যেখানে যাত্রার শুরু

মহাকাশ, এক মহারহস্যের নাম। পৃথিবীর প্রাচীনতম মানুষটি থেকে শুরু করে আমরা সবাই জীবনে একবারের জন্যে হলেও মহাশূন্যের রহস্য জানতে চেয়েছি। উৎসাহীদের কেউ কেউ একে নিয়ে গড়েছে কতই না গল্প। কি আছে এই দ্যু লোকে?  কাকাড্ডার জিজ্ঞাসু, কৌতূহলী পাঠকদের জন্য সহজ-সরল ভাবে জ্যোতির্বিদ্যার প্রাথমিক কথকতা তুলে ধরতে কাকাড্ডার এই জ্যোতির্বিদ্যা সিরিজে নিশার লেখা প্রবন্ধ যেমন থাকবে, তেমনি থাকবে কমিক্স, গুনী লেখকদের বইয়ের পিডিএফ ঠিকানা, ভিডিও ব্লগ। কাকাড্ডার জ্যোতির্বিদ্যা সিরিজের সমন্বয় করছেন শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাইমা নাসরিন নিশা। 

-প্রকাশক

যেখানে গল্পের শুরু

ঠিকানা- কাউকে খুঁজে বের করার একমাত্র মাধ্যম। বড় শহরে কোনো ঠিকানা খুঁজে পেতে বিড়ম্বনার স্বীকার হতে হয়নি এমন মানুষ হাতে গোণা কয়েকজন। সে তুলনায় মহাবিশ্বের বিস্তৃতি আরো বিশাল। তবেই বোঝো, পুরো মহাবিশ্বের স্বাপেক্ষে কেবল আমাদের পৃথিবীকে খুঁজে বের করা কতটা মুশকিল হতে পারে। যেহেতু কোনো জ্যোতির্বিজ্ঞানীই পৃথিবীর বাইরে প্রাণের অস্তিত্বের সম্ভাবনা উড়িয়ে দিচ্ছেন না তাহলে আমরা ধরে নিতেই পারি যে অদূর ভবিষ্যতে মহাজাগতিক প্রাণিদের সাথে হয়তো যোগাযোগ সম্ভব হবে। তবে তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য দরকার পড়তে পারে বড় স্কেলে একটি ঠিকানা যাকে আমরা বলছি কসমিক এড্রেস (Cosmic Address)। প্রশ্ন হল কসমিক এড্রেস কী?

কসমিক এড্রেস বলতে মূলত বোঝায় গোটা মহাবিশ্বের সাপেক্ষে আমাদের অবস্থান। আমাদের কসমিক এড্রেস এর প্রথম স্তর হল পৃথিবী। পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ হল আমাদের নিকটতম প্রতিবেশি যার নেই কোনো বায়ুমন্ডল, আকাশ, সমুদ্র, নেই কোনো প্রাণ ।

আমাদের পৃথিবী এবং এর বাইরের সকল পৃথিবীর শক্তির মূল উৎস সূর্য। এর শক্তিশালী মহাকর্ষিক বল দ্বারা বুধ থেকে শুরু করে সৌরজগতের সকল গ্রহকে ধরে রাখে। প্রকৃতিগতভাবে প্রতিটি গ্রহের রয়েছে স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য । বুধ আর শুক্র এক একটি জ্বলন্ত অগ্নিকুন্ড; প্রচন্ড উত্তাপে যাদের বায়ুমন্ডল মহাশুন্যে বিলীন হয়ে গেছে বহুবছর আগে। মঙ্গলে চলছে প্রাণের অস্তিত্বের সন্ধান । চারটি বিশাল উপগ্রহ এবং ডজন খানেক ছোট ছোট উপগ্রহ নিয়ে বৃহস্পতি যেন নিজেই অন্য একটি জগত! মঙ্গল আর বৃহস্পতির মাঝে রয়েছে গ্রহাণুপুঞ্জের পুরু বেষ্টনী । বিখ্যাত শনির বলয় যা তৈরি হয়েছে মেঘ, ধূলিকণা আর ছোট ছোট গ্রহাণুপুঞ্জ নিয়ে । এছাড়াও রয়েছে ইউরেনাস, নেপচুন – টেলিস্কোপ আবিষ্কারের আগে যাদের অস্তিত্ব ছিল অজানা। সবচে’ বাইরের গ্রহটির বাইরে রয়েছে হাজার হাজার গ্রহাণু- একসময় গ্রহের স্বীকৃতি পাওয়া প্রায় ৩৩-৪৯ জ্যোতির্বিজ্ঞান একক দূরের প্লুটো তাদের অন্যতম । এই অঞ্চলেই এখন অবস্থান করছে ভয়েজার ১। এর বাইরে .৮ থেকে ৩.২ আলোকবর্ষ দূরত্বে সূর্যকে প্রদক্ষিন করছে উর্ট মেঘমালা (Oort Clouds) নামক গ্রহাণুপুঞ্জ ও ধুমকেতুর অঞ্চল যাকে ধরে নেওয়া হয় সৌরজগতের শেষসীমা। তাহলে আমাদের কসমিক এড্রেসের দ্বিতীয়ধাপ হল সৌরজগত ।

ভয়েজার ১ হল মানব নির্মিত ও সর্বাপেক্ষা অধিক দূরত্ব অতিক্রমকারী মহাশুন্যযান । অন্যদিকে ভয়েজার ২ এখনো সৌরজগতের সীমা ছাড়ায়নি। উতক্ষেপনের আগে ভয়েজার ১ ও ২ দুটোতেই ভরে দেওয়া হয়েছিল একটা করে গোল্ডেন ডিস্ক । এই গোল্ডেন ডিস্কগুলোর কারণেই ভয়েজারেরা অনন্য। ডিস্কগুলোতে যত্নের সাথে রেকর্ড করে দেওয়া হয়েছিল মানব সভ্যতার কিছু বার্তা – পৃথিবীর পাহাড়-সমুদ্রের ছবি, সদ্যোজাত মানবসন্তানের কান্নার আওয়াজ, সৈকতে ঢেউ আঁছড়ে পড়ার আওয়াজ, দুজন মানুষের ভালোবেসে চুমু খাওয়ার আওয়াজ, মোজার্টের কিছু অসাধারণ সুর। সাথে রয়েছে ৫৫ টি ভাষার স্বাগত বার্তা, যাতে বাংলায় “নমস্কার! বিশ্বে শান্তি হোক” ও আছে। মানব সভ্যতাকে মহাবিশ্বের সামনে উপস্থাপন করার এই দ্বায়িত্বে ছিলেন আমেরিকান জ্যোতির্বিজ্ঞানী ও লেখক কার্ল সেগান ( Carl Sagan) । ভয়েজার ১ ছুটে চলেছে উর্ট মেঘমালার দিকে; আনুমানিক ৩০০ বছরেই পৌছে যাবে সেখানে । এরপর ৩০,০০০ বছর সে ছুটে বেড়াবে মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির এমাথা-ওমাথা। অন্যদিকে আগামী ২,৯৬,০০০ বছরে ভয়েজার ২ পৌঁছে যাবে পৃথিবীর আকাশ থেকে দেখতে পাওয়া সবচে’ উজ্জ্বল নক্ষত্র ‘লুব্ধক’ (Sirius) এর কাছাকাছি। তবে ২০২৫ সাল নাগাদ হয়তো দুজনের সাথেই যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যাবে। এরপর শুধুই নিঃশব্দ ছুটে চলা অসীমে।

আমাদের সৌরজগতের অবস্থান মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সির কেন্দ্র থেকে প্রায় ৩০,০০০ হাজার আলোকবর্ষ দূরে। প্রায় ১,০০,০০০ আলোকবর্ষ ব্যাসের এই মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সিতে প্রায় ১০ হাজার কোটি এরও বেশি নক্ষত্রের অবস্থান বলে ধারণা করা হয়। মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি হল আমাদের কসমিক এড্রেসের তৃতীয় ধাপ।

আমাদের নিকটতম গ্যালাক্সি হল অ্যান্ড্রোমিডা (Amdromeda) । মিল্কিওয়ে আর অ্যান্ড্রোমিডা- এই দুই দৈত্যাকৃতি গ্যালাক্সি এবং আশেপাশের অপেক্ষাকৃত ছোট আকৃতির গ্যালাক্সি নিয়ে গঠিত লোকাল গ্রুপ হল কসমিক এড্রেসের চতুর্থ ধাপ। লোকাল গ্রুপ

মহাবিশ্বের সর্ববৃহৎ স্থায়ী কাঠামো হল গ্যালাক্সি ক্লাস্টার। ১০০ থেকে শুরু করে কয়েক হাজার গ্যালাক্সি সমন্বয়ে এক একটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার গঠিত হতে পারে । গড়ে একটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টারের ব্যাস হয় কয়েক মেগাপারসেক(১ পারসেক= ৩.০৬×১০১৩ কিলোমিটার)। এরকম বেশ কয়েকটি গ্যালাক্সি ক্লাস্টার নিয়ে গঠিত হয় একটি সুপারক্লাস্টার। আমাদের মিল্কিওয়ে গ্যালাক্সি যে সুপারক্লাস্টারের অন্তর্গত তার নাম ভার্গো সুপারক্লাস্টার( Virgo Supercluster), যার আকার প্রায় ৩৩ মেগাপারসেক । সুতরাং ভার্গো সুপারক্লাস্টার হল কসমিক এড্রেস এর পঞ্চম ধাপ।

ভার্গো সুপারক্লাস্টার মহাবিশ্বের কেবল একটি ক্ষুদ্র আয়তন দখল করে। এতক্ষণ আলোচিত গ্যালাক্সি, গ্যালাক্সি ক্লাস্টার আর সুপারক্লাস্টারগুলোর হিসেব আমাদের দৈনন্দিন হিসেবের তুলনায় সত্যিই খুব বিশাল বিশাল ছিল। এই বিশালতাকে যদি আরো ১০ গুণ করে দিই তাহলে সেটা যে কল্পনাতীত হবে তা খুব সহজেই অনুমেয়। পৃথিবী থেকে ১.৩ বিলিয়ন আলোক বর্ষ দুরে গেলে তেমনই মহাবিশ্বের বিশালতা বেড়ে যায় দশগুণ। তখন ভার্গো সুপারক্লাস্টারসহ যে অগণিত সুপারক্লাস্টারের সমাবেশ দেখা যাবে তাকে বলা হয় দি পিসেস-সিটাস সুপারক্লাস্টার কমপ্লেক্স।

এই সুপারক্লাস্টারসীমা থেকেও যেতে হবে ১৩.৭ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে। মোটামুটি এই হলো আমাদের দৃশ্যমান মহাবিশ্ব। যদিও দৃশ্যমান মহাবিশ্ব মহাবিশ্বের কেবল ৪% আয়তন জুড়ে বিস্তৃত তবুও একেই আমাদের কসমিক এড্রেসের সর্বশেষ ধাপ বিবেচনা করা হয়।

তাহলে সংক্ষেপিত করলে ব্যাপারটা দাঁড়ায় এরকম-

পৃথিবী<সৌরজগত<মিল্কিওয়ে<লোকাল গ্রুপ<ভার্গো সুপারক্লাস্টার<দৃশ্যমান মহাবিশ্ব ।

কে বলতে পারে! একসময় হয়তো যোগাযোগ মাধ্যমে এই ঠিকানাই ব্যবহার করতে হবে!

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট। 

Leave a Comment