রেসকোর্সের সেই বিকেলে…

তাসফিয়া ফারাহ

বাংলাদেশ নামে যে স্বাধীন রাষ্ট্রে আজ আমরা বসবাস করছি তার উত্থানের সুদীর্ঘ ইতিহাসটা অনেকরই জানা। এই স্বাধীনতার সূর্য উদিত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চে স্বাধীনতা ঘোষণার পর থেকে আর সেই সূর্য ঠিক মধ্যাকাশে অনন্তকালের জন্য দেদীপ্যমান হয়ে রইলো ১৬ ডিসেম্বর ভারতীয় সেনাবাহিনীর কাছে পরাক্রমশালী পাকস্তানি সেনাবাহিনীর আত্মসমর্পণের মাধ্যমে। এই আত্মসমর্পণের পিছনে ভারতের অবদান কখনোই ভুলবার নয়৷ বাংলাদেশের মুক্তিবাহিনী ও ভারতীয় সেনাদের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে পাক বাহিনী নতি স্বীকার করতে বাধ্য হয়। কিন্তু এই যুদ্ধে ভারতের সংশ্লিষ্টতার শুরু হলো কীভাবে? শুধুই কি গণতন্ত্রের প্রতি সমর্থন সংশ্লিষ্ট আবেগ আর ভৌগোলিক নৈকট্যই ভারতের বাংলাদেশকে এমন অভূতপূর্ব সমর্থন দেওয়ার কারণ? একটু গভীরভাবে ভাবলে প্রাচীন ভারতীয় অর্থনীতিবিদ, দার্শনিক ও রাজ-উপদেষ্টা চাণক্যের সেই বিখ্যাত বাণীটির সার্থকতা স্পষ্ট হবে – “শত্রুর শত্রু আমার মিত্র।” ১৯৪৭ সালে ১৫ আগস্ট ব্রিটিশ শাসন থেকে স্বাধীনতা লাভের ফলে “ভারত প্রজাতন্ত্র” ও “ইসলামী প্রজাতন্ত্র পাকিস্তান” নামে দুটি স্বাধীন রাষ্ট্রের উদ্ভব ঘটে। জন্মের শুরু থেকেই এই রাষ্ট্র দুটির মাঝে বিভিন্ন কারণে দ্বন্দ্বের সূত্রপাত হয় যার ফলশ্রুতিতে পরবর্তীতে একাধিকবার যুদ্ধ পর্যন্ত সংঘটিত হয়।

যৌথ বাহিনীর আক্রমণে পাক বাহিনী যখন ক্রমশ কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল তখন তারা আত্মরক্ষার কৌশল হিসেবে জাতিসংঘের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন অনুভব করে। এর প্রেক্ষিতে পাকিস্তান ১৯৭১ সালের ৩ ডিসেম্বর ভারতীয় বিমানঘাঁটিগুলোতে অতর্কিত বোমাবর্ষণ এবং পশ্চিম সীমান্তের বিভিন্ন স্থানে আর্টিলারি গোলা নিক্ষেপ শুরু করে। এর মাধ্যমে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধে রূপ নেয়। এই অতর্কিত আক্রমণের কারণ হলো, পাকিস্তান ভেবেছিলো, বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে দুই দেশের মধ্যকার যুদ্ধ হিসেবে দেখানো গেলে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ যুদ্ধবিরতি দেওয়ার প্রস্তাব করবে এবং উভয় দেশে পর্যবেক্ষক নিয়োগ করবে। এতে করে পাকিস্তানী শাসকেরা বাংলাদেশের মাটিতে অবস্থান করতে পারবে অনির্দিষ্টকালের জন্য এবং বাঙালিদের প্রতি তাদের শোষণ ও শাসন অব্যাহত রাখতে পারবে। কিন্তু পাকিস্তান-পরিকল্পিত যুদ্ধবিরতির বিপক্ষে আন্তর্জাতিক মতামত গঠনে ভারত সফল হওয়ায়, বিশেষত জাতিসংঘে সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন থাকায়, ভারতীয় বাহিনী মুক্তিবাহিনীর সহায়তায় অতি দ্রুত বাংলাদেশে ঢুকে পড়ে। ফলে পাকিস্তানের যুদ্ধ বিরতির পরিকল্পনা পুরোপুরি ভেস্তে যায়। উল্লেখ্য, ৬ ডিসেম্বর ভারত বাংলাদেশকে সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেয়। এতে স্পষ্ট হয়ে যায় যে, পাকিস্তান থেকে পূর্ব পাকিস্তানের বিযুক্তি কেবল সময়ের অপেক্ষা। ইতোমধ্যে, যৌথ বাহিনীর প্রবল আক্রমণের মুখে পাক বাহিনীর অনেক সৈন্য বাংলার অন্যান্য অঞ্চল থেকে আত্মরক্ষার্থে পালিয়ে আসা শুরু করেছিল ঢাকার দিকে। যুদ্ধের মাঠেও পাকিস্তান প্রায় কোণঠাসা। এই অবস্থায় ১৯৭১ সালের ৯ ডিসেম্বর পূর্ব পাকিস্তানের তৎকালীন গভর্নর এম. এ. মালিক রাষ্ট্রপতি ইয়াহিয়া খানকে বার্তা পাঠিয়ে দ্রুত এই যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য অনুরোধ করেন। ইয়াহিয়া খান এম. এ. মালিক ও পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল নিয়াজী উভয়কেই তাদের বিবেচনা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করার আদেশ দেন। চূড়ান্ত নাটকের অবশ্য তখনো বাকি। ১৩ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে পাক-ভারত যুদ্ধ প্রশ্নে আলোচনা শুরু হলে পোল্যান্ড খসড়া আকারে একটি প্রস্তাব রাখে। তাতে বলা হয়, রাজনৈতিক সমাধানের লক্ষ্যে ৭২ ঘণ্টার জন্য যুদ্ধবিরতি কার্যকর হবে। এই সময়ের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তান থেকে পাকিস্তানি সেনা প্রত্যাহার শুরু হবে এবং সেখানকার নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরিত হবে। যেহেতু প্রস্তাবক পোল্যান্ড, ফলে ভাবা যেতে পারে, এর পেছনে সোভিয়েত সমর্থন ছিল। দেশের অখণ্ডতা চাইলে পাকিস্তানের এই প্রস্তাব লুফে নেওয়ার কথা। কিন্তু বিজয় যখন দ্বারপ্রান্তে, সে সময় যুদ্ধবিরতি কার্যকর করা ভারত ও বাংলাদেশ উভয়ের জন্যই হবে আত্মঘাতীস্বরূপ। ইতিমধ্যে গভর্নর মালিক ১৪ ডিসেম্বর অবস্থা পর্যবেক্ষণের জন্য দুপুর ১২ টায় গভর্নর হাউসে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের একটি সভা ডাকেন। কিন্তু এই সভার সংবাদ সকাল সাড়ে নয়টায় ভারতীয় বাহিনীর সিগন্যাল ইন্টিলিজেন্সের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা লে. কর্নেল পি সি ভাল্লা পেয়ে যান এবং তা দ্রুত টেলিফোনে এয়ার ভাইস মার্শাল দেবাসেরকে জানান। আত্মসমর্পণের ঘটনাটিকে আরো ত্বরান্বিত করার জন্য দেবাসের গভর্নর হাউজে বিমান হামলা করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী সভা শুরু হবার আগেই গভর্নর হাউজে বেশ কয়েকটি বোমা নিক্ষিপ্ত হয় এবং গভর্নর মালিক ভীত হয়ে পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আশ্রয় নেন। এরপর জেনারেল নিয়াজী পাকিস্তানের সেনাপ্রধান জেনারেল হামিদকে অনুরোধ করেন যেন ইয়াহিয়া খান যুদ্ধ বন্ধ করার জন্য পদক্ষেপ নেন।

সলাপরামর্শের জন্য আরও সময়ের দরকার, এই যুক্তিতে ১৪ ডিসেম্বর নিরাপত্তা পরিষদে কার্যত কোনো বৈঠক হয়নি। ১৫ তারিখে যখন ঢাকায় পাকিস্তানি সেনা আত্মসমর্পণের প্রস্তুতি শুরু হয়ে গেছে—পরিষদের সভা বসল। ১৬ ডিসেম্বর ঢাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পণ নিষ্পন্ন হয়, কিন্তু নিরাপত্তা পরিষদ তখনো কোনো মতৈক্যে আসতে পারেনি। ভারত জানিয়ে দেয়, সে একতরফা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করছে। একদিন পর ইয়াহিয়া খান জানালেন, তিনিও যুদ্ধবিরতিতে সম্মত। এর চার দিন পর, ২১ ডিসেম্বর, নিরাপত্তা পরিষদ অবশেষে কোনো ঝামেলা ছাড়া এক প্রস্তাব গ্রহণ করে। সেই প্রস্তাবে বলা হলো, ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যুদ্ধবিরতি স্থায়ী হতে হবে এবং ভারত ও পাকিস্তানকে নিজেদের সেনা যার যার সীমান্তের পেছনে ফিরিয়ে নিতে হবে।

আত্মসমর্পণ অবশ্য নিষ্পন্ন হয় ১৬ ডিসেম্বরেই। আত্মসমর্পণের জন্য সময় নির্ধারণ করা হয় বিকেল সাড়ে ৪টা। ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর সকাল ১০:৪০ মিনিটে ঢাকায় প্রবেশ করে ভারতীয় সেনাবাহিনী। বিকাল বেলায় ঢাকার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকে সাজানো হয় এক ঐতিহাসিক বিজয়ের মুহূর্তের জন্য। বিকেল ৪টায় ভারতের ইস্টার্ন কমান্ডের প্রধান ও ভারত-বাংলাদেশ যুগ্ম কমান্ডের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট জেনারেল জগজিৎ সিং অরোরা, বাংলাদেশ মুক্তিবাহিনীর ডেপুটি চীফ অব স্টাফ গ্রুপ ক্যাপ্টেন আব্দুল করিম খোন্দকার এবং ভারতের অপরাপর সশস্ত্রবাহিনীর প্রতিনিধিগণ ঢাকা অবতরণ করেন। অবশেষে বিকাল ৪ টা ৩১ মিনিটে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর জেনারেল আমির আবদুল্লাহ খান নিয়াজী আত্মসমর্পনের দলিলে জেনারেল জগজিত সিং অরোরার সামনে সই করেন। মাত্র আধ ঘণ্টার মাথায় এই আত্মসমর্পণের প্রক্রিয়াটি সমাপ্ত হয়। এই আত্মসমর্পণের খবর দ্রুত সারা বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়ে এবং বাংলার মুক্তিকামী সাধারণ জনতা উল্লাসে ফেটে পড়ে। এরই মাধ্যমে অবসান ঘটে বাঙালির কয়েক শতাব্দীর শোষণের ইতিহাসের, মুক্ত হয় বহু দিনের বঞ্চনার শিকল এবং বাঙালি ফিরে পায় তার বহু আরাধ্য স্বাধীনতার স্বাদ।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply