নিরো: দ্য লাস্ট এমপেরর

বাঁশি বাজানোর ইচ্ছে যখন তুঙ্গে, বড় ভাই অবশেষে রাজি হল যে আমাকে শেখাবেন। বাঁশি নিয়ে একথা-সেকথায় হঠাৎ মনে পড়লো রোম আর নিরুর কথা। যদিও এ নিয়ে যথেষ্ট বিতর্ক আছে, তারপরেও পাঠ্যবইয়ের সেই ইংরেজি প্রবাদবাক্য “Nero was fiddling while Rome burns.” -এর কল্যাণে সে গল্প নিয়ে বরাবরই আমার একটা আগ্রহ ছিলো। ইতিহাস যাদের কাছে রসকষহীন লাগে, রোমের রাজধিরাজ নিরোর বিস্ময়কর চরিত্র কৌতূহল জাগিয়েই ছাড়বে।

কে এই নিরো?

গ্র্যান্ড-আঙ্কেল ক্লডিয়াস নিরোকে উত্তরাধিকারী হিসেবে দায়িত্ব পালনের লক্ষ্যে দত্তক সন্তানরূপে গ্রহণ করেছিলেন। ক্লডিয়াসের মৃত্যুর পর ১৩ অক্টোবর, ৫৪ তারিখে নিরো সম্রাট হন। খুব সম্ভবত, ক্লডিয়াস নিরো’র মা এগ্রিপ্পিনা দি ইয়াঙ্গার কর্তৃক নিহত হয়েছিলেন। নিরোকে ক্লডিয়াসের পুত্র ব্রিটানিকাসের কাছ থেকে ক্ষমতা গ্রহণ নিশ্চিতকল্পে ইয়াঙ্গার এ পদক্ষেপ নেন বলে শোনা যায়।

ইতিহাস থেকে জানা যায়, রোমান সাম্রাজ্যের পঞ্চম সম্রাট ছিলেন তিনি। জুলিও-ক্লডিয়ান রাজতন্ত্রের সর্বশেষ রোমান সম্রাট এই নিরো রোমান সাম্রাজ্যের সবচেয়ে অজনপ্রিয় সম্রাট ছিলেন। ক্ষমতার অপব্যবহার তার চেয়ে বেশি আর কেউ করেছে বলে মনে হয় না। হত্যা, রক্তপাত তার জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ যেন। অসংখ্য হত্যাকান্ডের মূল হোতা সম্রাট নিরো নিজের মা’কে হত্যা করেন, এমনকি বিষ খাইয়ে মেরেছেন সৎ ভাই ব্রিটানিকাসকেও। প্রচলিত আছে, নিরো নাকি তার প্রথম স্ত্রী অকটাভিয়াকেও হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন। এই তো গেল তার ব্যক্তিজীবন। যে কর্মকাণ্ডের জন্য তিনি বহু আলোচিত তা হলো, রোমের অগ্নিকান্ড।

রোমের যে অগ্নিকান্ডের কথা বলা হয় সেটি ঘটেছিল ১৯ জুলাই, ৬৪ খ্রিষ্ট-পূর্বাব্দে। এটি ছিলো রোমের ইতিহাসের সর্ববৃহৎ অগ্নিকাণ্ড। ছয়দিন ধরে জ্বলতে থাকা আগুনের শিখায় রোমের ১৪টি জেলার ১০টিই আগুনে পুড়ে যায়।

রোমবাসীর ধারণা, এই অগ্নিকান্ড সম্রাট নিরো নিজেই ঘটিয়েছিলেন। কারণ, ধ্বংসস্তূপের জায়গায় তিনি তার অবিস্মরণীয় স্থাপত্যকর্ম “ডোমাস অরিয়া” বা স্বর্ণগৃহ নির্মান করতে চেয়েছিলেন। এই ধারণা আরো সত্য প্রতীয়মান হয়, যখন দেখা যায় যে অগ্নিকান্ডের পর ধ্বংসস্তূপে নিরো তার স্থাপত্যকর্ম তৈরির জন্য মরিয়া হয়ে ওঠেন। এর জন্য প্রচুর অর্থের দরকার হয়ে পড়েছিল। যা পেতে তিনি রাজ্যের কর বাড়ান, মন্দিরগুলো থেকে অর্থ তুলতে শুরু করেন। এমনকি অনেকের সম্পত্তি পর্যন্ত বাজেয়াপ্ত করেন।

এ ঘটনার সবচেয়ে চমকপ্রদ যে তথ্য পাওয়া যায় তা হল-রোম যখন আগুনে পুড়ছিল, নিরো নাকি তখন তার প্রাসাদের বারান্দায় দাঁড়িয়ে বেহালা বাজাচ্ছিলেন। শুনতে হাস্যকর হলেও দূর্ঘটনার ভয়াবহতায় তার এহেন কাজ নির্মমতা কেই বলিষ্ঠ ভাবে ফুটিয়ে তোলে। মূদ্রার অপর পিঠ দেখলে ভিন্ন তথ্য পাওয়া যায়। যেখানে-
নিরো নিজে এই অগ্নিকাণ্ডের পেছনে খৃষ্টানদের দায়ী করেন। শাসনামলের প্রথম দিকে খৃষ্টানদের উপর চালানো অমানুষিক অত্যাচারের প্রতিশোধ নেয়ার জন্যে এই অগ্নিকাণ্ড ঘটাতে পারে বলে নিরো মনে করেন। যুক্তি দিয়ে বিচার করলে এসব গল্পের অনেক কিছুই ভুল বলে প্রতীয়মান হয়।
যেমন, প্রাচীন রোমে বেহালার অস্তিত্ব ছিল না। সংগীতের ইতিহাস নিয়ে যারা গবেষণা করেন তাদের দাবি ১১ শতাব্দীর আগে বেহালা আবিষ্কার হয়নি। যদি নিরো কিছু বাজিয়েও থাকেন সেটা হয়তো কিথারা, যা চার থেকে সাত স্ট্রিং এর ভারী কাঠের তৈরি সুরযন্ত্র।
তবে এটা দ্বারা কিন্তু প্রমাণ হয় না যে নিরো আসলেই অগ্নিকাণ্ডের সময় কোনো যন্ত্র বাজাচ্ছিলেন। ঐ সময়ে জীবিত ইতিহাসবিদদের মধ্যে দিও ক্রাইসোসতম, প্লুতার্ক এবং এপিকটেটাস এ বিষয়ে কোন মন্তব্য করেননি। আগুনের ভয়াবহতা সম্বন্ধে সেনেকা পলকে চিঠিতে লিখেছিলেন যে, একশত ত্রিশটি ঘর এবং চারটি ব্লক ছয়দিনের মধ্যে ভস্মিভূত হয়ে যায়। এ হিসাবে কমপক্ষে শহরের এক-দশমাংশ পুড়ে যায়।

রোম নগরী পুড়ছে। শিল্পীর চোখে- “দ্যা গ্রেট ফায়ার অফ রোম”।

রোম নগরী পুড়ছে। শিল্পীর চোখে- “দ্যা গ্রেট ফায়ার অফ রোম”। ঐ সময় রোমে ১,৭০০ ব্যক্তিগত গৃহ এবং ৪৭,০০০ ইনসুলা ছিল। ক্যাসিয়াস দিও বলেছেন যে, ঐ সময়ে সম্রাট নিরো মঞ্চের পোশাক পরিহিত অবস্থায় গ্রীক মহাকাব্য ইলাপারসিস থেকে গান গাচ্ছিলেন। এছাড়াও, টাসিটাসের মতে অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরো ৩৫ মেইল দূরে অ্যান্টিয়ামে ছিলেন এবং লির বাদ্যযন্ত্র সহযোগে গান গাচ্ছিলেন। নগর পুড়ে যাবার খবরটিকে তাচ্ছিল্যের সাথে গুজব বলে উড়িয়ে দেন।

প্রাচীন রোমের ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস এর মতে- অগ্নিকাণ্ডের সময় নিরো আগুনের খবর শুনে স্বভাবতই তিনি দ্রুত রোমে ফিরে যান এবং ত্রাণকার্যক্রম শুরুর উদ্যোগ নেন। নিজস্ব তহবিল থেকে এর যাবতীয় ব্যয়ভারও তিনি বহন করেন। এমনকি যে প্রাসাদে দাঁড়িয়ে তিনি বেহালা বাজাচ্ছিলেন বলে গুজব প্রচলিত, সেখানে তিনি বরং গৃহহীনদের আশ্রয় দেন। তাদের মধ্যে খাদ্যসামগ্রীও বিতরণ করেন এমনটাই বলেন ইতিহাসবিদ ট্যাসিটাস ।

এখানে উল্লেখযোগ্য যে ট্যাসিটাস নিজে কিন্তু একদমই নিরো সমর্থক ছিলেন না। তিনি বরং ব্যাক্তিগতভাবে নিরোর অন্যান্য অপকর্মের জন্যে ঘৃণা আর ধিক্কার পোষণ করতেন।

তাহলে নিরো সম্পর্কে কেনো এই গুজব ছড়ানো হয়েছিল? যা আবার এমনই এক গুজব যেটি পাঠ্যপুস্তকে পর্যন্ত প্রবাদ বাক্য হিসেবে বহুল প্রচলিত হয়ে গিয়েছে। বস্তুত, সম্রাট নিরো রোম পুড়ে যাওয়ার সময় বেহালা বাজাচ্ছিলেন এই কথাটি ছড়ানো শুরু হয় ওই অগ্নিকান্ডের দেড়শ বছর পর থেকে! আর এই কাহিনীটি রচনা করেছিলেন ক্যাসিও ডিও।

মানুষেরই বা কি দোষ! যা রটে তার কিছু তো বটে। গুজবটি মানুষকে বিশ্বাস করতে শুরু করে নিরোর কারণেই। তিনি অগ্নিকাণ্ডের পর সেখানে তার স্বপ্নের ডোমাস অরিয়া (Domus Aurea) বা স্বর্ণগৃহ নির্মাণ শুরু করেন। আর এই ডোমাস অরিয়া স্থাপত্যকলার এক অনন্য নিদর্শন। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই অনন্য নিদর্শনের কারণে মানুষ তাকে মনে রাখবে না। কারণ,অগ্নিকাণ্ডের দায়ভার খৃষ্টানদের উপর চাপিয়ে তাদের হত্যা করা এবং ধ্বংসস্তূপের উপরই এই প্রাসাদ নির্মাণ শুরু করার মাধ্যমে নিরো নিজেই নিজেকে ভিলেন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করার সুযোগটি দিয়ে গিয়েছেন। এটিই হয়ত পোয়েটিক জাস্টিস!

লেখকঃ শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

Leave a Comment