রানওয়ে

জান্নাতুল ফেরদৌস রিমু

তারেক মাসুদ, বাংলা চলচ্চিত্রের আকাশে ক্ষণজন্ম এক নক্ষত্রের নাম। মারদাঙ্গা বাণিজ্যিক ঘরনার বাহিরে গিয়ে সমাজ বাস্তবতাকে শৈল্পিকভাবে সাবলীলতার সাথে তুলে ধরা কেবল মাত্র তারেক মাসুদের সৃজনশীলতা আর অনুপম ব্যক্তিত্বের প্রামাণ্য ধারক।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবন থেকেই লেখক শিবির, বাম আন্দোলন এবং বাংলাদেশের চলচ্চিত্র আন্দোলনের সাথে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থেকেছেন। লাইট, ক্যামেরা, একশানের এই বর্ণিল জগতে তাঁর আবির্ভাব “সোনার বেড়ি” নামে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের উপর ২৫ মিনিটের একটি তথ্যচিত্র দিয়ে। এটা ১৯৮৭ সালের কথা।এরপর ১৯৮৯ সালে “আদম সুরত” তৈরী করেন শিল্পী এস এম সুলতান এর উপর। স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদকে সাথে নিয়ে ১৯৯২ সালে নির্মাণ করেন একটি অ্যানিমেশন শর্ট ফিল্ম।
শুদ্ধ উচ্চাভিলাস নয়, দৃঢ়চেতনাও তারেক মাসুদের আরেক নাম। তাঁর “মুক্তির গান” ছবিটি যেন আহমদ ছফার “অলাতচক্র” এর অপর পিঠ আকারে হাজির হয়। মার্কিন নির্মাতা লিয়ার লেভিন ১৯৭১ যুদ্ধের সময় এদেশের একদল সাংস্কৃতিক কর্মীর সঙ্গ নেন যার নাম ছিল “বাংলাদেশ মুক্তি সংগ্রামী শিল্পী সংস্থা”। সংস্থাটির উদ্দীপ্ত, অবিরাম পথচলা, যুদ্ধের ভয়াবহতা সবই একে একে ধরা পরে লিয়ার লেভিনের ক্যামেরায়। যার ফুটেজ থেকে আসে “মুক্তির গান”। তারেক মাসুদ নিজেই একটা কথা ঘন ঘন রাষ্ট্র করতেন। কথাটা ইংরেজীতে- “ডকুফিকশন”। “মুক্তির গান” ছিল তারেকের নিজ বিচারে এক প্রকার ডকুফিকশন বা খবরকল্প কাহিনী।
masud
এরপর আসে “মাটির ময়না”চলচ্চিত্রটি। মাদ্রাসা ছাত্রের জীবনের মাঝে তিনি তার শৈশবকে ছড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁর ছেলেবেলা কেটেছে মাদ্রাসার চার দেয়ালে। গ্রামীণ রক্ষণশীল সমাজব্যবস্থার মনোজগত,আধুনিকতা এবং সেক্যুলারিজমের সঙ্গের ধর্মের আন্তঃসম্পর্ক – এধরনের জটিলতর ভাবনার চলচ্চিত্ররূপ এই “মাটির ময়না”।তারেক মাসুদের আত্মজৈবনিক এই সিনেমাটি বস্তুত ভূখন্ডের এক সমষ্টিগত ইতিহাস, যার ব্যাপকতা বিশ্বের দরবারে এক অনন্য মাত্রায় পৌছে দিতে সমর্থ হন তারেক মাসুদ। অর্জন করেন কান চলচ্চিত্র উৎসবে ডিরেক্টর ফোর্টনাইট খ্যাতি। এছাড়াও তাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি রানওয়ে,আ কাইন্ড অফ চাইল্ডহুড,নারীর কথা,ইন দ্যা নেইম অফ সেইফটি সহ আরো অনেক সৃষ্টি।

ফরিদপুরের নূরপুর গ্রামে জন্ম নেয়া এই সরলরৈখিক মানুষটি তার স্বপ্নের ঘুড়ির নাটাই কে নিজ হাতে কুক্ষিগত করেননি কখনো। এই সরলরৈখিক, বৈচিত্র্যময় জীবনের সঙ্গী ছিলেন স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ।মূলত মার্কিন নাগরিক হলেও ভালবেসেছিলেন বাংলার মানুষ, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য আর তা ফুটিয়ে তুলতে হাতে হাত রেখে কাজ করেছেন প্রিয় মানুষ তারেক এর সাথে। এই দম্পতির একমাত্র সন্তান বিংহাম পুত্রা মাসুদ নিশাত।

চিরকাল সিনেমার সঙ্গে জীবনকে বেঁধে রাখা এই নির্মাতার মৃত্যুটাও যেন সিনেমার পথেই। “কাগজের ফুল” – এর নির্মান কাজ থেকে ফেরার পথে সড়ক দুর্ঘটনায় না ফেরার দেশে পাড়ি জমান এই স্বপ্নদ্রষ্টা। মৃত্যুর মিছিলে সেদিন আরো যোগ হন গুণী সাংবাদিক ও সহকর্মী মিশুক মুনীর।

“ধর্ম ও ধর্মনিরপেক্ষতার সঙ্কীর্ণ সংজ্ঞা থেকে বেরিয়ে আসুন। যখন বলছি ইসলাম শান্তির ধর্ম, তখন পরিষ্কার করতে হবে, কোন ধারার ইসলামের কথা বলা হচ্ছে। ধর্মনিরপেক্ষতার ঝাণ্ডা ওড়ানোর সময় ধর্মপরায়ণ, হতদরিদ্র, দুর্বল মানুষ থেকে শুরু করে মুন্সি, ফকির, বাউল এমনকী মোল্লাতন্ত্র ও গ্রন্থসর্বস্ব প্রতিষ্ঠানকে একাকার করে ফেলছি কি না, দেখতে হবে। বুদ্ধিজীবীরা যেন দয়া করে মার্ক্সকে ‘মিসকোট’ না করেন। মার্ক্স বলেছিলেন, ‘ধর্ম সাধারণ মানুষের দীর্ঘশ্বাস, আত্মাহীন সমাজের আত্মা, হৃদয়হীন জগতের হৃদয়। ধর্ম জনমানসের জন্য আফিমের মতো।’ আগে পরের বহু সংবেদনশীল বক্তব্য এড়িয়ে কাঠ-মোল্লা কমিউনিস্টরা এই লাইনটিই উদ্ধৃত করে বিকৃতি ঘটান। এই ধরনের আংশিক উদ্ধৃতি ভুলের ইতিহাস সৃষ্টি করে এবং চড়া মাসুল দিতে হয়।”
                                                                                                                                            -তারেক মাসুদ

তারেক মাসুদ আধুনিক ভাষা ও সমকালীন বিষয়াবলির জোরালো উপস্থাপনে তিনি হয়ে উঠেছিলেন বাংলা চলচ্চিত্র নির্মানে প্রবাদ পুরুষ। প্রায়ই বলতেন -“সিনেমা করতে চাইলে ঘাটে বাঁধা নৌকার সুতো ছেড়ে দাও,পেছনে যদি নৌকা বাঁধা থাকে, সেটি বারবার তোমাকে পিছু টানবেই”। তারেক মাসুদের মৃত্যুর পর ২০১২ সালে বিভিন্ন সময়ে লেখা তার চলচ্চিত্র সম্পর্কিত প্রবন্ধগুলোকে একত্র করে একটি বই প্রকাশিত হয় “চলচ্চিত্রযাত্রা” নামে। বইটিতে ভূমিকা লিখেছেন তার স্ত্রী ক্যাথরিন মাসুদ। লেখক হবার একটা টান সবসময়ই তার মাঝে ছিল। তিনি বলেছিলেন ‘চলচ্চিত্রকার না হলে লেখক হওয়ার চেষ্টা করতাম।’
তাঁর কথার যৌক্তিকতার বাঁধনে যে লেখার শেষ টানা আর হয় না।থাকুক না হয় অসম্পূর্ণ কিছু কথা,সেলুলয়েডের ফিতায় বাঁধা এক ফেরারীর জীবন।

লেখকঃ শিক্ষার্থী, চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ।

Leave a Reply