গণিতের জাদুকর শ্রীনিবাস রামানুজন

তাইমিয়ান তামজিদ

১৭২৯।
সংখ্যাটি আমাদের কাছে অন্য সব সংখ্যার মতই সাধারণ একটা সংখ্যা। কিন্তু তাঁর কাছে এটা মোটেও সাধারণ সংখ্যা ছিলনা যখন হাসপাতালে দেখা করতে গিয়ে জি. এইচ. হার্ডি তাকে বলেছিলেন। “সংখ্যাটা আসলে ইন্টারেস্টিং। এটা হচ্ছে দুটি ভিন্ন ভাবে প্রকাশযোগ্য দুটি ঘনের ক্ষুদ্রতম যোগফল।”
অর্থাৎ, ১৭২৯= ১^৩ + ১২^৩= ৯^৩ + ১০^৩।
একটা সংখ্যাকে এমন বিভিন্ন সংখ্যার যোগফল হিসেবে প্রকাশ করার এই গনিতকে বলে সংখ্যার অংশীকরণ। যাকে ইনি নিয়ে গিয়েছিলেন এক অন্য পর্যায়ে। এই “ইনি” হচ্ছেন রামানুজন, ভারতবর্ষের সর্বকালের অন্যতম সেরা গণিতবিদদের একজন।

১৮৮৭ সালের ২২শে ডিসেম্বর জন্ম হয় রামানুজনের। বাবা ছিলেন কাপড়ের দোকানের সামান্য একজন কর্মচারী। পাঁচ বছর বয়সে তিনি ভর্তি হন প্রাইমারি স্কুলে, আর এগারো বছর বয়সে হাই স্কুলে। তার ঠিক দুই বছর পরই তিনি নিজেই গণিতের উপর কাজ শুরু করেন জ্যামিতিক ও বীজগাণিতিক সমষ্টিকরণ দিয়ে। হাই স্কুলে থাকাকালীন অবস্থাতেই তাঁর পরিচয় ঘটে জি. এস. কার এর রচিত “Synopsis of Elementary Results in Pure Mathematics” বইটির। এরপর শুরু হয় রামানুজনের গণিত যাত্রা।

গণিতের রাজ্যে রামানুজনের বিস্তারণ ছিল এলিপ্টিক্যাল ফাংশন, অব্যাহত ভগ্নাংশকরণ, অসীম ধারার উপরে। রামানুজনের শুরুটা হয় এলিপ্টিক্যাল ফাংশনের দ্বারা। ১৯১০ সালে তিনি এলিপ্টিক্যাল ফাংশনের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করতে সক্ষম হন এবং ১৯১১ সালে বার্নউলির সংখ্যা নিয়ে এক অসাধারণ রিসার্চ পেপার বের হয় যা তাকে একজন প্রতিভাবান গণিতবিদ হিসেবে খ্যাতি পেতে সাহায্য করে। কিন্তু রামানুজনের তখন কোনো চাকরি ছিলনা, কারণ তাঁর সময়ের প্রায় পুরাটুকুই যেত গণিতের পেছনে। কলেজ ভর্তিতে তিনি বৃত্তি অর্জন করেছিলেন, কিন্তু তার পরের বছরেই তার বৃত্তি হারিয়ে ফেলেন কেননা তিনি সব সময় গণিতের পিছনেই ব্যয় করতেন, বাকি সব বিষয়ে তিনি ছিলেন দূর্বল। বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষায় তিনি পাশ করেছিলেন শুধু গণিতে, তাই আর বিশ্ববিদ্যালয়ে তার ভর্তি হওয়া হয়নি। এভাবে যখন এক সময় চাকরি পাওয়া অনিবার্য হয়ে পড়ল তখন বিভিন্ন জায়গায় অল্প কিছু সময় ধরে চাকরি করেন তিনি। আর সাথে সাথে তাঁর রিসার্চের কাজগুলো বিভিন্ন এডভান্সড রিসার্চারের কাছে পাঠাতে থাকেন বৃত্তির জন্য। অবশেষে তাঁর কাজগুলো জবাব পায় জি. এইচ. হার্ডির কাছ থেকে। এরপর জি. এইচ. হার্ডির সাথে তিনি কাজ শুরু করেন এবং তার বিস্তারণ ঘটান গণিতের বিভিন্ন ক্ষেত্রে। তাঁর সবচেয়ে বড় অর্জনের একটি হচ্ছে রয়্যাল সোসাইটি অফ লন্ডনের ফেলো নিযুক্ত হওয়া।

রামানুজন নিয়ে প্রচলিত আছে অনেক গল্প। কিছু মিথ, কিছু সত্যি আবার কিছু অবিশ্বাসযোগ্য। কথিত আছে, তিনি যখন দেবীর উপাসনা করতেন তখন গাণিতিক বিভিন্ন ফলাফল বা এক্সপ্রেসন তার শরীরে লিখা উঠত, আর তিনি সেগুলো নোট করতেন। আবার বলা হয়, তাঁর গণিতের এই ক্ষমতা হচ্ছে আধ্যাত্মিক। আধ্যাত্মিকতার মাধ্যমে পেতেন তিনি বিভিন্ন সমাধান। গল্পগুলো মিথ নয়ত অবিশ্বাসযোগ্য সত্যি। তবে সত্যি কিছু গল্পও আছে। গোঁড়া হিন্দু হওয়ায় ট্রিনিটি বিশ্ববিদ্যালয়ে বৃত্তি পাওয়ার পর সমুদ্র পাড়ি দিতে বাধ সাধিয়ে বসেন তিনি। যদিও পরে অবশ্য তিনি পাড়ি দিয়েছিলেন। গণিতের অনেক সাধারণ সূত্র সম্পর্কে তাঁর কোনো ধারণা ছিলনা। গতানুগতিক পড়াশুনা না করার কারণে তাঁর এই সাধারণ সূত্রগুলো শিখে নেওয়া হয়নি। গণিতে প্রমাণ করা বলে যে একটা বিষয় আছে তা নিয়ে তাঁর ধারণা ছিলনা বললেই চলে। তিনি শুধু সমাধানটা বা এক্সপ্রেসনটা লিখতেন। এই কারণে তাঁর অনেক এমন গাণিতিক কাজ আছে যা প্রমাণ করতে গিয়ে হিমশিম খেতে হয়েছে গণিতবিদদের। এমনও কাজ আছে যা নিয়ে গণিতবিদেরা এখনো কাজ করে যাচ্ছেন।

রামানুজন যদিও গণিত নিয়ে অনেক কাজ করে গেছেন কিন্তু তা করেছেন মাত্র ৩২ বছর বয়সে। অসুস্থতা তাকে অনেকবার কাবু করেছে। মাত্র ২ বছর বয়সে তিনি গুটিবসন্তে আক্রান্ত হন। এছাড়াও বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন শারীরিক সমস্যায় জর্জরিত হন, যেতে হয় অপারেশনের মধ্য দিয়েও। আর শেষ পর্যন্ত ১৯২০ সালের ২৬শে এপ্রিল গণিত হারায় তাঁর আরেক পূজারী রামানুজনকে।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply