কবিতায় আমি কারো দায়বদ্ধ নই

জীবনে প্রথম কবিতা/ ছড়া লিখি, যখন ক্লাস সিক্সে পড়ি। অর্থাৎ তখন আমার বয়স এগারো- বারো। আমি বরাবরই বলি আমার প্রথম কবিতা লেখার অনুপ্রেরণা আমার থেকে বছর খানেকের ছোট আমার প্রতিভাবান ভাই। আমার দ্বিতীয় প্রেরণা কিংবা মনে করেন জিদও বলতে পারেন; (না আসলে ওটা প্রেরণা না, অভিমান বলাটা মনে হয় জুতসই) সেটা মেজবাহ নামক একটা ছেলের কাছ থেকে পাওয়া। ওর কবিতা লেখা দেখে আমি প্রচন্ড পরিমাণ শোকাহত হই ( যেমন ছোট বাচ্চারা পেন্সিল হারিয়ে ফেললে হয়) এবং সিদ্ধান্ত নিই কবিতা লেখার এবং লিখেও ফেলি। এবং, ঐ তেরো বছরের জীবনে আমি হয়তো অবচেতন ভাবে বুঝে ফেলি আমাকে এই কাজটা করতে হবে, স্রেফ আমার কিছু বলার আছে বলেই।

তো, কবিতা লেখা চলতেই থাকে। তখন মূলত দেশপ্রেম, প্রেম অর্থাৎ কোন অবজেক্ট কে কেন্দ্র করে লিখতাম। আর তা হতো একদম ভালো লাগা থেকে। তখনও চোখ ও চিন্তা এত জটিল হয় নাই, আমি এত পরিপক্বও হই নাই।

আসলে ঐ সময় কবিতা লেখা হতো মূলত কাছের কয়েকজন বন্ধুদের পড়াতে। নিজে আনন্দ পেতে। কিন্তু ক্রমশ চোখ খুলতে থাকল। আমার চোখের সামনের ইলেমন্ট গুলো প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকল। মনে করেন, একটা বাঁশঝাড়, চাঁদের বুড়ি, বাদামের খোসা, রিকশার প্যাডেল কিংবা শিশিরের জল সববিছুই যেন ভিন্ন ভাবে উপস্থাপিত হতে লাগল আমার চোখে। আমি যদি কোন একটা ইলেমেন্ট কে ত্রিভূজ ধরি এবং মনে করি এইরকম কয়েকটা ত্রিভূজ আছে চোখের সামনে , তাহলে বলা যায় ঐ ত্রিভূজ গুলার রেখা মিলে একটু নতুন সামান্তরিক কিংবা চতুর্ভুজ তৈরী করল কিংবা এমন কিছু তৈরী করল যা কখনো আমি দেখিনাই। কল্পনার দোয়াত থেকে ঝরে পড়ল কালি, নাম না জানা দৃশ্য এবং আরো অনেক নতুন ইলেমেন্ট। আমি কবিতা লেখার তাড়না অনুভব করতে লাগলাম এবং নিজের মতো করে লিখতে লাগলাম। এবং, অবচেতন বা চেতন যাই হোক আমি কোন লিগ্যাসির ধার ধারলামনা।
asa
এখানে একটু অপ্রাসঙ্গিক কথা বলে রাখি, যতদূর আমার ধারণা, কবিতায় শুধু বিপ্লবের কথা থাকলে কিংবা রক্ত মাংস ক্ষোভের কথা থাকলেই যে কবিতা তথাকথিত বিপ্লবী কিংবা সময়ের কন্ঠস্বর হয়ে ওঠে ব্যাপারটা এমন নয়। কবিরা ইলেমেন্ট গুলা সাজায় একটু ভিন্নভাবে। তাদের প্রতিবাদও একটু ভিন্নভাবে। তারা যেহেতু খানিকটা বেশী সংবেদনশীল, কাজেই এই সংবেদনশীলতার ভেতরেই জমা থাকে সমস্ত ইমোশন। আর এই ইমোশনেই জমা থাকে বিপ্লব, দ্রোহ, প্রেম।

আমি অবশ্য আমার ‘ কবিতার দু’একটা কথা’ প্রবন্ধে বলেছিলাম যে, রহস্যের পথ শুধু অন্তর্মুখী হয়না। সেটা শুধু তাদের ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য ছিল, যারা নিজের সময়কে কেন্দ্র না করেই বৃত্ত এঁকে বসে থাকে। বস্তুত, একজন সংবেদনশীল মানুষ তার বাস্তব ও কল্পনার ঘাত প্রতিঘাতেই অন্তর্মুখী সোচ্চার হয়ে ওঠে। এবং, শব্দ দ্বারা নিজের সময়কে অতিক্রম করে আঁকে কল্পনার দূরবৃত্ত। যদিও এই কথাগুলো অপ্রাসঙ্গিক তবুও প্রাসিঙ্গকতা এমনিতেই চলে আসে। অর্থাৎ এই কন্ট্রোভার্সি এইখানে প্রয়োজনীয়।

প্রয়োজনীয় এই কারণে যে আমার কবিতার সাথে এর একটা যোগসূত্র আছে। আমি ওই যে বললাম, আমি কোন লিগ্যাসির ধার ধারিনা এর মানে হলো আমি ঠিক একাডেমীবাদী নই। কবিতার কলকব্জা সম্পর্কে বলা চলে আমি অজ্ঞ। ব্যাকরণে বড্ড কাঁচা। আমি তাই আসলে কোন গোষ্ঠীর নয়। কেননা আমিও এও মনে করি, প্রতিষ্ঠানবিরোধিতা এক ধরণের প্রতিষ্ঠানবাদীতা যার মধ্য দিয়ে আসলে এন্টিইস্টাব্লিসমেন্টের প্রাণ প্রতিষ্ঠা হয়। কাজেই, আমি এই মাটি ও মানুষের পুরাণ জাগ্রত করতে চাই আমার কবিতায়। আমি যে ইতিহাসের ভেতর দিয়ে উঠে এসেছি, যে অনার্য মানুষের গর্ভে স্থাপিত হয়েছে আমার বীজ, আমি জানতে চাই সেই সমস্ত কাহন। এই আমার প্রতিষ্ঠান বিরোধিতা, আমি এমন করেই প্রতিষ্ঠান ভাঙতে শিখছি।

ভাই, আমি কবিতা লিখে মানসিক আনন্দ পাই। যে ইলেমেন্ট গুলা, যে কল্পনা গুলা আমাকে নক করে আমি তাদের সাথে কথা বলে আনন্দ পাই। আমার কবিতা কেমন হলো সেই সম্পর্কে আমার তেমন মাথাব্যথা নেই। কবিতা টাইট হইলো কিনা না হইলো সেই সম্পর্কেও আমি বিন্দুমাত্র ভাবিনা। কারো পছন্দ হলে ছাপাবেন, না হলে নাই। আমি সময়ের টিপিকাল উপাদানজাত কবি হয়ে মুখবইয়ে কারো পা চাটাচাটি করতে রাজী না, তাছাড়া রুচিও হয়না ঐ সবের। সত্যি কথা বলতে কি, কবিতার ক্ষেত্রে আমার কোন দায়বদ্ধতা নেই। কারো রুচির প্রতিও আমি দায়বদ্ধ নই।
আমি শুধু এই মাটির কাছে দায়বদ্ধ। দায়বদ্ধ এই মাটির মাতাল করা সুগন্ধীর কাছে।
কবিতায় আমি কারো দায়বদ্ধ নই।

লেখকঃ তরুণ কবি ও শিক্ষার্থী, অর্থনীতি বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply