ব্রিটিশ আমলের দেশটার গল্প

ব্রিটিশ আমলের এক দেশে থাকি আমরা। কথাটি হাস্যরসের উদ্রেক করলেই সত্যিটা হচ্ছে, ব্রিটিশরা এ ভূখন্ড ছেড়ে চলে যাওয়া অনেক বছর পরেও, বাংলাদেশ যেনো চলছে ব্রিটিশ কলোনিয়্যাল যুগের আইনে। এই নিয়ে নিজের মতামত তুলে ধরেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র, বিতার্কিক অঞ্জন রানা গোস্বামী। 

 

বাংলাদেশ রাষ্ট্র যখন জন্ম নেয়, তখন আমরা পার্শ্ববর্তী দু’টি রাষ্ট্র ভারত এবং পাকিস্তান থেকে দর্শনগত জায়গা থেকে যোজন যোজন এগিয়ে।

ব্রিটিশের হাত থেকে যখন ভারত-পাকিস্তান স্বাধীন হয়, তখন তাঁরা শুধু জানত “স্বাধীনতা দরকার। স্বাধীনতা হলে চাকরি-বাকরি হবে। খেয়ে পড়ে বাঁচা যাবে।” তাঁরা জানত না – বিচার বিভাগ কিভাবে চলবে? প্রশাসন কিভাবে চলবে? কলকারখানাগুলোর বেতন কাঠামো, শ্রমঘন্টা কেমন হবে? শিক্ষা ব্যবস্থা কেমন হবে?
অর্থাৎ, রাষ্ট্রগঠনের পরে কি হবে সেই সম্বন্ধে দ্বি-জাতিতত্ত্বে জন্ম নেয়া রাষ্ট্র দু’টির পূর্ববর্তী কোন পরিকল্পনা ছিল না। মোটামুটি ব্রিটিশ আইন-কানুন সম্পাদনা করে, অনুবাদ-টনুবাদ করে তাঁরা চলতে থাকে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে ব্যাপারটা এইরকম ছিল না। স্বাধীনতার পূর্বেই এই রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠাতাদের জানা ছিল সমস্যা কোথায়। রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রাণপুরুষ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের অনেক বক্তৃতায় সাক্ষাৎকারে আপনারা এই লাইনটি কমন পাবেন, “ব্রিটিশ কলোনিয়্যাল যুগের আইনে এখনো এই দেশ চলছে। সময় এসেছে একে পরিবর্তন করার।”

বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধের মূল স্বপ্নদ্রষ্টারা জানতেন মূল সমস্যা হচ্ছে “ব্যুরোক্রেসি”। তাই সেক্রেটারিয়েটের হাত থেকে রাষ্ট্র বাঁচাতে হবে। প্রশাসনে পাক-ব্রিটিশ দাস মানসিকতার জায়গা দেয়া যাবে না। একটি জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তুলতে হবে। শিক্ষাব্যবস্থাকে করতে হবে বিজ্ঞানভিত্তিক-উৎপাদনমুখী। কৃষিক্ষেত্রে উৎপাদন বাড়াতে হবে,কৃষককে ন্যায্য পাওনা দিতে হবে। শ্রমিককে ৮ শ্রমঘন্টার দিন নিশ্চিত করতে হবে, নিশ্চিত করতে হবে বেতন। সমাজ হবে সাম্য ও মানবিক মর্যাদার। এই সমাজে শিক্ষক, ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ব্যাংকার, আইনজীবী, ব্যবসায়ী, শিল্পী, চিত্রকর সবাই নিজস্ব সম্মান নিয়ে মাথা উঁচু করে বাঁচবে। দেশকে এগিয়ে নিবে।

কিন্তু, স্বাধীনতার পর সবকিছু উলটে গেলো। সামথিং গন রং। ভেরি ভেরি রঙ। আমরা চেয়েছিলাম আমাদের রাষ্ট্রের পথপ্রদর্শক ব্রিটিশরাজের মতন আমলাতন্ত্র হবে না, হবে না পাকিস্তানের মতন সেনানিবাস। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলি হবে আমাদের পথপ্রদর্শক। পুরোটাই যেন একটা ইউটোপিয়া ছিলো।

স্বাধীনতার ৪৭ বছর পর। ধ্বস্ত-বিধ্বস্ত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বলছি। রাষ্ট্রকে পথ দেখাতে আমরা ব্যর্থ। রাষ্ট্র আটকে আছে আমলাতন্ত্রের জাল। দল আসে, দল যায়। বছর বছর আন্দোলন হয়। আমলাদের কাজে হাত দেয়ার কথা আর সাহস কারো মুখে নাই। আমরা সবাই-ইনক্লুডিং মি সিভিল সার্ভিস অবসেশনে আছি। আর সিভিল সার্ভিসের বাইরে বড় একটা অংশের আছে আর্মি অবসেশন। আমাদের সিভিল প্রশাসন দুর্নীতিপ্রবণ। তাঁদের দিয়ে কাজ ভাল হয় না। সমাধানের জন্য আমরা তাকাই সেনাবাহিনীর দিকে। ঠিক পাক ব্রিটিশদের মত।

আর বিশ্ববিদ্যালয়ের কি হলো? সোনালী ছাত্র রাজনীতির কি হলো? দিনে দিনে গলা টিপে হত্যা করা হচ্ছে। বিষফোঁড়া বানানো হচ্ছে বিষফোঁড়া।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়, ঢাকা। 

Leave a Comment