আত্মহত্যা প্রসঙ্গে দু’টি কথা

সামাজিক মাধ্যম ফেসবুকে লেখক আনিসুল হক আত্মহত্যা প্রসঙ্গে যেভাবে লিখেছেন, সেই বলার ভঙ্গি খুবই জঘন্য হলেও, মূল যেই মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করেছেন, সেটা সত্য।

আসলেই আত্মহত্যাকে গ্লোরিফাই করলে আত্মহত্যা বাড়ে। এজন্যই কার্ট কোবেইন, চেস্টার বেনিংটন কিংবা সালমান শাহ মারা যাওয়ায় আত্মহত্যার হার বেড়ে গিয়েছিলো। কেননা বিখ্যাত মানুষ এই কর্মটা সম্পাদন করেছে।
এমনকি যারা আত্মহত্যা করেছে তাদের নিয়ে বেশি কথা বললেও আত্মহত্যা বাড়ে। এই প্রসঙ্গেই আনিসুল হক কথা বলে সামাজিক মাধ্যমে কোপানলে পরেছেন। কেননা তার বলার ভঙ্গিমা দেখে অনেকেরই মনে হচ্ছিলো,তিনি সম্প্রতি আত্মহত্যা করা অরিত্রী অধিকারীর সহপাঠি ছাত্রীদের ক্ষোভ প্রকাশ করতে নিরস্ত করছেন।

ম্যালকম গ্লাডওয়েলের “টিপিং পয়েন্ট” বইয়ে একটা কেইস স্টাডি আছে। মাইক্রোনেশিয়া নামক একটি দেশের অধিবাসীদের সুইসাইড নিয়ে।

১৯৬০ সালের দিকে মাইক্রোনেশিয়াতে সুইসাইড খুবই কম ছিলো। কিন্তু হঠাৎ করেই সুইসাইডের সংখ্যা বাড়তে শুরু করে। ২০ বছরের মধ্যেই তা এতটাই প্রকট আকার ধারণ করে যে, ১৯৮০ সালের দিকে তা গিয়ে দাঁড়ায় এক লাখে ১৬০ জন। যা জাপানের চেয়েও বেশি।

যে কমিউনিটিতে সুইসাইড হয় মাইক্রোনেশিয়ায়, তার নাম ইবেয়ে কমিউনিটি। ১৯৫৫ থেকে ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত এই কমিউনিটির কেউ আত্মহত্যা করেনি। এরপর ১৯৬৬ সালে বাইসাইকেল চুরি করার দায়ে এক ১৮ বছর বয়সী তরুণ গলায় দড়ি দিয়ে আত্মহত্যা করে। অনেক দিন পর এই রকম ঘটনা ঘটলেও তৎক্ষণাৎ কোন পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া সে সমাজে দেখা যায়নি। কিন্তু ওই বছরেই আরেকটা আত্মহত্যা করে। এই ঘটনার তিন দিন পর আরেকজন। এর পরের সপ্তাহে আরেকজন। দশ বছরে সেই আত্মহত্যা গিয়ে দাঁড়ায় ২৫ জনে। এভাবে এক সময়ে বিস্ফোরণ ঘটে। দেখা যায় যারা আত্মহত্যা করছে তারা অধিকাংশই টিনেজ, তারা যে সমস্যায় পড়েছে, তার অন্যান্য সমাধান থাকলেও তারা এই পথ বেছে নিয়েছে।

অরীত্রী

এর কারন হলো, যে কোন আত্মহত্যা আসলে নিজেই একটা বিজ্ঞাপন। আরেকটা আত্মহত্যা করতে সে আগ্রহী করে। কিন্তু কিভাবে করে সে?

আধুনিক সমাজবিজ্ঞানের একটা ক্লাসিক্যাল বই হল এমিল দুর্খেইমের “সুইসাইড”। তিনি সে বইয়ে আমাদের জানাচ্ছেন যে, আত্মহত্যার পিছনে সবাই আমরা যদি ফ্রাস্ট্রেশন, ডিপ্রেশনকে দায়ী করি তাহলে একটা নির্দিষ্ট বয়সের (টিনেজ এবং তরুন) বিপুল পরিমান আত্মহত্যাকে ঠিক ব্যাখ্যা করা যায় না। কেননা বিভিন্ন বয়সের মানুষের প্রচন্ড হতাশা, ডিপ্রেশন, অর্থহীন অনুভব করাটা প্রায় কাছাকাছি।

দুর্খেইম এই বইয়ে একটা খুবই গুরত্বপূর্ন কথা বলেছেন। তিনি বলেছেন, যখন একটা সমাজের সামাজিক বন্ধনগুলো দূর্বল হয়ে পরে, আবার একই সাথে সেই সমাজের লোকজনকে শক্ত ও রিজিড কিছু নিয়মকানুন বা ভ্যালুজ এর ভিতর দিয়ে যেতে হয়- তখন আত্মহত্যা বাড়ে। মানে যে সমাজে একই সাথে কিছু শক্ত বিধিবিধান থাকে,এবং তার ক্ষমতা বাড়তে থাকে আবার অন্যদিকে মানুষের সাথে মানুষের ব্যক্তিগত সম্পর্ক দূর্বল হতে থাকে, তখন আত্মহত্যা বাড়ে।

কেনো? কেননা এটা একটা ডেস্ট্রাকটিভ কমিউনিকেশন। এখানে ব্যক্তি নিজেকে ধ্বংস করে আসলে তার কমিউনিটির সাথে “যোগাযোগ” করে।

যে সুইসাইড করার কথা ভাবছে এখন, তার সবচেয়ে বড় মোটিভেশনগুলো একটা হলো,
“আমার মৃত্যুর খবর পেলে আমার বাবা মা কিংবা এক্স কিংবা অমুক তমুক নিজের ভুল বুঝতে পারবে, কষ্টপাবে, কান্নাকাটি করবে, গিল্টিনেসে ভুগবে।” এবং আপনি সুইসাইড নিয়ে বেশি কথা বলে ঠিক সেই মোটিভেশনটাই আনকনশাসলি এখন যে সুইসাইডাল চিন্তা করছে তাকে দিয়ে দিচ্ছেন।

তার মানে কি, যে আত্মহত্যায় মারা গিয়েছে তাকে নিয়ে আমাদের আলাপ আলোচনা করা উচিত না? না, ব্যাপারটা সেটা না। তার চেয়েও আপনার গুরত্বপূর্ন দায়িত্ব এটা দেখা – আপনার বন্ধু কিংবা আত্মীয় সুইসাইডাল চিন্তা করছে কিনা। তাদের কথা শোনা। সে কিরকম অবস্থায় যাচ্ছে তা বোঝা। কমিনিউকেশন বাড়ানো। যাতে কোন ধ্বংসাত্মক উপায় তাকে কমিউনিকেশন করতে না হয়। এটেনশনটা মৃত্যুর পরে দিয়েন না, তার আগে দেন আসেপাশের মানুষকে। তাহলে জীবন বাঁচবে। আমাদের মনে রাখা জরুরী, কোন একজন ব্যক্তির আত্মহত্যার দায় তার আশেপাশের মানুষের উপরও বর্তায়।

আত্মহত্যা থামানোর আরেকটা গুরত্বপূর্ন স্টেপ হলো, বিচারহীনতার বিরুদ্ধে দাঁড়ানো। কর্তৃত্ববাদের বিরুদ্ধে দাঁড়ান। বিচার পরিবর্তনের জন্য তরুনরা যখন কোন এজেন্সি পায় না, তখন আত্মহত্যা বাড়ে। কেননা বিচারহীনতা ও কর্তৃত্বপরায়নতা অপটিমিজমের সকল ক্ষেত্রকে নষ্ট করে। প্রশ্ন ফাঁস হইলে একটা মেয়ে কিভাবে স্বপ্ন দেখবে সে ডাক্তার হবে? তার হতাশা বাড়বে কেবল।

একাধিক কেইস স্টাডি আছে অবিচারের সাথে আত্মহত্যার সম্পর্ক নিয়ে। সোশাল জাস্টিস প্রতিষ্ঠিত না হলে আত্মহত্যা বাড়বেই, কমবে না। জেনিফার মাইকেল হেখট জানাচ্ছেন, চসেস্কুর শাসনামলে কিভাবে আত্মহত্যার হার বেড়ে গিয়েছিলো। রোমান শাসনামলে কেনো স্টোয়িক দর্শন আত্মহত্যার কথা প্রচার করেছে। কারন ওই একটিই সোশাল ইনজাস্টিস।

ঠিকঠাক জাস্টিস থাকলে অরীত্রীকে পাবলিক শেইমের ভিতরে যেতে হতো না। মেয়েটা নিজেকে একরকম ঘৃনা করে, সবকিছুর জন্য নিজেকে দায়ী করে সুইসাইড করতো না। বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের তাকে পাবলিক শেইম,হ্যারাস করার কোন অধিকার নেই। কিন্তু তারা এই ইনজাস্টিস টা করেছে।

এসব এখনিই বুঝা উচিত। আরও আত্মহত্যার হার বাড়বে। আই রিপিট, আরও আত্মহত্যার হার বাড়বে। এই হলোকাস্ট রিয়েলিটি কে চোখ বন্ধ করে আপনি এড়াতে পারেন, রক্ষা পাবেন বলে মনে হয় না!

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

Leave a Reply