রেডক্লিফ লাইন

১৯৪৭ সালের ১৪ ও ১৫ আগস্ট, বিশাল ভারতবর্ষ ভেঙ্গে জন্ম হয় দু’টি রাষ্ট্রের। ভারত, পাকিস্তান। প্রায় একই রকম ভাষা, সংস্কৃতির ভূখন্ডের মাঝে শুধুমাত্র ধর্মের ভিন্নতার কারণে চলে আসে কাঁটাতারের দেয়াল। নিজের ভিটেমাটি ছেড়ে চলে যেতে হয় বহু বাঙ্গালী হিন্দু-মুসলিম পরিবারের। এই বিতর্কিত সীমানাখন্ডনের দ্বায়িত্বে ছিলেন এমন সিরিল র‍্যাডক্লিফ যিনি আগে কখনো ভারতে আসেননি, জানতেন না ভারতবর্ষের সংস্কৃতি, জনতত্ত্ব সম্পর্কে। র‍্যাডক্লিফের ভোঁতা কাঁচি যেভাবে আলাদা করে দিয়েছিলো একটি দেশকে সে গল্পই কাকাড্ডা ডট কমে লিখেছেন শেখ সাঈদ

 

১৯৪৭ সালে ভারতে যখন ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের অবস্থা ছিল চরমে, ঠিক তখনই রাণী ভিক্টোরিয়ার নাতি লর্ড মাইন্টব্যাটেন ভাইসরয় হিসেবে ভারতে আসেন। সাম্প্রদায়িকতা তখন ভারতকে কুঁকড়ে খাচ্ছিল। কংগ্রেস চাচ্ছিল অখন্ড ভারত, আর মুসলিম লীগ দ্বিজাতি তত্ত্ব আঁকড়ে ধরে ভারতীয় মুসলিমদের আলাদা এক রাষ্ট্র পাকিস্তানের দাবি জানাচ্ছিল। সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এড়াতে মাউন্টব্যাটেন তাই দ্বারস্ত হচ্ছিলেন ভারতীয় রাজনীতিবিদদের কাছে। এতকিছুর পরও যখন লর্ড মাইন্টব্যাটন কোনো সমাধানে আসতে পারছিলেন না, তখনই ভারতে নিয়ে আসা হয় ব্রিটেনের চ্যান্সরি বারের দক্ষ আইনজীবী সিরিল র‍্যাডক্লিফকে। ব্রিটেনে এই আইনজীবীর ব্যাপক খ্যাতি আর সাফল্য থাকলেও ভারতের ব্যাপারে তাঁর আগ্রহ এবং অভিজ্ঞতা ছিল প্রায় শূন্যের কোটায়। তাই মজা করেই বিবিসির এক ডকুমেন্টারিতে তাকে নিয়ে বলা হয়েছে,

“Radcliffe, a man who had never been east of Paris, was given the chairmanship of the two boundary committees set up with the passing of the Indian Independent Act.”

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর ইংরেজরা দ্রুত ভারত ছাড়ার সিদ্ধান্ত গ্রহন করে। পাশাপাশি কংগ্রেসের নেহেরু আর মুসলিম লীগের জিন্নাহও তাদের কাজ দ্রুত করার জন্য তাগাদা দিচ্ছিলেন। তাদের মনে সন্দেহ কাজ করছিল যে, যদি ব্রিটিশরা তাদের স্বীকৃতি দিতে বিলম্ব করে পরে আবার তারা তাদের শাসন বহাল রাখার নীতিতে পরিবর্তিত হতে পারে। এইসব বিবেচনায় নিয়ে লর্ড মাইন্টব্যাটেনও ছিলেন চাপের মুখে। তাই মাইন্টব্যাটেন র‍্যাডক্লিফকে ৫ সপ্তাহ সময় বেঁধে দেন সমগ্র ভারতবর্ষকে ভাগ করার জন্যে। র‍্যাডক্লিফের কাছে ভালো কোন মানচিত্র এবং জনসংখ্যার ব্যাপারে কোন স্পষ্ট তথ্য ও উপাত্ত না থাকায় তিনি মোটামুটি ভালো রকমের বিপাকেই পড়েছিলেন। তাছাড়া ভারত নিয়ে কোন আগ্রহ না থাকায় তিনি কলমের খোঁচাতেই ভারত-পাকিস্তান কে ভাগ করে ফেললেন খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে। তিনি দু’টো দেশকে ভাগ করার ক্ষেত্রে ধর্মকে মানদন্ড হিসেবে ব্যবহার করেছিলেন। তাই হিন্দু অধ্যুসিত অঞ্চলকে ভারত আর মুসলিম অধ্যুসিত অঞ্চলকে পাকিস্তানের আওতায় দিয়ে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কোন রকম চিন্তাভাবনা ছাড়াই যেখানে হিন্দু-মুসলিম প্রায় সমান সেখানে কি হবে তার সমাধান না করেই সেসব অঞ্চলকে দুই দেশের মধ্যে ভাগ করে দেয়া হয়। যার ফলশ্রুতিতে পূর্বাংশে বাংলা ও পশ্চিমাংশে পাঞ্জাবকে দ্বিখন্ডিত করা হয়েছিল। পাঞ্জাবের একটি অংশ পাকিস্তানের সাথে (পাঞ্জাব প্রদেশ) আরেকটি অংশ ভারতের সাথে (পাঞ্জাব স্টেট) হিসেবে গড়ে উঠে। তাই আজকে আমরা ভারত এবং পাকিস্তান উভয় দেশেই পাঞ্জাব প্রদেশের অস্তিত্ব দেখতে পাই। শুধুমাত্র ধর্মের ভিত্তিতে বাংলার পূর্বাংশকে পাকিস্তানের সাথে এবং পশ্চিম বঙ্গকে ভারতের সাথে দিয়ে দেয়া হয়। এই ভারত-পাকিস্তানকে ভাগকারী সীমান্ত রেখাই হচ্ছে র‍্যাডক্লিফ লাইন। দক্ষ আইনজীবী র‍্যাডক্লিফের নামানুসারেই এই রেখার নাম রাখা হয়েছে র‍্যাডক্লিফ রেখা।

র‍্যাডক্লিফের কাঁচিতে ভাগ হয়ে যায় একটি দেশ

এই র‍্যাডক্লিফ রেখা ৪০ কোটি মানুষের পরিচয়কে খুবই অল্প সময়ের মধ্যে ভাগ করে দেয়। যার ফলাফল ছিল অত্যন্ত ভয়াবহ। এতকাল যারা একসাথে বসবাস করে আসছিল তারাই হঠাৎ আলাদা হয়ে গিয়েছিল শুধুমাত্র কলমের দাগে দাগকাটা এক রেখার দ্বারা। এই রেখার কারণে সরাসরি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল প্রায় ১ কোটি ২০ লক্ষ মানুষ। র‍্যাডক্লিফ ১৯৪৭ সালের ১৭ আগস্ট তার পুর্নাঙ্গ মানচিত্র প্রকাশ করেন এবং এটা প্রাকাশ হবার সাথে সাথেই চারদিকে ছড়িয়ে পরে দাঙ্গা। কারণ যেসকল হিন্দু এতদিন পাকিস্তানে বসবাস করছিল তারা ভারতের অংশে চলে যেতে শুরু করে এবং কিছু কিছু ক্ষেত্রে মুসলমানদের সাথে বিবাদে জড়িয়ে পড়ে। অন্যদিকে যেসব মুসলমান ভারতের অংশে পড়েছে তাদেরকেও ভারত অংশে চলে যেতে বাধ্য করা হয়। যার ফল ছিল হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে চরম পর্যায়ের বিবাদ এবং তারা অনেকেই সরাসরি একে অপরের সাথে হত্যাকান্ডে লিপ্ত হয়। এতে করে কতজন প্রাণ হারায় তার কোনো সুস্পষ্ট পরিসংখ্যান না মিললেও অনুমান করা হয় প্রায় ৫ থেকে ১০ লক্ষ হিন্দু-মুসলমান প্রাণ হারায়। লাখ লাখ মানুষ নিজেদের আপন আর পরিচিত ঘরবাড়ী ছেড়ে পাড়ি জমাতে শুরু করে অন্যত্র, অজানা আর অচেনা জায়গায়। নিজেদের পৈত্রিক ভিটা ছেড়ে যাওয়ার এই দৃশ্য ছিল অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। শুধু এখানেই থেমে থাকেনি, শহর ও গ্রামে উভইয়ের ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানেই আগুন জ্বালিয়ে দেয়া হয় এবং ভেঙ্গে ফেলা হয় মন্দির ও মসজিদ।

কলকাতার হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা

নারী নির্যাতনের মাত্রা ছিল কল্পনাতীত। নির্যাতিত হয় প্রায় ৭০ হাজার নারী। তখন সীমান্ত অঞ্চল গুলোতে শরণার্থীরা ভীড় জমাতে শুরু করে। শুধুমাত্র ব্রিটিশ তথ্যের ভিত্তিতেই জানা যায় যে, ৬০০ শরণার্থী শিবির গড়ে উঠে। কিন্তু অনেকের মতেই এই শরণার্থী শিবিরের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। দুই দেশ ভাগ হবার কয়েক মাস যেতে না যেতেই ১৯৪৭ সালের ২২ অক্টোবর ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে যুদ্ধ শুরু হয়ে যায়, যার স্থায়িত্বকাল ছিল প্রায় দুই বছর। সীমান্ত উত্তেজনাকে কেন্দ্র করে ১৯৬৫ সালে উভয়ের মধ্যে আবারও যুদ্ধ লেগে যায়। সবশেষে ১৯৯৯ সালে কাশ্মিরে যুদ্ধ বাঁধে এবং এর পিছনে প্রধান কারণ হচ্ছে সীমান্ত সমস্যা। সীমান্ত নিয়ে সমস্যার কারণে কাশ্মীরে প্রতিনিয়ত রক্ত ঝরছে।

র‍্যাডক্লিফ তার নিজের কাজের ফলাফল নিজের চোখেই দেখে গিয়েছিলেন। তিনি নিজেই বিবিসকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন, “অন্তত ৮ কোটি মানুষ আমাকে দেখবে ক্ষোভ নিয়ে।” তাই ভারত কিংবা পাকিস্তানে না ফিরবার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা করেই ফিরে গিয়েছিলেন নিজ দেশে। তবে ভারত-পাকিস্তান দুই দেশ ভাগ করে ভারত ছাড়ার আগেই পুড়িয়ে ফেলেন তার সব নোট। দেশে ফিরে এই বিশাল গুরুত্বপূর্ণ কাজ এত অল্প সময়ের মধ্যে সমাধান করায় ব্রিটিশ সকারের কাছ থেকে পান নাইট উপাধি। কিন্তু সিরিল র‍্যাডক্লিফের খামখেয়ালির বশে টানা এই লাইন আর তড়িঘড়ি করে নির্ধারণ করা সীমান্ত আজও ভারতবর্ষে রয়ে গেছে গলার কাটার মতো; যে কাঁটা কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে দুই দেশের মাঝে বিরাজমান স্নায়ুযুদ্ধের।

রেফারেন্সঃ

  • রোয়ার বাংলা।
  • বিবিসি ডকুমেন্টারি। 
  • অন্যান্য অন্তজালিক মাধ্যম।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

 

 

Leave a Comment