ক্রিয়েশন মিথঃ অন্য আলোয় সৃষ্টতত্ত্ব (পর্ব-১)

মিথ শব্দটা এসেছে গ্রীক ‘মিথোস’ থেকে যার অর্থ করলে দাঁড়ায় গল্প। আসলেও মিথ বলতে আমরা গল্পই বুঝি, রুপকথার গল্প, দেবদেবীদের গল্প, মহান সব হিরো, অ্যান্টিহিরো আর অসুরের গল্প। কিন্তু মিথ কি শুধুই গল্প? তাহলে ‘মিথোলজি’ বলে একে আলাদাভাবে সংজ্ঞায়িত করার কি প্রয়োজন ছিলো? কি দরকার ছিলো এসব রুপকথা নিয়ে মাথা ঘামানোর, বিশ্ববিদ্যালয়ে আলাদা কোর্স পর্যন্ত চালু আছে মিথোলজির উপর, কেনইবা এতকিছু?

শুধু ‘গালগল্প’ বললে আসলে মিথকে পূর্ণাঙ্গভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়না। মিথ এক বিশেষ ধরনের গল্প, যার নির্দিষ্ট অনুসারী আছে, যাকে মানুষ সত্য বলে বিশ্বাস করতো (এখনো করে), এবং যুগ যুগ ধরে যা প্রচলিত, কালের আবর্তে মুছে যায়নি।

মিথোলজির এক গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে ক্রিয়েশন, সৃষ্টিতত্ত্ব । মানুষ যতই ভাবতে শিখেছে, ততই সে প্রকৃতিকে নিজের মতো ব্যাখ্যা করতে চেয়েছে। যেসব ব্যাপারে সে কোনো ব্যাখ্যা খুঁজে পায়নি, সেসব ক্ষেত্রে কাজে লাগিয়েছে নিজের কল্পনাশক্তি। ক্রিয়েশনের ক্ষেত্রেও একই ব্যাপার প্রযোজ্য। ক্রিয়েশনকে মানুষ ডিফাইন করেছে কল্পনা দ্বারা, যেহেতু এ ব্যাপারে উপসংহারে যাওয়ার মতো কোনো এভিডেন্স মানবজাতির ছিলোনা।

উদ্ভট সব গল্পের সন্ধান আমরা পাই ক্রিয়েশন নিয়ে। হাজার হাজার জাতির লক্ষাধিক মতবাদ রয়েছে এই ব্যাপারে। অনেকগুলোই হারিয়ে গেছে, অনেকগুলোই আসলে একই ঘটনার ভিন্ন ইন্টারপ্রিটেশন। আবার একই ঘটনা, আলাদা আলাদা পুরাণে, আলাদা আলাদা সোর্সে ভিন্নভাবে উঠে এসেছে। এখানে কিছু কমন মিথ নিয়ে আলোচনা করব। পুরো ব্যাপারটা আসলে অ্যাপেটাইজারের মতো। এই সংক্ষিপ্ত আলোচনা থেকে মিথোলজির ব্যাপ্তি আন্দাজ করা যাবেনা, তবে যদি কিছুটা আগ্রহ সৃষ্টি করে দিতে পারি তবেই এই চেষ্টা সার্থক।

এক্স নিহিলো থিওরি

এই মতবাদের সাথে আমরা সবাই পরিচিত। ‘এক্স নিহিলো’ (ex nihilo) একটা ল্যাটিন শব্দ, যার মানে দাঁড়ায় out of nothing বা শূন্য থেকে সৃষ্টি। বিগ ব্যাং থিওরিও অনেকটা এমনই, কিছুই নাই, হঠাৎই ব্যাং!

বহু ক্রিয়েশন মিথ প্রচলিত আছে এক্স নিহিলো মতবাদের উপর। পশ্চিম আফ্রিকার গিনি উপকূলের কোনো(Kono) উপজাতির মিথ এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক।

সৃষ্টির শুরুতে ছিলো অসীম শূণ্যতা, অনন্ত আঁধার (eternal darkness)। কেবল ছিলেন মৃত্যুদেবতা সা, তার স্ত্রী এবং কন্যা। সা চিন্তা করলেন, বসবাসের জন্য কিছু একটা দরকার। সেজন্য আঁধার থেকে তৈরি করলেন কাদা, কাদার সমুদ্র। সেই কাদা থেকে তৈরি করলেন প্রথম বাড়ি।

সৃষ্টিদেবতা আলাতাঙ্গানা ঘুরতে এলেন সেই বাড়িতে। তার কাছে সবকিছুই কেমন যেন নোংরা, অন্ধকার মনে হলো। তিনি ভাবলেন, আরো ভালো কিছু করা উচিত। সা আর আলাতাঙ্গানা মিলে সেই কাদাকে শক্ত মাটিতে পরিণত করলেন। তৈরি হলো পৃথিবী। পৃথিবীকে খুব বিমর্ষ মনে হলো তাদের কাছে। নিষ্প্রাণ বিমর্ষ পৃথিবীতে প্রাণ নিয়ে আনলেন আলাতাঙ্গানা, তৈরি করলেন গাছপালা, জন্তুজানোয়ার। পৃথিবী জীবন দ্বারা পূর্ন হলো।

কোনো গোত্রের এই মিথ অনুযায়ী, জীবন নয়, মৃত্যুই চিরস্থায়ী । জগতে জীবনেরও আগে মৃত্যুদেবতার আবির্ভাব।

ইজিপশিয়ান মিথ অনেকটা একইরকম, পার্থক্য হলো, এক্ষেত্রে সৃষ্টিকর্তা সূর্যদেবতা রা, যিনি নুন (Nun) নামের এক অনন্ত মহাসাগর থেকে পৃথিবীর উৎপত্তি ঘটান।

এক্স নিহিলো মতবাদের আরেক উদাহরণ পাওয়া যায় গুয়াতেমালার মায়ানদের মিথে, তাদের পবিত্র পুস্তক পোপল ভু(Popol Vuh) থেকে।

শুরুতে ছিলো কেবলই মহাশূন্য, মহানিস্তদ্ধতা। পৃথিবী ছিলো জলে পূর্ণ। মহাসাগর, মহাকাশ আর কোনো প্রকার আলোর অনুপস্থিতি – এই ছিলো তখনকার পরিবেশ। এরই মাঝে ছিলেন স্রষ্টা, সাথে পালকওয়ালা মহাসর্প(feathered serpent)।

অনন্তকাল ধরে চলা নীরবতা ভেঙে স্রষ্টা বলে উঠলেন, হও। মহাসর্পের সাথে কথা বলে গেলেন, সৃষ্টিজগতের পরিকল্পনা করলেন। তারা যাই উচ্চারণ করে গেলেন, তাই হয়ে গেলো। তৈরি হলো পৃথিবী। তবে সেই পৃথিবীতে ছিলোনা কোনো মানুষ। কিসের যেন কমতি মনে হলো স্রষ্টার কাছে। তাই সবকিছু আবার নতুন করে সৃষ্টি করা হলো।তাও পছন্দ হলোনা। আবার ভাঙা হলো সব। এইভাবে চারবার নতুন করে ভেঙেচুড়ে দুনিয়া সৃষ্টির পর অবশেষে স্রষ্টা সন্তুষ্ট হলেন। তৈরি হলো জগৎ।

আফ্রিকার বান্টু গোত্রের কাহিনী আবার একেবারেই ভিন্ন। এখানেও আমরা পাই অনন্ত সমুদ্র, অন্ধকার আর এক সৃষ্টির দেবতা, বোমবো(Mbombo)। হঠাৎ একদিন তার পেটে তীব্র ব্যাথা হলো। শরীর মুচড়ে তিনি বমি করলেন। বমির সাথে বেড়িয়ে এলো সূর্য। চারদিক হয়ে উঠলো আলোকিত। সূর্যের তাপে সমুদ্র শুকিয়ে এলো, ডাঙার দেখা মিললো। বসবাসের উপযুক্ত স্থানের সৃষ্টি হলো।

দেবতার পেটব্যাথা কিন্তু কমেনি। তিনি আরো বমি করলেন। বের হলো চন্দ্র আর তারকারাজি। তিনি বমি করতেই থাকলেন। একে একে নয়টি প্রজাতি বেরিয়ে এলো(চিতা, কাঁকড়া, সাপ, কচ্ছপ প্রভৃতি)। অবশেষে মানুষকে বমি করে বের করে দিয়ে তিনি শান্ত হলেন। তার

বমি করা উচ্ছিষ্টই আমরা, আমাদের পৃথিবী (!)।

                                                                                Mbombo vomitting the world out ; source:pinterest

 

এক্স নিহিলো মিথে একটা বিষয় স্পষ্ট। প্রাচীন সভ্যতাগুলোয় শূণ্যতাকে ডিফাইন করা হয়েছে সমুদ্র দ্বারা। উপকূলীয় জাতিদের ক্ষেত্রে মহাসাগরগুলো অসীমতাকেই তুলে ধরতো। কাজেই একদম শূণ্য থেকে নয়, বরং সীমাহীন জলরাশি থেকে পৃথিবীর সৃষ্টিই এধরনের মিথগুলোর মূল উপজীব্য।

কসমিক এগ ক্রিয়েশন মিথ

                                                                                                    

                                                                                 World is coming out of the cosmic egg source:pinterest                   

কিছু কিছু মিথ দাবী করে, বিশ্ব শূন্য থেকে সৃষ্টি হয়নি, বরং একক কোনো বস্তু (হ্যাঁ, বস্তু। সত্ত্বা নয়) থেকে। এর আদর্শ উদাহরণ হলো ডিম। ডিম ফেটে নতুন প্রাণের উদ্ভবের সাথে মিল রেখে কোনো এক মহাজাগতিক ডিম ফেটে মহাবিশ্বের সৃষ্টির কাহিনী উঠে এসেছে অনেক মিথে। হিন্দু মিথোলজির অনেকগুলো সৃষ্টিতত্ত্ব আছে। শুক্ল যজুর্বেদের শতপথ ব্রাহ্মণ সংহিতা মতে, প্রজাপতি ব্রহ্মা সর্বপ্রথম তৈরি করেন জল, তার উপর ভাসমান কসমিক এগ। সেই ডিমের খোলস তৈরি হয় পৃথিবীতে, ডিমের কুসুম থেকে বেরিয়ে আসে প্রাণিজগৎ ।

পারস্যের জোরাস্ট্রিয়ানদের মিথে মহাজাগতিক ডিম্বকে দেখা হয়েছে খলদেবতা আংরা মাইনু(Angra Mainyu aka Ahriman)র কারাগার হিসেবে। মহান দেবতা আহুরা মাজদা সৃষ্টির পূর্বে আংরা মাইনুকে বন্দি করেন এক মহাজাগতিক ডিম্বে। অতঃপর সৃষ্টি করেন এক পারফেক্ট স্পিরিচুয়াল ওয়ার্ল্ড, যেখানে ছিলনা কোনো জরা, ব্যাধি,  দুঃখ, বেদনা। এই পারফেক্ট জগৎ আংরা মাইনুকে এতটাই ক্ষিপ্ত করে তুললো যে তিনি তার কারাগার ভেঙে(ডিম ফেটে) বেরিয়ে এলেন। এতে জগৎজুড়ে সৃষ্ট আলোড়নে সূর্য ঘুরতে শুরু করে। সৃষ্টি হয় দিবারাত্রি, পর্বতমালা, উপত্যকা, নদীনালা। সৃষ্টি হয় পরিশ্রম, বেদনা এবং মৃত্যু। পারফেক্ট ওয়ার্ল্ডের সমাপ্তি ঘটে, আবির্ভাব ঘটে আজকের দুঃখময় পৃথিবীর।

কসমিক এগ মিথের মধ্যে জনপ্রিয় একটা মিথ চাইনিজ ইন-ইয়ান(Yin-yang) মিথ।

                                                                                                     

Yin-yang

অবশ্য একে শুধু কসমিক এগ ক্যাটাগরিতে ফেললে ভুল হবে, বরং ডুয়ালিটি বা দ্বৈততা দ্বারাও একে ডিফাইন করা যায়। চাইনিজরা বিশ্বাস করতো, সকল কিছুরই বিপরীত সত্ত্বা বিদ্যমান। যেখানে ভালোর অস্তিত্ব আছে, সেখানে মন্দের অস্তিত্বও অবশ্যম্ভাবী। সৃষ্টির শুরুতে থাকা আদি কসমিক এগ ছিল বৈপরীত্যের ধারক, স্ত্রী-পুরুষ ,প্যাসিভ-অ্যাক্টিভ, ঠান্ডা-গরম, আলো-আঁধার, শুকনো-ভেজা সকল কিছুই ছিলো ইন-ইয়ানের প্রতিরুপ। এবং ছিলো পান-কু, এক বিশালদেহী দৈত্য, যার দুহাতে ছিলো বিশাল হাতুড়ি-বাটালি (chisel and mallet)।

Phan-ku coming out of the cosmic egg.

সময়ের আবর্তে পান-কু ডিম ফেটে বেড়িয়ে আসে। বের করে নিয়ে আসে বৈপরীত্যে ভরা এক এলোমেলো অগোছালো জগৎ(chaos)। সৃষ্টির উদ্দেশ্যে ইন-ইয়ানএর ক্যাওস থেকে সকল বৈপরীত্যকে সে আলাদা করে দেয়। এভাবে আকাশ পৃথিবী হতে আলাদা হয়ে যায়। হাতুড়ি-বাটালি নিয়ে পান-কু তৈরি করে নির্মাণকাজ। গড়ে উঠে পর্বত, উপত্যকা, নদী, সমুদ্র। তৈরি হয় চাঁদ, সূর্য, তারা। সমস্ত জ্ঞান বিজ্ঞানের সৃষ্টি করে দিয়ে যায় পান-কু। মৃত্যুর পর তার খুলি হয়ে ওঠে আকাশ, নিশ্বাস পরিণত হয় বায়ুতে, গলার স্বর রুপ নেয় বজ্রে। তার চার হাত পা নির্দেশ করে চারটি দিককে(পূর্ব, পশ্চিম ,উত্তর, দক্ষিণ)। মাংস পরিণত হয় মাটিতে, রক্ত নদীতে। মাথার চুল হতে জন্ম নেয় মানুষ। Everything that is, is Phan-ku. Everything that Phan-ku is, is yin-yang.

Leave a Comment