বয়ঃসন্ধি ও মা

হোক সে আপনার সন্তান। তবুও তার স্বপ্নদোষ হবে, প্রেম হবে, শরীরের গঠন বদলাবে, আন্ডার আর্মস হেয়ার হবে, নির্দিষ্ট বয়সে নির্দিষ্ট পরিমান শারীরিক চাহিদা হবে এটাই তো স্বাভাবিক। স্বাভাবিক যা কিছু তাকে স্বাভাবিক ভাবেই নিন। বয়সন্ধি আসবেই। আপনি একে আটকাতে পারবেন না। পাশে থাকুন সন্তানের। এটাই একমাত্র সরল সুন্দর পথ।

আরাফ আমাকে একেকবার একেক ভাবে ডাকে, ধ্রুবও। কখনো মামমাম কখনো মাম্মা, আম্মু, মাতা (!!), মা’জী, সেতু, মামনি! আমার অভ্যাস হয়ে গেছে।

তিন বছর আগে একদিন সক্কালে ঘুম থেকে উঠে অপরিচিত কণ্ঠের মাম্মা ডাক শুনে চমকে উঠে তাকিয়ে দেখি আমার আরাফ। তার কণ্ঠ বদলে গেছে, বয়সন্ধি!! কী আজব একটা কণ্ঠ। আমার এতো দিনের পরিচিত মধুর কণ্ঠ হারিয়ে গেছে। ভাল করে তাকিয়ে দেখি ছেলের মুখের নানান প্রান্তে দু চারটা ব্রন।

আমি ভ্রু কুঁচকে তাকিয়েছিলাম!! ছিঃ ছিঃ ছিঃ আমিও ভ্রু কুঁচকে তাকালাম? নিজেকে কতই না উদার ভেবেছি। প্রথম প্রথম তো আমি চিৎকার করে ওকে ধমক দিয়ে এও বলেছি ‘এতো জোড়ে কথা বলবি না তো। কানে লাগে তোর আওয়াজ।’

আমার ছেলেটা তার ঠিক কতদিন আগে থেকে কে জানে নিজেই নিজের এ পরিবর্তন টের পেয়ে খানিকটা গুটিয়ে গিয়েছে। খানিকটা একা হয়েছে। খানিকটা বিব্রত, প্রশ্ন, লজ্জিত হয়েছে। হয়েছে রহস্যে ঢাকা পৃথিবীর মানুষ কে জানে!

আমি একটু একটু করে দেখেছিলাম ওকে। আমার পাশে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরে ঘুমানো ছেলেটা কেমন করে একা হয়ে যাচ্ছিল। তারপর, সমস্ত পর্দা তুলে দিয়ে একদিন নিজের কাছে নিজে ক্ষমা চেয়ে তার সাথে আমি বসেছিলাম। প্রথম বললাম -‘বুড়া, আন্ডারআর্মস হেয়ার কাটতে হয় জানিস?” ছেলেটা মাথা নিচু করে বলেছিল -‘আমি পারবো না মা। ভয় লাগে। যদি কেটে যায়।”

প্রথমবার আমি দেখিয়ে দিয়েছিলাম। তারপর থেকে সে রেজার নিয়ে তার ছোট ভাইর কাছে যেত। এ নিয়ে কোন জড়তা ছিল না আর। তার বয়ঃসন্ধি পরিবর্তন নিয়ে আমি সহজ হতেই সে আবার আগের মত হয়ে গিয়েছিল। উচ্ছল, সহজ, আত্মবিশ্বাসী।

সে এখন ক্লাস টেনে। ১১ মাস আগে ভবিষ্যতের জন্য লেখার সময় বয়ঃসন্ধি কালিন পরিবর্তন নিয়ে কথা বলার জন্য আমার আরাফ শতভাগ সাহায্য করেছে আমাকে। আমি পরিষ্কার বলে নিয়েছিলাম ‘দেখ ছেলে আমাকে কিন্তু সব বলতে হবে’ । সে বলল, সবাইকে এখান থেকে যেতে বল। আমি শুধু তোমাকে বলবো। আমি তার সব থেকে কাছের বন্ধু! সে আমাকে বলেছিল। তার ভালবাসার কথা, বিপরীত লিঙ্গের প্রতি ভালো লাগার কথা, তার স্বপ্ন থেকে শুরু করে স্বপ্নদোষ পর্যন্ত।

আমার একটু একটু বুক কাঁপছিল যখন তাকে জিজ্ঞেস করেছিলাম ‘বাবাই, এটা ঠিক কতদিন পরপর হতে পারে? জীবনে প্রথম কবে হলো তোমার মনে আছে?” আমার ছেলেটা কাঁপছিল না। ভীষণ স্মার্টলি বলেছিল -“ডিপেন্ড করে মা। এ নিয়ে যারা বেশি ভাবে তাদের বেশি হয়। আমি তো খুব বেশি ভাবি না। তবে মাঝেমাঝে ভাবতে না চাইলেও ভাবনা আসে মা। আমি কি খারাপ?’ আমি অস্থির হয়ে তার হাত ধরে বলেছিলাম, না বাবা। সকল ভাবনা তো মন নিয়ন্ত্রন করতে পারে না সব সময়। তবে চেষ্টা করবে যেন মন পারে ভাবনাগুলোকে নিয়ন্ত্রন করতে। অন্য যে কোন ভাল কাজে ব্যাস্ত থাকো। সে ক্রিকেটে ব্যাস্ত হয়ে গিয়েছিল।

এক বছর আগে সে আমাকে পরিষ্কার ভাবে বলেছিল -‘ মাম্মা, এবার আমি গোঁড়া, নৌকাডুবি পড়ে ফেলি? বড় হয়েছি তো। বুঝি সব। আমি হাসলাম।

বয়ঃসন্ধি একটা সাংঘাতিক সময়। আপনার মেয়ে বা ছেলে আপনার চোখের সামনে বদলাবে। আপনি চাইবেন তাকে অভ্যস্ত চোখে শিশুর মতন দেখতে কিন্তু প্রকৃতি তো তার নিয়মেই চলবে। পরিবর্তনগুলো স্বাভাবিক ভাবে নিন। সন্তানের পাশে থাকুন। এ সময়ে বিপরীত লিঙ্গের প্রতি একটা টান আসবে, এটা স্বাভাবিক। বন্ধুত্ব হতে দিন। প্রেম ভালবাসার যে শুধু শরীরের বিষয় নয়, মানসিক পরিপক্কতার জন্য অপেক্ষা করতে হয় এর জন্য সেটা বলুন সন্তানকে। প্রকৃতির খামখেয়ালি আপনার শিশু ভাল ভাবে চেনে না বলে কখনো কখনো সে নিজেকে অপরাধি ভাবতে পারে। আপনি তাকে সেই কষ্ট থেকে বের করে আনুন। নিজেই তাকে জানান বয়ঃসন্ধির পরিবর্তন সম্পর্কে। রাস্তার ক্যানভাসারের হাতে তাকে ঠেলে দেবেন না। ইউটিউবের বদৌলতে এবং বন্ধুদের আলোচনা থেকে পর্ন ক্লিপের হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করা চ্যালেঞ্জ হয়ে যাবে এ সময়ে।

তবে শারীরিক সম্পর্কের বিষয়ে ধারনা এ বয়সেই হবে, হতে দিন। ভালো হয় পরিবার থেকেই এ ধারনা পেলে। তবে বিকৃত পর্ন ক্লিপ দেখার অভ্যাস যেন না হয় সে জন্য পরিষ্কার ভাষায় তাকে এর ক্ষতিকারক দিক বলুন এবং তাকে জানিয়েই নেট ব্যবহারে রেস্টেকশন আনুন। মনে রাখবেন, যা করবেন তার সবটাই সন্তানের সাথে আলোচনা করে করবেন। কোন ভুল বা অন্যায় চোখে পরলে বন্ধুদের বা বাইরের মানুষ এর সামনে সন্তানকে অপমান করে কথা বলবেন না। একা কথা বলুন।
আমি জানি আজও অনেকে আমাকে গালি দেবে। নির্লজ্জ, বেহায়া বলবে। কিছু যায় আসে না আসলে আমার এতে। কেউ কেউ বলবে, মা হয়ে ছেলের সাথে এসব বলতে লজ্জা লাগে নাই?

সত্যি বলতে কি লাগে নাই। ও আমার শরীরের অংশ। নাড়ি ছেড়া আমার। সিঙ্গেল মা ছিলাম আমি। এই কঠিন দায়িত্ব অন্য কাউকে দেয়ার রিস্ক আমি কেন নেবো? আমার সন্তানের ভাল মন্দ আমার। মা আমি। মা হয়ে যদি না পারি তবে পৃথিবীর আর কোন সম্পর্ক পারবে। সিঙ্গেল বাবাও আছেন নিশ্চয়ই অনেক। তারা সকল জড়তা কাটিয়ে কন্যাদের হাত ধরুন। তার জীবনের প্রথম স্যানিটারি প্যাড আপনি কিনে দিন। কিসের জড়তা? আপনার মেয়ে আপনার মা তো। আর মা তো মা তাই না?

লেখকঃ প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা, পাললিক সৌরভ।

Leave a Comment