ডাইনি-পেত্নী-চুড়েইল ও নারী

অঞ্জন রানা গোস্বামী

ডাইনি-পেত্নী-চুড়েইল ও নারীরা

সময়টা মাঝরাত। এই ধরুন রাত ১টা  হবে। কোন এক পুরাতন পোড়াবাড়ির সামনে দিয়ে বাড়ি ফিরছিলেন এক ভদ্রলোক। ভদ্রলোক রেলে চাকরি করেন । সব কাজ শেষ করে ফিরতে ফিরতে তাই দেরী হয়ে গেছে। ওই পোড়াবাড়ির সামনে আসতেই তার পথ আগলে দাঁড়াল এক মধ্যবয়সী নারী। তার পরনে সাদা কাপড়, কোমর সমান লম্বা খোলা চুল। পানের রসে লাল হয়ে আছে ঠোঁট। লোকটির কাছে এসে সে জিজ্ঞেস করে, “একটু চুন হবে?’’। লোকটি হ্যাঁ বোধক ভাবে মাথা নাড়ে। নিজের কাঁধে ঝোলানো ব্যাগ থেকে চুনের কৌটা যেই বের করতে যাবে, অমনি সেই নারী লোকটির ঘাড় মটকে দিলো। তারপর এক চুমুকে পান করল তার রক্ত। লোকটির নিথর দেহটি পড়ে রইল রাস্তার উপর। আর বাতাসে প্রতিধ্বনিত হতে লাগলো সেই নারীর অট্টহাসি।
এই ধরনের গল্প না শুনে ছোট থেকে বড় হয়েছেন এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। আর এসব গল্প যেন হাওয়ায় ভেসে বাংলাদেশের গ্রামগুলো থেকে চলে গিয়েছে সুদূর ইউরোপে, আমেরিকায় এবং অন্যান্য জায়গায়। আসলে কি তাই? গল্পগুলো কি ছড়িয়ে পড়েছে? সেরকম মনে করার কারন খুব একটা নেই। গল্পগুলো আসলে ছিল, বহু আগে থেকেই ছিল। গল্পগুলোতে মিলের জায়গাটাও অদ্ভুত- লেডি ইন হোয়াইট বা সাদা পোশাকের নারী। এই ভৌতিক গল্পগুলির ৯৫% এরই ভিলেন হচ্ছে নারী। এই অদ্ভুত মিলের কারণ আসলে কি? এর উৎপত্তি কোথায়?
বাংলাদেশের পেত্নী বা শাঁকচুন্নীদের যে রূপটি আমরা দেখতে পাই সেটিতেও নারীকে আবর্তন করেই গড়ে উঠেছে দৃশ্যপট। পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে প্রচলিত কিংবদন্তীগুলোর দিকে যদি আমরা তাকাই সেখানেও একই জিনিস দেখতে পাব। মহারাষ্ট্রের নূরী কিংবা পাঞ্জাবের চুড়েইল এরা সবাই নারী । সবাই সাদা কাপড়ে, খোলা চুলে মাঝরাতে রাস্তা দিয়ে ঘুরে বেড়ায়। অথবা বসে থাকে কোন তেঁতুল গাছের মগডালে। তাদের পা থাকে পেছন দিকে ঘোরানো। আর আশপাশে কাউকে পেলেই ঘাড় মটকে দেয় অথবা তার শরীরে কব্জা করে নেয়। শুধুমাত্র ভারতীয় উপমহাদেশ নয়, ইউরোপ-আমেরিকার বহু অতৃপ্ত আত্মারাও নারী। ধরা যাক ইউরোপের দেশ চেক প্রজাতন্ত্রের কথা। সেখানে প্রচলিত রয়েছে পার্চটা ( perchta) নামে এক ভূতের গল্প। এই পার্চটাও আসলে এক নারী। বলা হয়ে থাকে পার্চটা ছিল খুব ধনী পরিবারের সন্তান। তার বিয়ে হয়েছিলো লিখটেনস্টাইনের জেন নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে। কিন্তু যৌতুকে জেন সন্তুষ্ট হতে পারেনি। এতে সে অত্যাচার চালায় তার বউয়ের ওপর। গল্পের এক পর্যায়ে পার্চটা মারা যায়। তারপর থেকে তার অতৃপ্ত আত্মা রোজেমবার্গ দূর্গে ঘোরাঘুরি করতে থাকে। এই পার্চটাও কিন্তু, সাদা রঙয়ের গাউন পরে ঘুরে বেড়ায়।
এইরকম আরেকজন নারীর আত্মা ঠিক ওই সাদা কাপড়েই ঘুরে বেড়ান ব্রাজিলের রাস্তা-ঘাটে। ইনি কিন্তু আমাদের দেশীয় ভূতের মতন পথিককে ধরে কিছু জিজ্ঞেস করেন না। অত্যন্ত হৃদয়বিদারক সুরে নিজের দুঃখের কাহিনী বর্ণনা করতে থাকেন। ব্রাজিলের ফোকলোর সংগ্রাহক, লুইস ডি গামারা’র মতে এই ব্যাপারটির সাথে অনার কিলিং বা পরিবার এবং সম্প্রদায়ের সম্মান রক্ষার্থে হত্যার ব্যাপারটি জড়িয়ে আছে। হয়তো মেয়েটি তার বাবা-ভাই বা স্বামী কারো হাতেই নিহত হয়েছিলো।
ঠিক একই রকম ভাবে সাদা কাপড়ে এক মহিলা ঘুরে বেড়ান ফিলিপিন্সের কুইজোন সিটির রাস্তায় রাস্তায়। কুইজোনের ট্যাক্সি ড্রাইভারেরা নাকি তাকে অনেকবার দেখেছে। ওই অঞ্চলের রাস্তায় যত সড়ক দুর্ঘটনা ঘটে তার জন্যও ওই নারীর প্রেতাত্মাকে দায়ী করা হয়। ওই অঞ্চলের অধিবাসীদের বিশ্বাস, ওই নারী দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে জাপানি সৈন্যদের দ্বারা নির্যাতিত হয়ে মৃত্যুবরণ করেন। ঘটনাটি ওই সময়ে ফিলিপাইনে জাপানি সৈন্যদের নির্যাতনের সাক্ষ্য বহন করে।

উইচ হান্ট

এই সমস্ত ঘটনা থেকে আমরা যে সিদ্ধান্তে আসতে পারি, তা হচ্ছে আমরা এতদিন ধরে যে ভৌতিক ব্যাপারে কথা বলে আসছিলাম তা আসলে শুধুমাত্র একটি অলৌকিক সত্ত্বার চাইতেও বড় কিছু। এই সম্বন্ধে প্রথমেই উদাহরণ হিসেবেই জ্যাক ডেরিডার কথা বলা যেতে পারে, প্যারাসাইকোলজিস্ট জ্যাক ডেরিডা, যিনি ১৯৯৪ সালে বলেছিলেন যে – এই হন্টিং বা ভূত দেখার ব্যাপারটি আসলে প্রতিটি সমাজেই গুরুত্বপূর্ন। কেননা সমাজ বা রাষ্ট্রের থেকে যে উপাদানগুলি সরিয়ে ফেলা হয়েছে, যে ব্যক্তিগণ সবার চোখের আড়ালেই নির্যাতিত হয়ে এই সমাজ থেকে বিদায় নিয়েছে তাঁদের একটি চিহ্ন হচ্ছে এই “ভূত দেখা”।

আরেক প্যারাসাইকোলজিস্ট এভেরি গর্ডনে ১৯৯৭ সালে করা উক্তিটিও খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ভূতের সংজ্ঞা সম্পর্কে তাঁর সম্পূর্ণ ইংরেজি উক্তিটিই তুলে দেয়ার চেষ্টা করছি –

“That special instance of the merging of the visible and the invisible, the dead and the living, the past and the present who become a crucible for political mediation and historical memory.”

অর্থাৎ গর্ডন সাহেব – দৃশ্যমান এবং অদৃশ্য, মৃত এবং জীবিত, অতীত এবং বর্তমানের সেই মিলিত রূপকে বুঝিয়েছেন যা কিনা রাজনীতি এবং ইতিহাসের কঠিন পরীক্ষা নিতে সক্ষম।

তাহলে, পুরো ব্যাপারটি আসলে কি দাঁড়াচ্ছে? ভূত, প্রেত, ডাইনী, পেত্নী এ সবই কিন্তু মানুষের কল্পনা । কিন্তু তারপরেও বিশ্বের প্রতিটি প্রান্তে নানান সময়ে এই ব্যাপারগুলি মানুষকে আতঙ্কিত করেছে। এদের দেখা পেয়েছেন বলে দাবী করেন এমন মানুষেরও অভাব নেই। ভূত দেখে হার্টফেল করে মরেছেন এমন মানুষ গুণে শেষ যাবে না। কেন এমনটি হলো? এই পুরো ব্যাপারটিই আসলে একটি কালেক্টিভ ইমাজিনেশন বা সমন্বিত কল্পনা বা সামাজিক কল্পনা। মানুষ প্রাণীটির সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হচ্ছে তার বিবেক। বিবেকের কাছে প্রতিটি মানুষই তার কৃতকর্মের জন্য দায়ী থাকে। তাই কোন অপরাধ করার পর অপরাধবোধ থেকে সে সহজে মুক্তি পায় না। এই মানব সমাজ যে এত দূর এগিয়েছে তার পেছনে রয়েছে নানা অপকর্মের ইতিহাস। সেটা উইচ হান্টিং হোক, অনার কিলিং হোক কিংবা হোক কোন গণহত্যা। পুরো মানব সমাজ এই বংশানুক্রমিক ভাবেই এই অপরাধবোধের দায়ভার থেকে এখনো মুক্ত হতে পারেনি। এছাড়া যখন সমাজের কোন ব্যক্তির ওপর কোন অন্যায় ঘটে আর পুরো সমাজ চুপ করে তা দেখে, তখন অপরাধীর সাথে সাথে ওই সমাজও আসলে দায়ী হয়ে পড়ে। এই অপরাধবোধ থেকে সমাজ মুক্ত হতে পারে না। তখনই সৃষ্টি হয় এই সামাজিক হ্যালুসিনেশনের। আর যেহেতু এই পিতৃতান্ত্রিক সমাজে বারবার নারীরা নির্যাতিত হয়ে এসেছে। সেহেতু এই সমাজের কল্পনায় ওই পেত্নী, ডাইনী বা চুড়েইলের রূপে নারীই বারবার হাজির হয়েছে।

 

লেখকঃ সাধারণ সম্পাদক, এআইএসডিএফ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

Leave a Reply