এসো পুরাণকে জানি : পর্ব ১

পুরাণ ও বিজ্ঞান দুইটি আপাতবিরোধী চেতনা। পুরাণ বা মিথ দাঁড়িয়ে আছে মানুষের কল্পনার পিঠে। অন্যদিকে বিজ্ঞান মানে যুক্তি-প্রমাণ। তবে আধুনিক বিজ্ঞানের যত আবিষ্কার তার পেছনে মানুষের কল্পনা শক্তি একটা বিরাট অবদান রেখেছে। হাজার বছর আগে ভারতবর্ষ, ইউরোপ বা দক্ষিণ আমেরিকার কোনো এক প্রান্তরে ঘাসের বুকে শুয়ে এক প্রাচীন মানব সন্তানের আকাশের উড়ে বেড়ানোর আকাশ-কুসুম কল্পনা সহ অনেক কিছুকেই বাস্তব করেছে বিজ্ঞান। তাই পুরাণকে জানা কাকাড্ডার কাছে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। কাকাড্ডা ডট কমে পুরাণ নিয়ে নিয়মিত লিখছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী তাসফিয়া ফারাহ। আজ থাকছে তার প্রথম পর্ব। 

এসো পুরাণকে জানি! 

আমাদের মধ্যে অনেকেই মিথোলজি বা পুরাণশাস্ত্র সম্পর্কে আগ্রহী। গ্রিক, রোমান বা সনাতন ধর্মের মিথের বিভিন্ন চরিত্রের সাথে আমাদের অনেকেরই পরিচয় আছে। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্যে এসব মিথের অবদানও অসামান্য। তবে মিথ বা পুরাণ সম্পর্কে ভালো ধারণা থাকতে হলে প্রথমেই যে মৌলিক বিষয়টি জানা দরকার তা হলো মিথ বা পুরাণ কাকে বলে। মিথ বা পুরাণ হলো সেসব ঐতিহ্যবাহী গল্প যেগুলো কোনো জাতির উত্থানের ইতিহাস কিংবা অতিপ্রাকৃত কোনো শক্তি যেমন দেব-দেবীদের কেন্দ্র করে রচিত৷ এসব গল্পগুলি সাধারণত সেসব জাতির নৈতিক মূল্যবোধ এবং সংস্কৃতিকে ব্যাপকভাবে প্রভাবিত করে থাকে।

এবারে জানা যাক মিথের কিছু বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে। প্রথমেই আলোচনা করা যেতে পারে মিথে ভিন্নধর্মী দুটি শক্তির মধ্যকার দ্বন্দ্ব যেমনঃ দেবতা বনাম দৈত্য বা রাক্ষস, ভালো বনাম মন্দ, আলো বনাম অন্ধকার ইত্যাদি সম্পর্কে। যেমনঃ হিন্দুশাস্ত্রের অন্তর্গত বাল্মীকি রচিত মহাকাব্য রামায়ণে অযোধ্যার রাজা রাম ও লঙ্কা দ্বীপের রাজা রাবণের মধ্যে যুদ্ধ হয়। রাম তাঁর পিতার সম্মান রক্ষার্থে বনবাসে যায় এবং সেখানে তার সঙ্গী হয় তাঁর ভাই লক্ষ্মণ এবং পত্নী সীতা। বনবাসকালে লঙ্কার রাজা রাবণ রাম-পত্নী সীতাকে অপহরণ করে। সীতাকে উদ্ধার করার জন্য রামের বানর সেনাবাহিনী রাবণের বিশাল রাক্ষসবাহিনীর সাথে যুদ্ধ করে। এই যুদ্ধে রাবণ পরাজিত হয়। অর্থাৎ, দেবতা বিষ্ণুর সপ্তম অবতার রাম এবং রাক্ষস-রাজ রাবণের মধ্যকার এই যুদ্ধটি পৌরাণিক ভালো বনাম মন্দের দ্বন্দ্বের একটি উৎকৃষ্ট উদাহরণ।

দ্বিতীয়ত, এই ধরনের দ্বন্দ্ব ঘটে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই ক্ষমতাকে কেন্দ্র করে, হিংসার বশবর্তী হয়ে বা অতি অহংকারের কারণে৷ বেশিরভাগ সময় এ সকল দ্বন্দ্ব এবং মনোমালিন্যের অবসান হয় শাস্তি ভোগ, রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এমনকি মৃত্যুর মাধ্যমেও।

তৃতীয়ত, এ সকল মিথে মানুষের বিভিন্ন অদম্য ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটতেও দেখা যায়। যেমনঃ প্রাচীনকাল থেকেই মানুষের আকাশে ওড়ার ইচ্ছা প্রবল। এই ইচ্ছার প্রতিফলন আমরা দেখতে পাই গ্রিক মিথোলজির অন্যতম চরিত্র ইকারাসের মধ্যে। ইকারাসের মোমের তৈরি পাখা ছিল এবং সে আকাশে উড়তে পারত। যদিও অতি অহংকারবশত সে সূর্যের কাছে যেতে চায় তার দুর্বল পাখায় ভর করে এবং ফলাফলস্বরূপ তার মোমের পাখা সূর্যের উত্তাপে গলে পড়ে এবং সমুদ্রে পড়ে ডুবে গিয়ে তার মৃত্যু হয়।

চতুর্থত, মিথে আমরা বিভিন্ন অতিপ্রাকৃতিক সত্তার উপস্থিতি দেখতে পাই যেমনঃ দেবতা, দৈত্য বা জায়ান্ট, রাক্ষস প্রভৃতি। এ সকল সত্তা অনেক অতিপ্রাকৃতিক ক্ষমতার অধিকারী হয় এবং কখনো কখনো তারা মানুষ কিংবা অন্য প্রাণীর ছদ্মবেশ ধারণ করে পৃথিবীতে এসে মানুষের কার্যকলাপ পর্যবেক্ষণ করে থাকে।

পৌরাণিক প্রাণি ইউনিকর্ণ

পঞ্চমত, পুরাণে প্রায়ই মানুষের কোনো কাজ সম্পাদনের জন্য স্বর্গ বা পাতালপুরীতে যাবার কাহিনী বর্ণিত হয়।

ষষ্ঠত, এসব পৌরাণিক দেবতাদের নানা রকম বাহন বা অস্ত্র এবং প্রতীক রয়েছে যা এসকল ধর্ম এবং সাহিত্যেও খুব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। যেমনঃ গ্রিক দেবতা জিউস তাঁর এক হাতে রাজদণ্ড (scepter) এবং অপর হাতে বজ্র বহন করেন যা তাঁর অপরিসীম ক্ষমতার প্রতীক। তাঁকে মাঝে মাঝে ওক গাছের পাতা পরিধান করতে দেখা যায়। বজ্র, ওক, সোনালী ঈগল, ষাঁড় প্রভৃতি জিউসের প্রতীক। আবার, গ্রীক শিল্প, সাহিত্য, সংগীত ও জ্ঞানের দেবতা এপোলোর প্রতীক হলো পাইথন বা অজগর, রাজহাঁস, দাঁড়কাক প্রভৃতি।

সবশেষে একটি চমকপ্রদ ব্যাপার নিয়ে আলোচনা করা যেতে পারে। বিভিন্ন ধর্মের মধ্যে যেসব পৌরাণিক চরিত্র রয়েছে সেগুলি অনেক সময় অন্য ধর্মের পুরাণেও পাওয়া যায়। যেমনঃ রামের উপস্থিতি কেবল হিন্দুশাস্ত্রেই নয়, বৌদ্ধ ও শিখ পুরাণেও রামকে পাওয়া যায়। যেমনঃ বৌদ্ধ ধর্মানুসারে একবার বোধিসত্ত্ব শ্রীরামচন্দ্ররূপে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

শিখ ধর্মের ধর্মগ্রন্থ আদিগ্রন্থ বা শ্রী গুরু গ্রন্থ সাহিব-এ অযোধ্যা নৃপতি পরম ধার্মিক রাজা রামচন্দ্রের কাহিনী ও রামায়ণের যুদ্ধের কাহিনী বর্ণিত আছে। তাছাড়া, একই দেবতাকে ভিন্ন দেশীয় পুরাণে ভিন্ন ভিন্ন নামে ডাকা হয়। যেমনঃ গ্রীক পুরাণে যিনি জিউস, রোমান পুরাণে তাঁর সমতুল্য হলেন জুপিটার, নর্স পুরাণে তিনি থর, জার্মান পুরাণে তিনিই অডিন, স্লাভিক (রাশিয়া, ইউক্রেইন, চেক, স্লোভাক প্রভৃতি) পুরাণে তিনি পেরুন আর হিন্দু পুরাণে তিনি ইন্দ্র।

পরবর্তী পর্বগুলোতে বিভিন্ন দেশ ও অঞ্চলের মিথ নিয়ে আরো বিস্তারিত আলোচনা করা হবে।

তথ্যসূত্রঃ উইকিপিডিয়া ও বিভিন্ন ওয়েবসাইট

লেখক : শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

Leave a Comment