এনার্কি ১০১

মূল: বব ব্ল্যাক। মূল লেখাটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন।

লেখাটি ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্সের আওতাধীন। অবাণিজ্যিক যেকোনো উদ্দেশ্যে বিতরণযোগ্য

 

“নৈরাজ্যবাদ” কি? “নৈরাজ্য” কি? কারা “নৈরাজ্যবাদী”?
নৈরাজ্যবাদ হল সবথেকে ভালোভাবে বাঁচার কৌশল সম্পর্কিত একটা ধারণা। নৈরাজ্য একটা জীবনযাপন পদ্ধতি।
সরকার বা রাষ্ট্র হল অপ্রয়োজনীয় এবং ক্ষতিকর সংগঠন – এই ধারণাই নৈরাজ্যবাদ। নৈরাজ্য হল সরকার বিহীন সমাজব্যবস্থা। নৈরাজ্যবাদীরা হলেন নৈরাজ্যবাদে বিশ্বাসী মানুষ যারা আমাদের পূর্বপুরুষদের মতোই নৈরাজ্যে বাস করতে চান। যারা সরকারব্যবস্থায় আস্থা রাখেন (যেমন: উদারপন্থী, রক্ষণশীল, সমাজতন্ত্রী এবং ফ্যাসিস্ট) তাদের বলা হয় “রাষ্ট্রপন্থী।”
আপনাদের মনে হতে পারে নৈরাজ্য সম্পূর্ণ নেতিবাচক একটা ধারণা – হয়তো সবকিছুরই বিরুদ্ধাচরণ। আসলে, নৈরাজ্যবাদীদের জীবনযাপন ও রাষ্ট্রহীন সমাজ নিয়ে বহু ইতিবাচক চিন্তা আছে। কিন্তু, মার্ক্সবাদী, উদারপন্থী বা রক্ষণশীলদের মতো তাঁদের কোনো ব্লুপ্রিন্ট নাই।

এনার্কিস্টরা কি বোমাবাজ নয়?
না। অন্তত, আমেরিকান সরকারের মত নয়। তারাতো প্রতিদিন ইরাকে যে পরিমাণ বোমা ফেলে, গত ১৫০ বছরের রাজনৈতিক আন্দোলনের ইতিহাসে এনার্কিস্টরা অতো বোমা মারেনি। তাহলে আমরা “প্রেসিডেন্টরা বোমা মারে” এরকম বলতে শুনিনা কেন? তাহলে কি নৈরাজ্যবাদীদের ছুঁড়ে মারা বোমের থেকে আমেরিকা সরকারের উপর থেকে ফেলা বোমের প্রতি কোনো আলাদা সহর্মিমতা আছে?
বহু দেশে স্বৈরাচারী বা গণতান্ত্রিক সরকারের শাসনের মধ্যেই নৈরাজ্যবাদীরা বহুকাল ধরে সক্রিয় আছেন। কখনো কখনো, বিশেষত চরম নিপীড়িত হয়ে নৈরাজ্যবাদীরা বোমা মেরেছেন। কিন্তু, সেসবই ব্যতিক্রম। অথচ, “নৈরাজ্যবাদীরা বোমামাজ”, পুরো ঊনিশ শতক ধরে এই তকমা দিয়ে গেছেন রাজনীতিক এবং সাংবাদিকরা এবং, আজও তারা এসব বলা ছাড়েননি। কিন্তু, তখন থেকে সেসব অতিশয়োক্তিই ছিলো।

কোনো কার্যকর নৈরাজ্যবাদী সমাজের অস্তিত্ব কি আদৌ কখনো ছিল?
হ্যাঁ, এরকম অগুণতি উদাহরণ আছে। মানব ইতিহাসের শুরুতে মিলিয়ন বছরেরও বেশী কালব্যাপী তারা ছোট ছোট দলে কোনোরকমের শাসনতান্ত্রিক স্তর বা অধিকর্তা ছাড়াই সমান মর্যাদায় শিকার সংগ্রহ করে জীবনযাপন করতো। এরা আমাদের পূর্বসুরী। নৈরাজ্যবাদী সমাজ নিশ্চয়ই সফল হয়েছিল নয়তো, আমরা আজ এই পর্যায়ে আসতাম না। রাষ্ট্রের উৎপত্তি মাত্র হাজারখানেক বছর আগে, এবং, এই ধারণা স্যান, পিগমি এবং অস্ট্রেলিয়ান আদিবাসীদের মত সমাজব্যবস্থাকে দমিয়ে দিয়েই প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল।
কিন্তু আমরা তো আর আগের জীবনব্যবস্থায় ফিরে যেতে পারি না…
প্রায় সকল নৈরাজ্যবাদীই হয়তো এটা স্বীকার করবেন। কিন্তু, এটা আমাদের চোখ খুলে দেয়। অপরাপর নৈরাজ্যবাদীদেরও ইশারা দেয়। আমরা এইসব সমাজকে পর্যবেক্ষণ করতে পারি এবং কিছু কিছু ধারণাকে হয়তো গ্রহণও করতে পারি। তাহলে আমরা বুঝতে পারব কেমন করে একটা স্বাধীন, ব্যক্তিপ্রধান অথচ সহযোগিতাপূর্ণ সমাজব্যবস্থা চলতে পারে। যেমন ধরুন, আদিম নৈরাজ্যবাদী সমাজের লোকজন বেশীরভাগ সময়ই নিজেদের মধ্যকার ঝগড়া-বিবাদ আপোষ-মধ্যস্থতা বা বাধ্যবাধকতা বিহীন সালিসের মাধ্যমে মীমাংসা করতো। তাদের এই পদ্ধতি আমাদের আইনী ব্যবস্থার চেয়েও বেশী কার্যকরী কারণ, এতে বিবাদমান দুই পক্ষের পরিবার, বন্ধুবান্ধব ও প্রতিবেশীরা মীমাংসার সিদ্ধান্তকে মেনে নিতে সাহায্য করতে পারতো, সমস্যার যৌক্তিক সমাধান পেতে তারা সমব্যথী ও বিশ্বাসযোগ্য মানুষের মাধ্যমে মধ্যস্থতার সুযোগ পেত। সত্তর ও আশির দশকে বিশেষজ্ঞ একাডেমিশিয়ানরা এই পদ্ধতিকে আমেরিকান আইন ব্যবস্থায় চালু করার চেষ্টা করেন। স্বাভাবিকভাবেই সেই উদ্যোগ টিকলো না, কারণ, এসব তো শুধুমাত্র একটা মুক্ত সমাজেই টেকা সম্ভব।

নৈরাজ্যবাদীরা বোকা; তারা মনে করে মানুষের চরিত্র মূলত ইতিবাচক…
বিষয়টা সেরকম নয়। একথা সত্য যে, নৈরাজ্যবাদীরা আদিপাপ বা সহজাত ভ্রষ্টাচারের ধারণাকে গ্রহণযোগ্য মনে করেন না। ওসব ধর্মীয় ধারণা, যা বেশীরভাগ মানুষই আর বিশ্বাস করে না। কিন্তু, নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন মানবচরিত্র মূলত ইতিবাচক, বিষয়টা সবসময় সেরকম নয়। একজন মানুষ যেমন, নৈরাজ্যবাদীরা তাকে তেমনভাবেই বিবেচনা করেন। মানুষ “মূলত” কোনো নির্দিষ্ট চরিত্রের নয়। আমরা, যারা পুঁজিবাদ ও এর অনুকূল রাষ্ট্রব্যবস্থার ভিতরে বাস করছি, আসলে সেইসব মানুষ যারা কখনোই নিজেরা যা চাই তা হতে পারার সুযোগ পাইনি।
নৈরাজ্যবাদীরা তেমনি করে মানুষের নৈতিকতাবোধকেই অনেক সময় বেশী প্রাধান্য দিয়ে থাকেন, ঠিক যেমনি করে তারা নিজেকে সমৃদ্ধ করার দিকেও প্রাধান্য দিয়ে থাকেন। নৈরাজ্যবাদ কোনো আত্মোৎসর্গের মতবাদ নয়, যদিও নৈরাজ্যবাদীরা নিজেদের বিশ্বাসের কারণে লড়েছেন এবং মৃত্যুকে বরণ করেছেন। নৈরাজ্যবাদীরা মনে করেন তাঁদের মৌলিক ধারণাগুলো সকলের জন্যই হয়তো হিতকর হবে।

রাষ্ট্রের হাতে অপরাধ নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা না থাকলে আমরা কেমন করে বিশ্বাস করব যে অপর মানুষ একে অপরের ক্ষতি করবে না?
আপনি যদি সাধারণ মানুষের উপরেই বিশ্বাস না রাখতে পারেন যে তারা পরস্পরের ক্ষতি করবে না, কেমন করে আপনি রাষ্ট্রের উপরে বিশ্বাস করবেন যে, সে আমাদের সকলের ক্ষতি করবে না? সাধারণ মানুষ কি শাসকের চেয়েও কম নিঃস্বার্থ, নিবেদিতপ্রাণ বা যোগ্যতর নয়? আবার, আপনি সহনাগরিকদের যত বেশী অবিশ্বাস করবেন, আপনার নৈরাজ্যবাদী হওয়ার সম্ভাবনা ততোই বেড়ে যাবে। নৈরাজ্যবাদে ক্ষমতার পরিণত বিকেন্দ্রীকরণ হয়। এতে প্রত্যেকেরই কিছু ক্ষমতা থাকে, কিন্তু কারোরই অতিরিক্ত ক্ষমতা থাকে না। কিন্তু রাষ্ট্রব্যবস্থায় ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় এবং বেশীরভাগ মানুষের কাছেই আসলে কোনো ক্ষমতা থাকে না। তাহলে এবার বলুন, কোন ধরণের ক্ষমতাতন্ত্রের বিপরীতে আপনি দাঁড়াবেন?

কিন্তু – চলুন বাস্তবতায় ফিরি – যদি পুলিশ না থাকে তাহলে কি হবে?
নৈরাজ্যবাদী এলেন থর্নটনের মত হল, “পুলিশের কাজ নিরাপত্তা দেওয়া নয়; তাদের কাজ আসলে প্রতিশোধ নেওয়া।” আমাদের অবশ্যই ব্যাটম্যানের স্টাইলে অপরাধ দমন করে বেড়ানোর ধারণা নিয়ে থাকলে চলবে না। পুলিশের টহলদারী অপরাধ ও অপরাধীদের দমিয়ে রাখে না। কানসাস এবং তার আশেপাশের এলাকায় একবার গোপনে পুলিশী টহলদারী কমিয়ে দেওয়া হল। কিন্তু, দেখা গেল অপরাধের মাত্রা আগের মতোই থাকলো। অপর একটি গবেষণায় দেখা যায়, গোয়েন্দা নজরদারী, অপরাধ গবেষণাগার এইসবের আসলে অপরাধ কমানোর উপরে কোনো প্রভাব নাই। কিন্তু যেসব এলাকার মানুষেরা একাট্টা হয়ে একে অপরকে অপরাধীদের সম্পর্কে সতর্ক করতে শুরু করল সেখানকার অপরাধীরা সাধারণত এমন এলাকায় চলে যায় যেখানে শুধুমাত্র পুলিশের টহলদারী থাকে। কারণ, অপরাধীরা জানে যে তারা ঐসমস্ত এলাকাতেই বেশী নিরাপদ।

কিন্তু আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থা আমাদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের প্রায় সব কাজের সঙ্গেই তো রাষ্ট্রের কোনো না কোনো সংশ্লিষ্টতা আছে।

এটা সত্য। কিন্তু, আপনি এভাবেও ভাবতে পারেন, প্রতিদিনের জীবনযাপনের সবটুকুই তো প্রায় নৈরাজ্যকর। পুলিশের মুখোমুখি আমরা কে-ই বা পড়তে চাই, ওই ওভারস্পিডের জন্য টিকেট না ধরিয়ে দিলে? স্বাধীন চুক্তি আর বোঝাপড়াই তো প্রায় সবখানে চলে। নৈরাজ্যবাদী রুডল্ফ রকার বলেছেন, “এমনকি চরম স্বৈরতন্ত্রের মধ্যেও মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্কগুলো স্বাধীন চুক্তি আর পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই চলে। এছাড়া সামাজিক জীবনযাপন সম্ভবই নয়।”
পারিবারিক জীবন, বেচাকেনা, বন্ধুত্ব, ধর্মাচরণ, যৌনতা এবং বিশ্রাম সবই নৈরাজ্যবাদী। কর্মক্ষেত্রকেও বেশীরভাগ নৈরাজ্যবাদী রাষ্ট্রের মতোই দমনমূলক জায়গা বলে মনে করেন। কিন্তু সেখানেও শ্রমিকেরা বসের মাতব্বরী ছাড়াই পরস্পরকে প্রবলভাবে সাহায্য-সহযোগিতা করে থাকেন। কারণ, এতে কাজের চাপটা যথাসম্ভব কমিয়ে সেটাকে শেষ করা যায়। কেউ কেউ তারপরেও বলতে পারেন নৈরাজ্য আসলে কার্যকরী কিছু নয়। কিন্তু, নৈরাজ্যই বলা যায় একমাত্র জিনিস যা আসলে কার্যকরী। রাষ্ট্র এবং তার অর্থনীতিই বরং নৈরাজ্যের মধ্যে জবরদস্তি করে আরামে বসে থাকতে চায়।

সংস্কৃতি?

বহু সৃষ্টিশীল মহাত্মাগণ নৈরাজ্যবাদ দ্বারা আকৃষ্ট হয়েছেন। তাঁরা আমাদের সংস্কৃতিকে সমৃদ্ধ করেছেন। পার্সি বিসি শেলী, উইলিয়াম ব্লেক, আর্থার রিমবড এবং লরেন্স ফেলিংগেসি’র মত কবিরা নৈরাজ্যবাদী ছিলেন। আমেরিকান প্রবন্ধকারদের মাঝে নৈরাজ্যবাদী ছিলেন হেনরি ডেভিড থোরো। এবং, বিংশ শতাব্দীর ক্যাথলিক অরাজবাদী ডরোথি ডে,পল গুডম্যান এবং এলেক্স কমফোর্ট (‘দ্য জয় অফ সেক্স’ এর রচয়িতা)। ভাষাতত্ত্ববিদ নোম চমস্কি, ইতিহাসবেত্তা হওয়ার্ড জিন, নৃবিজ্ঞানী এ.আর র‍্যাডক্লিফ ব্রাউন এবং পিয়েরে ক্লাস্টার্সের মতন পণ্ডিত ব্যক্তিরা নৈরাজ্যবাদী। নৈরাজ্যবাদী সাহিত্যিকের সংখ্যা অনেক, কিন্তু তাদের মাঝে লিও টলস্টয়, অস্কার ওয়াইল্ড, মেরী শেলীর ( ‘ফ্র‍্যাঙ্কেস্টাইন’ এর রচয়িতা) কথা না বললেই নয়। নৈরাজ্যবাদী চিত্রকরদের মধ্যে আছেন গুস্তভ করবেট, জর্জ স্যুরাট, ক্যামিলি পিসারো এবং জ্যাকসন পোলক। এছাড়াও অন্যান্য নৈরাজ্যবাদী শিল্পীদের মধ্যে আছেন জন কেজ, জন লেননের মত সঙ্গীতজ্ঞরা আর, CRASS নামক ব্যান্ডটির কথাও বলা যায় এ তালিকায়।

ধরে নিলাম আপনার কথাই ঠিক। নৈরাজ্য আমাদের বর্তমান জীবনযাপন পদ্ধতির চেয়ে অধিক শ্রেয়। কিন্তু, আমরা রাষ্ট্রব্যবস্থার পতনই বা কিভাবে ঘটাবো,যদি এটা এতই কঠোর, ক্ষমতাশালী হয়ে থাকে?
নৈরাজ্যবাদীরাও এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছেন। কিন্তু, তারা কোনো নির্দিষ্ট, সরল সমাধানে পৌঁছতে পারেননি। ১৯৩৬ সালে স্পেনে দশ লক্ষ নৈরাজ্যবাদী ছিল। তখন সেখানে এক সামরিক অভ্যুত্থান হল। সে সময় নৈরাজ্যবাদীরা যেমন এই ফ্যাসিস্টদের সাথে মুখোমুখি লড়াই করেছে, তেমনি শ্রমিকদেরও সাহায্য করেছে কারখানার দখল নিতে। কৃষকদের পক্ষ নিয়েছে, তাদের চাষের জমিতে অধিকার বুঝে নিতে। নৈরাজ্যবাদীরা এই একই কাজ করেছে ১৯১৮-১৯২০ সালে, ইউক্রেনে। সেখানে তাদেরকে জারিস্ট, কম্যুনিস্ট উভয় পক্ষের সাথেই লড়াই করতে হয়েছে। অবশ্য, এসব উপায়ের কোনোটাই আর এই একবিংশ শতাব্দীতে সরকারব্যবস্থার পতন ঘটাতে পারবেনা।
পূর্ব ইউরোপে সমাজতন্ত্রের পতনের ঘটনাটা চিন্তা করে দেখুন। নানান ধরণের সহিংসতা এবং হত্যার ঘটনা সেখানে ঘটেছে। কিছু দেশে তো অন্যদের তুলনায় বেশীই ঘটেছে। কিন্তু, শুধুমাত্র বেশীরভাগ মানুষের এই পচে যাওয়া ব্যবস্থাকে টিকিয়ে না রাখার ইচ্ছাই বড় বড় রাজনীতিবিদ, সেনাবাহিনী ও আমলাতন্ত্রকে (বলা যায় আগেকার শত্রুরাই) নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল। মস্কো বা ওয়ারশ’র রাজনৈতিক নেতাদের কিই বা করার ছিল? জনগণের ওপর বোমাবাজি করে কুল পেতো তারা? শ্রমিকদেরকে মেরে ফেলে রেহাই পেতো ভেবেছেন?
অধিকাংশ নৈরাজ্যবাদী মনে করেন, ওই এক হরতালই সরকারব্যবস্থাকে গুঁড়িয়ে দিতে বিশাল ভূমিকা রেখেছিল। এটা হল আসলি গণ-অসহযোগ আন্দোলন।

আপনি যদি সরকারব্যবস্থার বিরুদ্ধে হন, তাহলে নিশ্চয়ই গণতন্ত্রেরও বিরুদ্ধে?

গণতন্ত্র মানে যদি এটা হয় যে, মানুষ নিজেই তার জীবন স্বাধীনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারবে, তাহলে নৈরাজ্যবাদীরা হত, যেমনটা বেঞ্জামিন টাকার বলে থাকেন, “অকুতোভয় জেফারসনিয়ান ডেমোক্রেট”। তবে, তারাই হত প্রকৃত গণতান্ত্রবাদী। কিন্তু, গণতন্ত্র আদতে মোটেও এরকম নয়। বাস্তবে, কিছু সংখ্যক জনগণ (আমেরিকার ক্ষেত্রে বলা যায়, জনগণের একটি ক্ষুদ্র অংশ) মুষ্টিমেয় কিছু রাজনীতিবিদকে নির্বাচিত করে, যারা কিনা জনগণের মতামতের কোনো তোয়াক্কা না করেই নানা আইন প্রণয়ন করে, আমলা আর পুলিশ দিয়ে মানুষের উপর সেসব আইন প্রয়োগ করে।
যেমনটা ফরাসি দার্শনিক রুশো (ইনি কিন্তু নৈরাজ্যবাদী নন) লিখেছিলেন, গণতন্ত্রে, কেবলমাত্র ভোটের সময়ই জনগণ স্বাধীন, বাকিটা সময় তারা সরকারের দাস। এইসব রাজনীতিবিদ এবং আমলারা সবসময় বড় বড় ব্যবসায়ী এবং অন্যান্য স্বার্থান্বেষী মহলের শক্তিশালী প্রভাব বলয়ের ভিতর থাকে। সকলেই এসব জানে। কিন্তু, কিছু মানুষ চুপ করে থাকে কারণ, তারাও এসব ক্ষমতাবানদের থেকে কিছু সুযোগ সুবিধা পেয়ে থাকে। আর বাদবাকি বেশীরভাগ মানুষই কোনো প্রতিবাদ করে না কারণ, তারা জানে এতে কোনো লাভ নাই। বরং, তাদেরকে রাষ্ট্র “প্রতিক্রিয়াশীল” বা “নৈরাজ্যবাদী” আখ্যা দিয়ে ফেলতে পারে! হায় গণতন্ত্র!

আচ্ছা, আপনি যদি প্রতিনিধিই নির্বাচিত না করেন, তাহলে সমাজের হয়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে কে? আপনি নিশ্চয়ই আমাকে বলবেন না যে, মানুষ অন্যের কথা বিবেচনায় না নিয়ে নিজের খুশীমত কাজ করে যেতে পারবে?

সত্যিকারের সহযোগীতাপূর্ণ স্বতঃস্ফূর্ত সমাজে কোন প্রক্রিয়ায় সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হবে, তা নিয়ে নৈরাজ্যবাদীদের নানা মত রয়েছে। তবে বেশীরভাগ নৈরাজ্যবাদীই এই মত দেন যে, এই ধরনের সমাজব্যবস্থা স্থানীয় কম্যুনিটি ভিত্তিক হওয়া উচিত। কম্যুনিটিগুলো হবে যথাসম্ভব ছোট, যাতে সকলের সঙ্গে সকলের জানাশোনা থাকে। অথবা, তারা যেন অন্তত পরিবারিক বন্ধন, বন্ধুত্ব, মতামত এবং আগ্রহের জায়গাগুলো কম্যুনিটির সকলের সাথে ভাগাভাগি করে নেওয়ার সুযোগ পায়। যেহেতু এসব হল স্থানীয় কম্যুনিটি, তাই তারা নিজেদের কম্যুনিটি ও এর পরিবেশ সম্পর্কে নিজেদের ভাবনা ও মতামত প্রকাশ করতে পারবে। তারা ভালোমতই জানবে যে, নিজেদের গৃহীত সিদ্ধান্তের ফলও নিজেদেরই ভোগ করতে হবে। বিষয়টা রাজনীতিবিদ বা আমলাদের মত নয়, যারা সকলের হয়ে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকে।
নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করেন, সিদ্ধান্ত সবসময় সর্বোচ্চ ছোট পরিসরে গ্রহণ করা উচিত। স্বতন্ত্র ব্যক্তি বা ছোট ছোট দল যে সিদ্ধান্ত নিজেরাই নিতে সক্ষম, তা যদি অন্যদের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ না করে, তাহলে সেই সিদ্ধান্ত বোঝাপড়ার মাধ্যমে নিজেদেরই নিয়ে ফেলা উচিত। আবার, অন্যদের সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপ না করার সাপেক্ষে পরিবার, ধর্মসভা বা শ্রমিকদের ছোট ছোট দলগুলোর নিজেদের মধ্যে আলোচনা করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে ফেলতে হবে। যদি কোনো সিদ্ধান্তের উল্লেখযোগ্য ব্যাপক কোনো প্রভাব থাকতে পারে বলে কেউ মনে করে, সেক্ষেত্রে কম্যুনিটির সকলে মুখোমুখি বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে।
কম্যুনিটির এই সভাগুলো, বলাই বাহুল্য, কোনো আইনসভা নয়। এখানে কেউ নির্বাচিত প্রতিনিধি হয়ে আসবেনা। যেকেউ এতে যোগ দিতে পারবে। নিজেদের কথা বলতে পারবে। কিন্তু, সেখানে যেহেতু সুনির্দিষ্ট কিছু বিষয়ে কথা বলাই মুখ্য উদ্দেশ্য, তাই, ফুটবল কোচ ভিন্স লম্বার্ডির সেই কথাটি মনে রাখতে হবে – কথার লড়াইয়ে জিতে যাওয়াই যেন “একমাত্র লক্ষ্য” না হয়ে দাঁড়ায়। চাইতে হবে সকলের জয়। সহনাগরিকের মতামতকে সমান গুরুত্ব দিতে হবে। ভুল বোঝাবুঝির অবসান ঘটিয়ে প্রথমেই চেষ্টা করতে হবে, বিবাদের যথাসম্ভব মীমাংসা করতে। বেশীরভাগ সময়ে মীমাংসায় পৌঁছতে এই চেষ্টাটুকুই যথেষ্ট। যদি তাতেও না হয়, তাহলে আপোষের পথে যাওয়া যেতে পারে। এবং, প্রায় সবসময়েই দেখা গেছে, এতে কাজ হয়। যদি সেটাও না হয় এবং যদি তাৎক্ষণিক সমাধান খুব জরুরী না হয়ে থাকে, তবে সভা সেদিনের মত মুলতুবি রাখা যেতে পারে। এতে করে কম্যুনিটির সদস্যরা পরবর্তী সভার আগে নিজেদের মাঝে বিষয়টি নিয়ে আলাপ আলোচনা করার সুযোগ পাবে। যদি এই পদ্ধতিও সমাধান দিতে ব্যর্থ হয়, তাহলে, কম্যুনিটি দেখবে নিজেদের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে সাময়িকভাবে তারা আলাদা হতে পারে কিনা।
দুটি দলের সিদ্ধান্তের মাঝে যদি তখনও পার্থক্য থাকে, তাহলে সংখ্যালঘু দলটির সামনে দুটো পথ খোলা থাকবে। তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটির সাথে সম্মতি প্রকাশ করতে পারে, যেহেতু, কম্যুনিটির ভেতর সমন্বয় রক্ষা করা উক্ত বিষয়টির চেয়েও বেশী গুরুত্বপূর্ণ। সংখ্যাগরিষ্ঠ দলটি এক্ষেত্রে অন্যকোনো উপায়ে সংখ্যালঘু দলকে সন্তুষ্ট করতে পারে।
কিন্তু, এই সকল প্রচেষ্টাই যদি ব্যর্থ হয়, নিজেদের সিদ্ধান্ত সংখ্যালঘু দলের কাছে যদি এতোই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে থাকে, তাহলে তারা বিদ্যমান কম্যুনিটি থেকে আলাদা হয়ে নিজেদের কম্যুনিটি গঠন করতে পারে। আমেরিকার কানেকটিকাট, রোড আইল্যান্ড, ভারমন্ট, কেন্টাকি, মেইন, উটা, ওয়েস্ট ভার্জিনিয়া ইত্যাদি রাজ্যগুলোর মতন। যে যুক্তি মানুষ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে খাটাতে পারে না, সেসব যুক্তি নৈরাজ্যবাদের বিরুদ্ধে খাটালেই হবে না। রাষ্ট্রের ব্যর্থতা নৈরাজ্যবাদের নয়, কারণ প্রতিটা কম্যুনিটিতে নৈরাজ্যবাদের পুনঃবিকাশ ঘটা সম্ভব। নৈরাজ্যবাদ নিখুঁত কোনো সিস্টেম নয়, এটা কেবল অন্যগুলোর চেয়ে শ্রেয়তর।

স্থানীয়ভাবে আমাদের সকল চাহিদা পূরণ করা সম্ভব নয়।

সকল চাহিদা পূরণ হয়তো সম্ভব নয়। কিন্তু, প্রত্নতাত্ত্বিক গবেষণায় প্রাগৈতিহাসিক ইউরোপের নৈরাজ্যবাদী সমাজে শতশত, এমনকি হাজার মাইল দূরত্বের বাণিজ্যেরও নজির মিলেছে। বিংশ শতাব্দীর নৃবিজ্ঞানীরা আদিম নৈরাজ্যবাদী সমাজের হদিস পেয়েছিলেন। এদের ভেতর স্যান (বুশম্যান) শিকারি সম্প্রদায় এবং ট্রোব্রিয়ান্ড দ্বীপের আদিবাসীরা তাদের নিজ নিজ অংশীদারদের ভেতর এই ধরনের বাণিজ্য পরিচালনা করতো। কার্যত, নৈরাজ্যবাদ কখনোই স্থানীয় স্বয়ংসম্পূর্ণতার ওপর নির্ভর করে থাকেনি। তবে, আধুনিক অনেক নৈরাজ্যবাদী মনে করেন, কম্যুনিটিগুলোর যতটা সম্ভব স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন করা উচিত। দূরের বা অচেনা কারো উপর নির্ভর না করেই। এমনকি, বর্তমানের আধুনিক প্রযুক্তি, যেসবের তৈরিই করা হয়েছে মূলত স্বয়ংসম্পূর্ণতাকে ভেঙে বাজার সম্প্রসারণ করতে, সেগুলো ব্যবহার করেও স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জন সম্ভব। কিন্তু সেই তরিকা সরকার বা বড় বড় কর্পোরেশনগুলো আমাদেরকে জানতে দিতে চায় না।

নৈরাজ্যবাদের অন্যতম সংজ্ঞা হল ‘বিশৃঙ্খলা’। নৈরাজ্যবাদ কি শেষমেশ বিশৃঙ্খলাতেই পরিণত হবেনা?

পিয়েরে জোসেফ প্রুঁধো – নিজেকে নৈরাজ্যবাদী ঘোষণা দেওয়া প্রথম ব্যক্তি, লিখেছিলেন, স্বাধীনতা হল সব নিয়মশৃঙ্খলার মাতা, কন্যা নয়। নৈরাজ্যবাদী শৃঙ্খলা রাষ্ট্রের চাপানো আইনকানুনের চেয়ে অধিকতর শ্রেয়, কারণ, এগুলো কোনো দমনমূলক আইন নয়। এগুলো কম্যুনিটির মানুষগুলোর একসাথে বেঁচে থাকার জন্য সহজাত বোঝাপড়া। নৈরাজ্যবাদে গৃহীত নীতিগুলো সকলের সম্মতিতে সাধারণ বোধ থেকে উদ্ভুত।

নৈরাজ্যবাদের দর্শন প্রথম কবে প্রণীত হয়েছিল?

কেউ কেউ মনে করেন, নৈরাজ্যবাদী ধারণার প্রথম প্রকাশ হয়েছিল প্রাচীন গ্রীসে ডায়োজিনিস দ্য সিনিকের মাধ্যমে, প্রাচীন চীনে লাও সে, মধ্যযুগীয় কয়েকজন আধ্যাত্মবাদীদের দ্বারা এবং সতের শতকের ইংলিশ সিভিল ওয়ারের সময়টায়। কিন্তু, আধুনিক নৈরাজ্যবাদের সূচনা ঘটেছে ১৭৯৩ সালে উইলিয়াম গডউইনের ‘পলিটিক্যাল জাস্টিস বইটি’ প্রকাশের সাথে। পরবর্তীতে, ১৮৪০ সালে ফ্রান্সে আধুনিক নৈরাজ্যবাদের পূনর্জাগরণ ঘটে পিয়েরে জোসেফ প্রুঁধোর “হোয়াট ইজ প্রপার্টি?” বইয়ের মাধ্যমে। ফ্রান্সের শ্রমিকদের নিয়ে তিনি একটি নৈরাজ্যবাদী আন্দোলন গড়ে তুলেছিলেন। ম্যাক্স স্টার্নার তার “দি ইগো এন্ড হিস ওন“ (১৮৪৪) বইতে “এনলাইটেন্ড ইগোইজম” এর সংজ্ঞায়ন করেছেন, যেটাকে নৈরাজ্যবাদের একটি মৌলিক মানদণ্ড হিসেবে ধরা হয়। জোসিয়া ওয়ারেন নামের একজন আমেরিকান ওই একই সময়ে, একই ধারণা নিয়ে স্বতন্ত্রভাবে এগিয়েও একই সিদ্ধান্তে আসেন এবং ইউটোপিয়ান কম্যুনিটির ভিত্তিস্থাপনের উদ্দেশ্যে একটি বিরাট আন্দোলন গড়ে তুলতে ভূমিকা রাখেন। পরবর্তীতে রাশান বিপ্লবী মিখাইল বাকুনিন এবং রাশান পণ্ডিত পিটার ক্রপোৎকিন নৈরাজ্যবাদের ধারণাকে আরো বিকশিত করেন। নৈরাজ্যবাদীরা আশা করে যে, পরিবর্তনশীল পৃথিবীতে তাদের ধারণা উত্তরোত্তর বিকাশ লাভ করবে।

 

এই বিপ্লবী ব্যাপারস্যাপারগুলো অনেকটাই কমুনিজমের মত শোনাচ্ছে, যা কেউ চায়না।

এনার্কিস্ট আর মার্ক্সিস্টদের বিরোধ লেগে আছে সেই ১৮৬০ থেকে। যদিও, রুশ বিপ্লবের সময় দুই পক্ষেরই সাধারণ শত্রু জারিস্টদের বিরুদ্ধে, কিংবা স্প্যানিশ গৃহযুদ্ধের সময় স্পেনীয় ফ্যাসিস্টদের বিরুদ্ধে তারা একসাথেই কাজ করেছে। কমুনিস্টরা বরাবরই নৈরাজ্যবাদীদের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করে এসেছে। এছাড়া, কার্ল মার্ক্স থেকে শুরু করে জোসেফ স্টালিন সকলেই নৈরাজ্যবাদের নিন্দাই করেছেন সবসময়।
ক্রপোৎকিনের কিছু নৈরাজ্যবাদী অনুসারীরা নিজেদেরকে ‘communists’ দাবি করেন, ‘Communists’ নয়। কিন্তু তারা কমুনিজম বলতে মিলেমিশে সম্পত্তি ভোগদখল করা, স্থাণীয় কমুনিটিতে চেনাজানা লোকজনদের সঙ্গে কাজকর্ম করা – এসবকেই বুঝতেন। রাষ্ট্র অধিকৃত ভূমিব্যবস্থা আর উৎপাদন ব্যবস্থা, রাষ্ট্রের স্থানীয় স্বায়ত্বশাসন, আর শ্রমিকদের রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষণের প্রতি ছিল তাদের অনাস্থা। দুটি ধারণার মধ্যে তাহলে তো বিরাট পার্থক্য দেখা যাচ্ছে, তাই না?
ইউরোপিয়ান কম্যুনিজমের পতনকে নৈরাজ্যবাদীরা কেবল স্বাগতই জানায়নি, এতে অংশগ্রহণও করেছে। কিছু কিছু বিদেশী নৈরাজ্যবাদী ইস্টার্ন ব্লকের ভিন্নমতাবলম্বীদেরকেও সহায়তা করেছে যাদের কিনা বহুবছর পর্যন্ত আমেরিকান সরকারও করেনি। অনেক সাবেক সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বর্তমানে নৈরাজ্যবাদীরা সক্রিয় আছে।
কম্যুনিস্টদের পতন আমেরিকার বামপন্থীদের জন্য অনিবার্য দুর্নাম বয়ে আনলেও, এর সাথে নৈরাজ্যবাদীদের আসলে কোনো সম্পর্ক নেই। এদের অনেকেই নিজেকে বামপন্থী হিসাবে দাবীও করেন না। মার্ক্সিজমের আগেও নৈরাজ্যবাদীরা ছিল, এখনো আছে।

নৈরাজ্যবাদীরা কি সহিংসতাকেই উস্কে দেয়না?

ডেমোক্রেট, রিপাবলিকান, উদারপন্থী বা রক্ষণশীলদের সহিংসতার কাছে নৈরাজ্যবাদীরা কিছুই নয়। ওইসব মানুষকে দূর থেকে দেখে অহিংস মনে হয়, কারণ, তারা তাদের সব নোংরা কাজকর্ম রাষ্ট্রকে দিয়ে করায়; রাষ্ট্র তাদের হয়ে সহিংস কাজকর্ম চালায়। কিন্তু, সহিংসতা সহিংসতাই। ইউনিফর্ম বা পতাকা সহিংসতার চরিত্র ঢাকতে পারেনা। রাষ্ট্র গোড়া থেকেই সহিংস। আমাদের নৈরাজ্যবাদী শিকারি বা কৃষক পূর্বপুরুষদের উপর চড়াও না হলে রাষ্ট্রের জন্মই হতোনা। সামান্য কিছু নৈরাজ্যবাদী সহিংসতার পক্ষে কথা বলে ঠিকই, কিন্তু, সব রাষ্ট্রই প্রতিনিয়ত সহিংসতার আগুনে ঘি ঢালছে।
কিছু নৈরাজ্যবাদী টলস্টয়ের ধারায় শান্তিবাদী, অহিংস নীতি গ্রহণ করেছে। আপেক্ষিকভাবে, কম সংখ্যক নৈরাজ্যবাদীই রাষ্ট্রকে সরাসরি আক্রমণের পথ বেছে নেয়। বেশীরভাগ নৈরাজ্যবাদীই আত্মরক্ষায় বিশ্বাস করে, এবং, বিপ্লবী পরিস্থিতিতে প্রয়োজনীয় সহিংসতাকে সমর্থন দেয়।
কিন্তু, বিষয়টি আদৌ সহিংসতা বনাম অহিংসতার নয়। বিষয়টি হল সরাসরি প্রতিবাদের। নৈরাজ্যবাদীরা বিশ্বাস করে, সকল মানুষের উচিত নিজের ভাগ্যের হাল নিজহাতে ধরা। আর এজন্য তাকে একা একা বা ঐক্যবদ্ধভাবে, আইনী বা বেআইনী, সহিংস বা অহিংস যেকোন পথেই যেতে হতে পারে।

নৈরাজ্যবাদী সামাজিক কাঠামোটা আসলে কেমন হবে?

নৈরাজ্যবাদীরা এইব্যপারে ‘পুরোপুরি’ নিশ্চিত নন। কারণ, সরকারব্যবস্থা লুপ্ত হওয়ার পরের পৃথিবীর সাথে বর্তমান পৃথিবীর কোনো মিলই থাকবেনা।
নৈরাজ্যবাদীরা এক্ষেত্রে কোনো ব্লুপ্রিন্ট পেশ করেনা, তবে, তারা কিছু নীতি-নির্দেশনা দেয়। তারা বলে, প্রতিযোগিতার চেয়ে বরং পারস্পারিক বোঝাপড়াই হল সামাজিক জীবনের অন্যতম সুস্থ ভিত্তি। তারা ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী এই অর্থে যে, তারা মনে করে, সকল স্বতন্ত্র সত্তার সুবিধার জন্যেই সমাজের উৎপত্তি- এর উল্টোটা নয়। তারা বিকেন্দ্রীকরণের পক্ষে। অর্থাৎ, তারা মনে করে সমাজের ভিত্তি হবে স্থানীয় পরিসরে ও প্রত্যক্ষ। তারপর এই কম্যুনিটিগুলো পারস্পারিক সমঝোতার ভিত্তিতে পরস্পর যুক্ত হতে পারে। এই ফেডারেশন কেবলমাত্র সেসব বিষয়েই হস্তক্ষেপ করতে পারবে, যেগুলো স্থানীয় কম্যুনিটিতে মেটানো সম্ভব নয়। এই ধরণের বিকেন্দ্রীকরণ বর্তমানের শাসনতান্ত্রিক স্তরবিন্যাসকেই উল্টে দিবে। বর্তমানে, সরকারব্যবস্থায় যত উঁচুতে যাওয়া যায়, ক্ষমতা তত বাড়তে থাকে। কিন্তু, নৈরাজ্যের অধীনে ফেডারেশনের সবথেকে উঁচু পদটি সর্বক্ষমতার অধিকারী হতে পারবে না। দমনমূলক কোনো ক্ষমতা তাদের হাতে থাকবে না। আর, যতোই উঁচুতে যাওয়া যাবে, তাদের দায়িত্ব ততোই কমতে থাকবে। তারপরেও ফেডারেশনের আমলাতান্ত্রিক বা রাষ্ট্রচরিত্র ধারণের ঝুঁকি নৈরাজ্যবাদীরা অস্বীকার করে না। আমাদেরকে কল্পনাবিলাসী মনে হলেও, আমরা বাস্তববাদী। এইসব ফেডারেশনগুলোকে নিবিড় পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে। টমাস জেফারসন যেমনটা বলেছেন, “স্বাধীনতা রক্ষা করার মধ্যেই এর সার্থকতা নিহিত।”

কোনো শেষকথা বলতে চান?

সদ্যপ্রয়াত মদাসক্ত ইংরেজ রাজনীতিবিদ ও যুদ্ধাপরাধী, উইন্সটন চার্চিল লিখেছিলেন, “গণতন্ত্র, শাসন করার জন্য অন্যান্য সব সিস্টেমের চেয়ে নিকৃষ্ট।” তেমনি বলা যায়, নৈরাজ্যবাদ সমাজ পরিচালনার জন্য অন্যান্য সব ব্যবস্থার চোখে নিকৃষ্ট। এখন পর্যন্ত মানবসভ্যতায় সকল শাসনতান্ত্রিক সমাজের পতন ঘটেছে, সফল হয়েছে কেবল নৈরাজ্য। সহজাতভাবেই, রাষ্ট্রীয় শাসনব্যবস্থা খুবই অস্থিতিশীল। আগে হোক বা পরে, বর্তমান সমাজব্যবস্থাও ভেঙে পড়বে। এই জায়গাটা কে নেবে, তা নিয়ে চিন্তা করার এখনই সময়। নৈরাজ্যবাদীরা গত দুইশো বছর ধরে এর উত্তর খুঁজে আসছেন। তাই, এই চিন্তার জায়গাটা আমাদের জন্য অনেকটাই সহজ হয়েছে। আমাদের এই চিন্তাজগতে আপনাদেরকে আহবান জানাচ্ছি। আহবান জানাচ্ছি, পৃথিবীকে আরো বাসযোগ্য করে তুলতে আমাদের এই যাত্রার সঙ্গী হতে।

Leave a Reply