না, পুড়িয়ে খেতো। বাসস্থান বানানো শিখলো, পরিধেয় বস্ত্রও তৈরী করলো। নতুন হাতিয়ার মানুষকে বড় শিকার ধরার পথও দেখিয়ে দিলো।
বড় শিকার ধরা মুষ্টিমেয় কয়েকজনের পক্ষে সম্ভব না। তাই প্রতিবেশীরা এই বড় শিকার ধরতে গিয়ে প্রথমে সাময়িক পরে স্থায়ী জোট বাঁধে। এইভাবে পাঁচ-ছয়টি ছোট ছোট যৌথ সমাজের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে গোষ্টী। গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত প্রত্যেকটি একক সমাজকে বলা হয় টোটেম।

টোটেম সমাজই বিয়েকে নিয়ন্ত্রণে আনে। আদিম সমাজে যে কোনো পুরুষ একাধিক নারীকে ও যেকোনো নারী একাধিক পুরুষকে বিয়ে করতে পারতো। একই টোটেমের নারী-পুরুষের মধ্যে বিয়ে নিষিদ্ধ ছিলো। একই গোষ্ঠীর অন্তর্ভূক্ত দুই টোটেমের মধ্যে বিয়ের নিয়ম ছিলো। এতে করে টোটেম ব্যবস্থা শক্ত ভিত্তির ওপর দাঁড়ায়। বলে রাখা ভালো যে, টোটেম সমাজে বৃদ্ধদের বিশেষ সম্মান দেয়া হত। তাদের অভিজ্ঞতা ও শিকারের কৌশল জানা থাকার কারণে তারা এই বিশেষ সম্মান পেতো। আর টোটেমের বিভিন্ন রীতি-নীতি গুলো তারাই তৈরী করত।

চতুর্থ আইসএজের পর উৎপাদন ব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন দেখা যায়। বহু অতিকায় প্রাণী নির্বংশ হয়ে যায়, কিছু প্রাণী আফ্রিকার দিকে চলে যায়। বরফ গলায় প্রচুর হ্রদের সৃষ্টি হয়। তাই সে সময় বনের জীব-জন্তুর চেয়ে মাছের পরিমাণ বেড়ে যায়। বহু যৌথ সমাজ পশু শিকার ছেড়ে মাছ শিকার করা শুরু করে।

আদিম মানুষ শিকারী থেকে জেলে হয়ে যাওয়ায় তাদের আর ঘুরে বেড়ানোর প্রয়োজন হলো না। এক জায়গাতেই মাছ পাওয়া যাওয়ায় স্থায়ী ভাবে বসতি গড়ে ওঠে। এ সময় মানুষ কৃষি ও পশুপালন শুরু করে। স্থায়ী বসতির এই সমাজে পরিবারের বন্ধন সুদৃঢ় হয়ে ওঠে। গড়ে ওঠে মাতৃতান্ত্রিক সমাজ।

আদিম সমাজের মেয়েরা ধীরে ধীরে কৃষি ও বুননের আবিষ্কার করে। মাটির তৈরী বাসনও প্রথমও মেয়েরাই তৈরী করে। শিকারী সমাজে, নারীরা ছিলো পুরুষের সহকারী। এই সমাজে নারীরা হয়ে ওঠে স্বাধীন কর্মী। মুখ্য উৎপাদন কার্যক্রম তখন ছিলো মেয়েদের হাতে।
মাতৃতান্ত্রিক সমাজে সকলে মিলে উৎপাদন করত। পুরুষেরা একসাথে মাছ ধরতে যেত, মেয়েরা সমবেত শ্রমে চাষ করতো। যে খাদ্য তৈরি হত তা সকলে মিলে খেতো। উৎপাদন যত বাড়তে থাকে শ্রম বিভাগও ততো বাড়তে থাকে। এক সময় আবিষ্কার হলো লাঙ্গল। লাঙ্গল আবিষ্কারের আগে মেয়েরা নিড়ানি দ্বারা চাষ করত। ফলে খুব বড় আকারে কৃষিজ উৎপাদন হতো না। লাঙ্গল আবিষ্কার কৃষিজ উৎপাদন বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু লাঙ্গল দিয়ে কৃষি কাজে প্রচুর শ্রমের প্রয়োজন হয়। তাই কৃষিকাজে ধীরে ধীরে পুরুষের অংশগ্রহণ বাড়তে লাগলো। পুরুষের শ্রমের গুরুত্ব বেড়ে যাওয়ায় মাতৃতান্ত্রিক সমাজ আর রইল না। গড়ে ওঠলো পিতৃতান্ত্রিক সমাজ।

মেয়েরা দলবদ্ধ হয়ে চাষ করছে

সকল আদিম শিকারী অবশ্য কৃষিকাজ যুক্ত হয়েছিলো না। অনেক সমাজের প্রধান পেশা ছিলো পশুপালন। পশুপালকেরা যাযাবরের মত ঘুরে বেড়াত। পশুপালক সমাজে উৎপাদন হতো প্রচুর দুধ, মাংস, চামড়া। পশু পালক সমাজ এসব বিনিময় করতো কৃষিভিত্তিক সমাজের সাথে। এভাবেই ব্যবসা বাণিজ্যের শুরু।

পুরুষেরা শিকার করে আনছে।

পশু পালন সমাজে ছিলো পিতৃকর্তৃত্ব। সেখানে মেয়েদের ভাবা হত সহকারী হিসেবে। পুরুষেরা এরকম একাধিক সহকারী চাইতো, তাই পশু পালন সমাহে পুরুষের মধ্যে বহুবিবাহ প্রথা চালু ছিলো। এই সমাজে পরিবার গুলো ছিলো বড় আকৃতির। পশু গুলো ছিলো সমাজের পরিবারের যৌথ সম্পত্তি। বড় পরিবার থেকে ছোট ছোট পরিবার করে বের হয়ে তাদের মধ্যে খাদ্য ভাগ করে দেয়া হত।
ধাতুর আবিষ্কারে শ্রমের উৎপাদন শক্তি বেড়ে গেল। ধাতুর তৈরী অস্ত্র হালকা, সহজে গলানো যায়, ঢালাই দেয়া যায়। ধাতুর ব্যবহারে উৎপাদনে বাড়তি অংশের পরিমাণ আরও বৃদ্ধি পায়।মানুষের প্রথম ধাতব হাতিয়ার ছিলো তামার। কারণ, তামা প্রায় ভূপৃষ্ঠেই পাওয়া যেতো। পরবর্তীতে তামার সাথে টিন ও সীসা মিশিয়ে বেশ শক্ত আর মজবুত ধাতু ব্রোঞ্জ তৈরী করা হয়।

কৃষি সমাজ ও পশুপালক সমাজ, উভয়ের মাঝেই কিছু অসমতা গোড়া থেকেই ছিলো। কৃষির যখন নতুন কোনো জমি খুঁজে পাওয়া যেতো তখন সব পরিবারের মধ্যে এমন ভাবে জমি বন্টন করা সম্ভব ছিলো না যে সকলেরই উর্বর জমি পড়বে। সাধারণত, মূল পরিবার থেকে বের হয়ে যাওয়া ছোট পরিবার গুলোতে অনুর্বর জমি গুলো পড়তো। এভাবেই ছোট পরিবার, বড় পরিবার, ধনী পরিবার, গরীব পরিবারের সৃষ্টি হয়। কোনো কারণে ফসল নষ্ট হলে ছোট ও গরীব পরিবার গুলোর অবস্থা খারাপ হয়ে যেত।

পশুপালক সমাজেও একই চিত্র দেখা যায়। সকল পরিবারের চারণ ভূমি একই রকম হওয়া সম্ভব ছিলো না। ফলে কারো পশু ছলো বেশী সবল, স্বাস্থ্যবান, কারোর বা দূর্বল। দ্রব্যাদি বিনিময় শুরু হলে পরিবারগুলোর মধ্যে অসমতা আরো স্পষ্ট হয়। যেসব পরিবারের নিজেদের প্রয়োজনের অতিরিক্ত পশু বা পশুজাত দ্রব্যাদি ছিলো কেবল তারাই বিনিময় করতে পারতো। গরিব পশুপালক পরিবারগুলো নিজেদের মধ্যে বিনিময় করে যথেষ্ট কৃষিজাত বা অন্যান্য দ্রব্য সংগ্রহ করতে পারতো না।

ব্রোঞ্জের হাতিয়ারের ব্যবহার অসমতাকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছিল। পাথর সব জায়গাতেই পাওয়া যাওয়ায়, পাথরের হাতিয়ার তৈরি ছিলো সহজ। কিন্তু তামা সকল জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই যাদের হাতে তামা ছিলো তারা প্রচুর সম্পদশালী হয়ে ওঠলো। ধীরে ধীরে জমিজমা, পশুর ওপর ব্যক্তি মালিকানা সৃষ্টি হল। সম্পদশালীরা অন্যদের খাটাতে শুরু করলো। দুই ট্রাইবের মধ্যে যুদ্ধ হলে জয়ী ট্রাইবের লোকের পরাজিতদের দিয়ে নিজেদের কাজ করিয়ে নেয়া শুরু করলো। এভাবেই সমাজে দুটো শ্রেণী তৈরী হলো, মনিব আর গোলাম

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

[স্কুল-কলেজ পড়ুয়াদের অর্থনীতির বিদ্যা নিয়ে আগ্রহ তৈরী করার জন্য কাকাড্ডার অর্থনীতি সিরিজে প্রকাশিত লেখাগুলোতে ড. নীহার কুমার সরকার রচিত ছোটদের অর্থনীতি, এডাম স্মিথের The Wealth of the Nations, ডমিনিক স্যালভেতরের মাইক্রোইকোনমিক্স থিওরী, রেবতী বর্মণের সমাজ ও সভ্যতার ক্রমবিকাশ সহ অন্যান্য অন্তর্জালিক আঙ্গিনার সাহায্য নেয়া হয়েছে।]

 

Leave a Reply