আইনস্টাইনের চিঠি

খায়রুল হাসান জাহীন

সত্যেন্দ্রনাথ বসুর সাথে আইনস্টাইন পত্র যোগাযোগ নিয়ে কাকাড্ডার বিশেষ ফিচার

১৯২১ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা হলে উপাচার্য ফিলিপ হারটগ সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের রিডার করে নিয়ে আসেন। তখন পদার্থ বিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ছিলেন ডব্লুউ এ জেনকিনস। সত্যেন্দ্রনাথ বসু ম্যাক্স প্লাঙ্কের থার্মোডিনামিক্স এন্ড ওয়ারমেস্ট্রবাহলা বইটির একটি কপি পেয়েছিলেন অধ্যাপক দেবেন্দ্রমোহন বসুর (১৮৮৫-১১৯৭৫) কাছ থেকে। তিনি প্লাঙ্কের মতবাদটি যেভাবে উপস্থাপিত করা হয়েছে তার সঙ্গে একমত হতে পারছিলেন না। ১৯২৪ সালে জার্মান পত্রিকা জেইটসিক্রিফট ফ্যু ফিজিক-এ তাঁর একটি প্রবন্ধ প্লাঙ্ক’স ল এন্ড লাইট কোয়ান্টাম হাইপোথিসিস ফিলোসফিক্যাল ম্যাগাজিনে প্রকাশিত হলে তিনি রাতারাতি বিখ্যাত হয়ে ওঠেন। অবশ্য তাঁর আগে একটি কপি আইনস্টাইনের কাছেও পাঠানো হয়ে ছিলো মতামতের জন্য। আইনস্টাইনকে লেখা তার চিঠিটি নিচে উল্লেখ করা হলো-

পদার্থবিজ্ঞান বিভাগ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

৫ জুন, ১৯২৪

শ্রদ্ধাভাজনেষু,

আপনার মতামতের জন্য আমি সাহস করে এই প্রবন্ধটি পাঠালাম। আপনি এটা পড়ে কী মনে করেন তা জানতে আমি খুবই উৎসুক। আপনি দেখবেন এতে আমি সনাতনী তড়িৎ বলবিদ্যার সাহায্য ছাড়াই ধ্রুবকটিতে পৌঁছতে পেরেছি। অবশ্য এতে ধরে নেয়া হয়েছে যে প্রাথমিক দশাদেশ…উপাদানটি আছে। এই প্রবন্ধটি অনুবাদ করার মতো যথেষ্ট জার্মান আমি জানি না। আপনি যদি মনে করেন এটি ছাপার যোগ্য তাহলে জেইটসিক্রিফিট ফ্যু ফিজিক পত্রিকায় এটি প্রকাশের ব্যবস্থা করলে কৃতজ্ঞ হবো। যদিও আপনি আমাকে চেনেন না তবু অসংকোচে আপনার কাছে এ অনুরোধ জানালাম কারণ লেখার মাধ্যমে আপনি আমাদের সকলের গুরুস্থানীয়। কলকাতা থেকে একজন আপনার আপেক্ষিকতাবাদে প্রবন্ধগুলো ইংরেজিতে অনুবাদের অনুমতি প্রার্থনা করে চিঠি দেয়। আপনার স্মরণ আছে কিনা জানি না। আপনি অনুমতি দিয়েছিলেন। আপনি আপনার সাধারণ আপেক্ষিকবাদ প্রবন্ধটি অনুবাদ করি।

আপনার বিশ্বস্ত

এস এন বোস

 

তার অল্প কিছুদিন পরেই আইনস্টাইনের অনূদিত প্রবন্ধটি প্রকাশ হয়। তার সঙ্গে অনুবাদক নিম্নোক্ত টীকা যুক্ত করেনঃ

আমার মতে প্লাঙ্কের সূত্র থেকে বোস যে সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন তা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতির সূচনা করেছে। আদর্শ গ্যাসের কোয়ান্টাম তত্ত্ব সম্বন্ধেও এই মতবাদ প্রযোজ্য। এই বিষয়ে অনত্র আলোচনা করবো।

২.৭.১৯২৪ তারিখে সত্যেন্দ্রনাথ বসুকে আইনস্টাইনের হাতে লেখা চিঠিতে তিনি বলেন-

প্রিয় সহকর্মী,

আমি আপনার প্রবন্ধটি ভাষান্তর করেছি এবং জেইটিসিক্রেফট ফ্যু ফিজিকে প্রকাশের জন্য পাঠিয়ে দিয়েছি। আপনি একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন এবং আমাকে তা অত্যন্ত খুশী করেছে। আমার কাজ সম্বন্ধে আপনার মন্তব্য আমি সঠিক বলে মনে করি না। কারণ ভীনের বিন্যাস সূত্র তরঙ্গ তত্ত্ব থেকে আসে না এবং বোরের পরিপূরণ নীতিও লঙ্ঘিত হয় না। তবে সেজন্য কিছু আসে যায় না। আপনিই প্রথম এই উৎপাদকটি কোয়ান্টাম তত্ত্ব থেকে নির্ধারণ করেছেন যদিও সমাবর্তন উৎপাদন ২ সম্বন্ধে যুক্তি ততোটা জোরালো নয়। এটি বাস্তবিকই অত্যন্ত সুন্দর একটি অবদান।

বন্ধুসুলভ অভিবাদনান্তে

আপনার

এ আইনস্টাইন।

 

এই ছিলো প্লাঙ্কের থার্মোডিনামিক্স এন্ড ওয়ারমেস্ট্রবাহলা বইয়ের মতবাদ নিয়ে বোস-আইনস্টাইন চিঠি বিনিময়। এই চিঠি দু’টি নেয়া হয়েছে বিজ্ঞান গণসংগঠন বিজ্ঞান পাঠশালার মুখপত্র বিজ্ঞান পাঠের জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত জনপ্রিয় বিজ্ঞান লেখক এম এ আজিজ মিয়ার প্রবন্ধটি থেকে। লেখাটির অন্যান্য তথ্যসূত্র নিচে উদ্ধৃত করা হলো-

১. সত্যন্দ্রনাথ বসুঃ চেনা বিজ্ঞানী অজানা কথা – দেবীপ্রসাদ রায়, কলকাতা
২. স্মৃতিময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, সম্পাদনা – মুহাম্মদ জাহাঙ্গীর, ঢাকা
৩. সংসদ বাঙালী চরিতাভিধান (প্রথম খন্ড), কলকাতা
৪. সত্যেন্দ্রনাথ বসু – শান্তিময় চট্টোপাধ্যায়, এনাক্ষী চট্টোপাধ্যায়

 

Leave a Reply