দৃষ্টিহীন গ্র্যাজুয়েট

হেলেন কেলার বা হেলেন অ্যাডামস কেলার বাক-শ্রবণ ও দৃষ্টি প্রতিবন্ধিত্ব নিয়ে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করেন এবং পরবর্তীতে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করেন। তিনি প্রতিবন্ধী শিশুদের অধিকারের জন্য আজীবন লড়াই করেছেন। একই সাথে তিনি ছিলেন একজন গুরুত্বপূর্ন লেখক ও রাজনৈতিক কর্মী। হেলেন কেলারকে আজকের দিনের সাহসী কিশোর-কিশোরীদের সাথে পরিচয় করিয়ে দিতে কাকাড্ডা ডট কমে লিখেছেন তাসনিম জাহান তাজিন। 

 

World Health Organization এর তথ্যমতে, পৃথিবীর প্রায় ২৫৩ মিলিয়ন মানুষের বসবাস দৃষ্টিশক্তি জনিত সমস্যা নিয়ে। এদের মধ্যে ১২ মিলিয়ন রয়েছে ১৫ বছরের কম বয়সী শিশু। ১.৪ মিলিয়ন শিশু পুরোপুরি অন্ধ। ভাবুন তো, সমস্ত দিন চোখ বেঁধে পৃথিবীর বুকে আপনাকে চলাফেরা করতে হচ্ছে! অথচ অন্ধ শিশুদের জীবনটা ঠিক এমনই। অন্ধ শিশুদের নিয়ে বর্তমানে কাজ করে যাচ্ছে “আমেরিকান ফাউন্ডেশন ফর দি ব্লাইন্ড”, “হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল” এর মতো আন্তর্জাতিক মানের প্রতিষ্ঠান ছাড়াও ছোট বড় আরো সংগঠন, সমাজকর্মী। অন্ধত্ব কে এভাবে আলোর পথে নিয়ে আসা, অন্ধদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় রয়েছে পেছনের এক গল্প। যে গল্পে ছিলেন একজন নায়িকা, এক অন্ধ বালিকা হেলেন কেলার।

১৮৮০ সালের ২৭ শে জুলাই আমেরিকার আলাবামা অঙ্গরাজ্যের টাসকুমবিয়া শহরের কেলার পরিবারে জন্ম নেয় ছোট্ট মেয়ে হেলেন কেলার। পরিবারের প্রথম সন্তান হিসেবে ভীষণ আদরে আর দশ জন সাধারণ শিশুর মতোই বেড়ে উঠছিল হেলেন। ১৮৮২ সালে মাত্র ১৮ মাস বয়সে হেলেন কেলার আক্রান্ত হয় ব্রেন ফিভারে। চিকিৎসক আর পরিবারের অক্লান্ত চেষ্টায় জ্বর সেরে উঠলেও হেলেনের জীবনে রেখে যায় এক ভয়াবহ ছাপ। ছোট্ট হেলেন হয়ে পড়ে অন্ধ আর বধির। হেলেনের জীবন পালটে যেতে থাকে তখন থেকেই। শারীরিক অসামঞ্জস্যতায় হেলেন দিন দিন হয়ে পড়ে উগ্র,অস্থির স্বভাবের। একমাত্র সন্তানের সমস্যা দূর করতে বাবা মা ছুটতে থাকেন বিখ্যাত সব চিকিৎসকের কাছে। তাঁরা জানান দৃষ্টিশক্তি ফিরে না পেলেও হেলেন পড়তে ও লিখতে পারবে। সেজন্য যোগাযোগ করতে হবে টেলিফোন আবিষ্কারক আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল এর সাথে। আলেকজান্ডার গ্রাহামবেল জড়িত ছিলেন অন্ধদের প্রতিষ্ঠান আমেরিকান পারকিনসন ইন্সটিউট এর সাথে। ছোট্ট হেলেন কে তিনি আনন্দের সাথে গ্রহণ করেন। তাঁর জন্য নিয়োগ করেন আমেরিকান পারকিনসন এরই এক প্রাক্তন ছাত্রী শিক্ষিকা এ্যানি সুলেভান।

ব্রেইল পদ্ধতিতে পড়ছেন হেলেন কেলার

হেলেনের ৭ বছর বয়সে সৌভাগ্য নিয়ে আসেন এ্যানি সুলেভান। হেলেন কেলার এর জীবনের মোড় ঘুরে তাঁর হাত ধরেই। এ্যানি সুলেভান ছিলেন দরিদ্র পরিবারের অন্ধ মেয়ে। ভাগ্যক্রমে একসময় দৃষ্টি ফিরে পেলেও জীবনের অনেকটা সময় পার করেছিলেন হেলেনের মতোই। হেলেন এর প্রতি তাই ছিল বিশেষ স্নেহ। উগ্র, অস্থির হেলেন কে অল্প সময়ের মধ্যেই আয়ত্তে আনেন তিনি। এরপর ট্যাডোমা পদ্ধতিতে শিক্ষা দিতে শুরু করেন হেলেন কে। হাতে লিখে মনের ভাব প্রকাশের এই পদ্ধতিতে প্রচণ্ড আগ্রহী হেলেনের আগ্রহ আর মেটাতে পারছিলেন না এ্যনি সুলেভান। তাই ব্রেইল পদ্ধতিতে হেলেন পড়তে শুরু করে। অল্পদিনেই হেলেন শিখতে ও লিখতে পারলেও মেধাবী হেলেনের জন্য তা যথেষ্ট ছিল না। তাই এ্যনি সুলেভানের সাথেই রওনা হন বোস্টনের পারকিনসন ইন্সটিউটে। সেখান থেকে কয়েক বছর পর বোস্টনের হোরেস মান নামের বধিরদের জন্য এক বিশেষ স্কুলে। হোরেস মানে স্কুলেই প্রথম কথা বলতে শেখেন হেলেন কেলার। শিখতে শুরু করেন ফ্রেন্স, জার্মান সহ নানা ভাষা। বিভিন্ন ভাষার বই পড়ার নেশা যেন পেয়ে বসে তাঁকে। অন্ধ, বধির মেয়ের এতো প্রচেষ্টা আর প্রতিভা ধীরে ধীরে আলোচনায় আসতে শুরু করে।

১৮৯৯ সালে প্রথমবারের মতো প্রখ্যাত র‍্যাডক্লিফ কলেজে ভর্তি হয় অন্ধ শিক্ষার্থী হেলেন কেলার। লেখক, সমাজকর্মী হিসেবে সেখান থেকেই পরিচিত হয় হেলেন কেলার। র‍্যাডক্লিফ কলেজে পড়ার সময় তাঁর পরিচয় হয় সাংবাদিক জন ম্যাসির সাথে। তাঁর অনুপ্রেরণায় হেলেন সর্বপ্রথম প্রকাশ করেন প্রথম আত্মজীবনীমূলক বই ‘দি স্টোরি অব মাই লাইফ’।

হেলেন কেলার সাহিত্যে এক উজ্জ্বল নাম। শ্রেণী বৈষম্য কেন্দ্রিক ‘দি ওয়ার্ল্ড আই লিভ ইন’, ‘আউট অব দি ডার্ক, ‘মিডস্ট্রিম’ তাঁর বিখ্যাত বই। শ্রেণী বৈষম্য, নারী অধিকার এমনকি ২য় বিশ্বযুদ্ধেও শান্তি রক্ষায় কাজ করে গেছেন তিনি। সবকিছু ছাপিয়ে অন্ধ ও বধিরদের জন্য তিনি পৃথিবীতে যে ইতিহাস রেখে গেছেন তার সুফল বইছে এই আধুনিক জগতে। বিভিন্ন দেশে অন্ধ ও বধিরদের পক্ষে বক্তৃতা দিয়ে তিনি শারীরিক প্রতিবন্ধীদের জন্য গড়েছেন এক সহযোগী সমাজ। সারা বিশ্বে দৃষ্টি প্রতিবন্ধীদের জন্য কাজ করে যাওয়া “হেলেন কেলার ইন্টারন্যাশনাল” তাঁরই প্রতিষ্ঠিত। ব্রেইল পদ্ধতিতে প্রতিষ্ঠা করে গেছেন অসংখ্য স্কুল। সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে লেখক মার্ক টোয়েন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রপ্রধানরা হয়েছিলেন তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী, সহযোগী।

পারকিনসন ইন্সটিটিউটে থাকাকালীন এক ছুটির সময়ে সমুদ্রে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন হেলেন কেলার। সমুদ্রের ঢেউয়ে হঠাৎ তিনি ডুবে যেতে থাকেন। প্রাণপণে তীরে পৌঁছে ফিরে আসেন শিক্ষক এ্যনি সুলেভান এর কাছে। এ্যনি সুলেভান জিজ্ঞেস করেন, “তুমি কি সমুদ্র কে ভয় পেয়েছো?” হেলেন কেলার উত্তর দেন, “সমুদ্র কে নয়। ভয় পেয়েছি মৃত্যুকে।”

হেলেন কেলার অন্ধত্ব নিয়েই অনুভব করেছিলেন জীবনের প্রাপ্তি, সৌন্দর্য। তাঁর অনুভব ছড়িয়ে গেছে অসংখ্য অসহায় মানুষের মনে।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ইউনিভার্সিটি অব লিবারেল আর্টস বাংলাদেশ (ইউল্যাব)। 

Leave a Comment