দ্য সিটি অব গোল্ডঃ এল ডোরাডো

‘বলেছি, এই ব্রাজিলেই আছে এল ডোরাডো। তার উত্তর পশ্চিমে। একটি পাহাড়ে ঘেরা উপত্যকার ঠিক মধ্যিখানে এক গভীর জঙ্গল, সেই জঙ্গলের মধ্যেই এই শহর। কেউ জানেনা এই শহরের কথা। মানুষজন বলতে আর কেউ নেই সেখানে। পোড়ো শহর, তবে রোদ পড়লে এখনও সোনা ঝলমল করে। সোনার তোরণ, সোনার পিরামিড, যেখানে সেখানে সোনার স্তম্ভ, বাড়ির দরজা জানালা সব সোনার। সোনা তো আর নষ্ট হয় না, তাই সে সোনা এখনও আছে। লোকজন যা ছিল সব হাজার বছর আগে লোপ পেয়ে যায়। একবার খুব বর্ষা হয়; তারপরেই জঙ্গলে এক মারাত্মক পোকা দেখা দেয়; সেই পোকা থেকেই মড়ক। বিশ্বাস করুন তিলুবাবু, এ সবই আমি পর পর বায়োস্কোপের ছবির মত দেখতে পেলুম।’

এই সংলাপগুলো সত্যজিৎ রায়ের বিখ্যাত শঙ্কু সিরিজের ‘নকুড়বাবু ও এল ডোরাডো’ গল্পের নকুড়বাবু চরিত্রের। আমরা যারা শঙ্কু সমগ্র পড়েছি তাদের কাছে ‘এল ডোরাডো’ পরিচিত একটা নাম। ‘এল ডোরাডো’ শব্দটির অর্থ হলো স্বর্ণের শহর বা স্বর্ণের মানুষ। কিছু সূত্রমতে প্রাচীন ব্রাজিলীয় উপজাতিরা পূজা করতো ‘এল ডোরাডো’ নামের এক দেবতার। আর তা থেকেই জন্ম হয়েছে এল ডোরাডো মিথের। বলা হয়ে থাকে ব্রাজিলের ‘ইনকা’ নামের একদল উপজাতি বিশ্বাস করতো যে, সূর্য দেবতা ‘টিটিকাকা’ হ্রদের দ্বীপে প্রথম ইনকা সৃষ্টি করেছিলেন। পেরু ও বলিভিয়ার মধ্যবর্তী অঞ্চলে এই হ্রদের অবস্থান। প্রচলিত কাহিনী থেকে জানা যায়, স্থানীয় লোকেরা সেখানে একটি সুন্দর সোনার মন্দির তৈরি করে। বলা হয়, সেই স্বর্ণমন্দিরের পুরোটাই ছিল স্বর্ণ দিয়ে মোড়া। প্রতিবছর নাকি ভক্তেরা বহু দূর দুরান্ত থেকে মন্দিরটিতে পাঠাতো স্বর্ণ আর রুপার নৈবেদ্য। আর এই নৈবেদ্য নাকি ধর্মযাজকেরা নৌকায় করে হ্রদের মাঝখানে নিয়ে ফেলতো তাদের দেবতাকে সন্তুষ্ট করার অভিপ্রায়ে। এই কিংবদন্তীতে বিশ্বাসী অনেকেই চেষ্টা করেছে হ্রদের ১৮০ মিটার গভীর পানি ছেঁচে স্বর্ণ উদ্ধারের। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হয়নি।

স্বর্ণ নগরী এল ডোরাডো

১৫২৯ সালে অ্যামব্রোসিয়াস ডালফিঙ্গার নামে এক জার্মান ব্যক্তি এল-ডোরাডো রহস্য উন্মোচনের উদ্যোগ নেন। ১৮০ জন সঙ্গী নিয়ে ভদ্রলোক যাত্রা করেন ব্রাজিলের ঘন জঙ্গলে। মারাকাইবো হ্রদের কাছে এসে যখন তিনি যাত্রা বিরতি নেন, তখন সেখানকার আদিবাসীদের কাছে শুনতে পান গুয়াটাভিটা নামের এক পবিত্র হ্রদের কথা। আর সেখানেই হ্রদের পাড়ে নাকি রয়েছে এল ডোরাডো নামের সেই স্বর্ণনগরী।

আচ্ছা, ভেবে দেখুন তো! ঘুম থেকে উঠে দেখলেন শুয়ে আছেন এক টলটলে জলের হ্রদের পাড়ে। উঠে যেই না পেছনে তাকালেন, দেখতে পেলেন আশ্চর্য্য এক সোনার ফটক। এগিয়ে যেতেই খুলে গেলো দরজা! ভেতরে ঢুকতেই দেখতে পেলেন কোনো পরিত্যক্ত স্বর্ণের শহর। বেশ হয়! তাই না? এমন স্বপ্ন কে না দেখে? কে না রাতারাতি বড়লোক হতে চায়? বছরের বছরের ধরে তাই তো শত শত অভিযাত্রী এই স্বর্ণশহরের অভিযানে হয়েছে ঘরছাড়া। এমনই এক অভিযাত্রী ছিলেন ডালফিঙ্গার, যার মারা পড়তে হয়েছিলো এই স্বর্ণনগরীর নেশায়। পরবর্তীতে ডালফিঙ্গারের স্থলাভিষিক্ত হয় হোহারমুখ নামের এক অভিযাত্রী আরও জোরেসোরে উদ্যোগ নিয়ে যাত্রা করেছিলেন এই স্বর্ণনগরীর খোঁজে। কিন্তু তিনিও ফেরেন ব্যর্থ হয়ে।

অবশেষে গঞ্জালেস জিমিনেজ ডি কুইসেডা পরিচালিত ১৫৩৬ খ্রিস্টাব্দের অভিযানটি প্রথম সাফল্যের মুখ দেখেছিল। এই অভিযানটি শুরু হয় ভেনিজুয়েলা থেকে। সঙ্গে ৮০০ জন লোক নিয়ে দলনেতা কুইসেডা এগিয়ে চললেন। এক বছর অমানুষিক পরিশ্রম, সীমাহীন প্রতিকুলতা, ৮০০ সৈন্যের সংখ্যা যখন নেমে এল ২০০-তে, অভিযান শেষ পর্যন্ত প্রায় প্রাপ্তির সীমারেখায় এসে পৌঁছে। কয়েকটি গ্রাম অধিকার করেছিলেন কুইসেডা। খোঁজ নাকি মিলেছিল কোথায় আছে এলডোরাডো।

কুইসেডা এক এল ডোরাডোর সন্ধান পেয়েছিলেন। সেখানে নতুন রাজাকে অভিষেকের সময়ে স্বর্ণরেণুতে ঢেকে দেয়া হত। তারপর রাজাকে সেই হ্রদে স্নান করানো হত এবং তখন প্রজারা সেই হ্রদে স্বর্ণ নিক্ষেপ করতেন। তবে এই অঞ্চলকে নিয়েই যে এল-ডোরাডো, কুইসেডার সে কথা একবারও মনে হয়নি। এল ডোরাডোর সন্ধানে কুইসেডা আরও দু’বার অভিযান চালান, কিন্তু কোনোবারই তিনি সফল হননি।

১৯২৫ খ্রিষ্টাব্দে কর্নেল পার্সি ফাসেট নামে এক ইংরেজ অভিযান চালানোর সময় স্থানীয়দের অধিবাসীদের হাতে নিহত হন। তবে ফাসেটের ম্যাপে যেই জায়গায় সেই স্বর্ণমন্দিরের কথা উল্লেখিত সে জায়গা আজও আমাদের জন্য দুরধিগম্য। এভাবে এই স্বর্ণ শহরের খোঁজে বহু মানুষ হারিয়েছে প্রাণ, কেও কেও হারিয়ে গেছে গহীন অরণ্যে। তবু এর আকর্ষণ আজও মানুষকে টেনে নিয়ে যায় এল ডোরাডোর খোঁজে।
হয়তো এল ডোরাডো শুধুই একটা মিথ। অথবা সত্যিই ব্রাজিলের কোনো এক গহীন অরণ্যে রোদের আলোয় আজও ঝলমল করছে সোনার শহর ‘এল ডোরাডো’!

লেখকঃ শিক্ষার্থী, সরকারি মহিলা কলেজ, কিশোরগঞ্জ।

2 thoughts on “দ্য সিটি অব গোল্ডঃ এল ডোরাডো”

Leave a Comment