হগওয়ার্টস এক্সপ্রেস ও আমরা

যখন আমরা শিশুকালে থাকি তখন চারপাশে প্রচুর উপাদান থাকে যা দেখে আমরা মুগ্ধ হই। আনন্দিত হই। মাঝেমধ্যে সেই জিনিসকে খেলনা হিসেবে নিয়ে খেলতে শুরু করে দিই। একটা গাছের পাতা আমাদের কাছে হয়ে যায় ফ্লাইং সসার। কিংবা একটা কাঠের টুকরোকে গাড়ি হিসেবে কল্পণা করে সারা বাড়িকে হাইওয়ে বানিয়ে ছুটে বেড়াই। কল্পণার জগত তখন থাকে প্রচণ্ড রকমের শক্তিশালী। আমাদের কল্পণাপ্রবণ শিশুমন তখন চারপাশে খুঁজে বেড়ায় জাদুকরী সব উপাদান। এরকম এক মোহময় সময়েই খোঁজ পাই হ্যারি পটার সিরিজটার। বইয়ের জগতে হারিয়ে যাবার দুর্দান্ত অনুভূতি কাঠের কোন খেলনাও দিতে পারেনা। আর এ তো নিরেট এক কল্পণা। একদিন লাইব্রেরিতে চোখে পড়ল ঝকঝকে মলাটের একটা বই। প্রচ্ছদে এলোমেলো চুলের এক কিশোরের ছবি। পশ্চাৎপটে একটা দূর্গ আর সাথে তিন মাথার কুকুর। সব মিলিয়ে কেমন জাদুকরী একটা অনুভূতি দিচ্ছিল পুরো ব্যাপারটা।

হ্যারি পটার ব্যাপারটাই এমন। আমাদের মনে জাদুকরী এক অনুভূতি নিয়ে এসে মনে চিরজীবনের জন্য জায়গা করে নেয়। গল্পে এক এতিম কিশোর হঠাৎ করে জানতে পারে সে একজন জাদুকর। হগওয়ার্টস নামক জাদুবিদ্যার স্কুলে তাকে যেতে হবে। কাহিনীর শুরু থেকেই একের পর এক মজার সব কাহিনী ঘটতে থাকে। আর আমাদের মনে জায়গা করে নিতে থাকে পুরো হ্যারি পটার ইউনিভার্সটা। হ্যারি হগওয়ার্টসে গিয়ে যখন দারুণ দুজন বন্ধু পেয়ে যায় তখন আমরাও আপন এক অনুভূতির দেখা পাই। তারা একের পর এক মুখোমুখি হতে থাকে অদ্ভুত সব অ্যাডভেঞ্চারের। একে একে আমরা দেখি ডাম্বলডোরের মত গার্ডিয়ান ফিগার। ম্যাকগোনাগলের মত কঠোর আর স্নেহশীল এক চরিত্রকে। প্রফেসর স্নেইপ আমাদের মনে শঙ্কা জাগায় বারবার। আর হ্যাগ্রিডের উদার ব্যক্তিত্বে সে পরিণত হয় আমাদের সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্বে। রুদ্ধশাসে পাতার পর পাতা উলটে যাই। ভোল্ডেমরের মুখোমুখি হতে শিউরে উঠি বারবার। যখন বন্ধুত্ব আর ভালবাসায় হ্যারি পরাস্ত করে যায় সকল বাধা তখন অদ্ভুত এক তৃপ্তি হয়। ড্র‍্যাকো ম্যালফয়ও তখন কোন বিরক্তি সৃষ্টি করতে পারেনা।
আমার মনে আছে সিরিজের প্রিজনার অফ আজকাবান পড়ার পর টানা তিনদিন ঘোরের মাঝে ছিলাম। হগওয়ার্টস তখন আর কাল্পণিক কিছু হয়ে থাকেনি। সেই জগত হয়ে উঠেছে পুরোপুরি বাস্তব।
হ্যারি পটার সিরিজের মূল থিমটা হচ্ছে ভালবাসা। ভালবাসা যে সবকিছুকে জয় করতে পারে তা খুব দারুণভাবে দেখিয়েছেন লেখিকা। চরিত্রগুলোকে ধীরেধীরে ডেভেলপ করেছেন। করে তুলেছেন শক্তিশালী। ক্ষেত্রবিশেষে ভোল্ডেমরের মত চরিত্রের জন্যও ভাবতে হয়। যে তার এতসব কুকর্মের পেছনেও গভীর এক কারণ রয়েছে। করুণা হয়। সিরিজটার সার্থকতা সেখানেই।
হ্যারি পটার আসলে এর চরিত্রগুলোর জন্যই মনে এত দাগ কেটে গেছে। দ্য বারো। উইজলি পরিবারের ভাঙাচোরা বাড়ি। অথচ কি অদ্ভুত এক মায়া রয়েছে এই জায়গাটায়। মলি উইজলিকে পছন্দ করেনা এমন কোন পটারহেড খুঁজে পাওয়া যাবেনা। পুরো পরিবারের সদস্যদের পাগলামি আর আন্তরিকতা আমাদের মনে ছাপ ফেলে যায়।
এছাড়া এখানে নিষিদ্ধ বন এক নিষিদ্ধ আকর্ষণ। হ্যাগ্রিডের কুঁড়ের সাথেই থাকা বনে ভয়ংকর সব প্রাণীর বাস। সেন্ট্যর থেকে ইউনিকর্ন কি নেই! হ্যারি যখন স্কুলের নিয়ম ভেঙে জড়িয়ে পড়ত নিষিদ্ধ বনের কোন অ্যাডভেঞ্চারে তখন প্রচণ্ড রোমাঞ্চকর এক অনুভূতি হত।

সিরিজ যত অগ্রসর হয়েছে, এসেছে নতুন নতুন গুরুত্বপূর্ণ সব চরিত্রে। সিরিয়াস ব্ল্যাক, লুপিন থেকে শুরু করে প্রফেসর স্লাগহর্ন সবাই খুব গুরুত্বপূর্ণ। এই সিরিজের ঘোর থেকে বের হওয়া সহজ কথা না। জাদুর স্পেল থেকে পোশনের অধ্যায় সবকিছুই বুকে গেঁথে আছে। কাহিনীর শুরু থেকে পরিণতি সবই খুব আপন।

কিছু চরিত্র নিয়ে কয়েকটা কথা না বললেই নয়। প্রথমেই হ্যারি পটারকে নিয়ে অল্প বলি।
হ্যারি জেমস পটার খুবই চিরায়ত এক প্রধান চরিত্র। যার দুঃখজনক এক অতীত আছে। একজন চিরশত্রু আছে। আর আছে অসংখ্য শুভাকাঙ্ক্ষী। সর্বকালের ভয়াবহ কালো জাদুকর লর্ড ভোল্ডেমরের হাতে তার বাবামা মারা যায়। ভোল্ডেমরের হাতে হ্যারি নিজেও মারা যেত। কিন্তু স্পেল ঘুরে এসে আঘাত করে স্বয়ং ভোল্ডেমরকেই আঘাত করে। ভোল্ডেমরের অস্তিত্ব প্রায় নেই হয়ে যায়। আর এজন্যই জাদুবিশ্বে হ্যারি পটার এত বিখ্যাত থাকে। সে একরোখা, চুপচাপ আর দয়ালু। খুব ছোটবেলা থেকেই তার নিজের সিদ্ধান্ত তার নিজেকেই নিতে হয়। সে নিজের অর্জনকে কখনোই বড় করে দেখেনি, বিনয়ের সুন্দর দৃষ্টান্ত সে। হ্যারি সাহসী আর স্বার্থহীন। সেড্রিক ডিগোরির মৃতদেহ রক্ষা করাতেই তার প্রমাণ পাওয়া যায়। তার ভেতরে আত্মসম্মান প্রবল ছিল। তার এমন শক্তিশালী এক চরিত্র ছিল যা ভোল্ডেমরের জন্যও সম্ভব ছিলোনা। সে নিশ্চিত মৃত্যুকে গ্রহণ করে নিতেও ভয় পায়নি। প্রধান চরিত্রে এমন এক ক্যারেক্টার থাকলে বই প্রিয় হতে বাধ্য।

এরপর রোনাল্ড বিলিয়াস উইজলির কথা বলতে হবে। এই ক্যারেক্টারটা কাহিনীতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু চরিত্রগত দিকে চিন্তা করলে দেখা যায় সে সবসময় হ্যারির ছায়ায় ছিল। প্রধান তিন চরিত্রের মাঝে সবচেয়ে ইম্যাচ্যুর সে। সে মজার মানুষ কিন্তু খুব উদাসীন। কিন্তু রনের চমৎকার কিছু ব্যাপার আছে যেগুলো তাকে অনন্য করেছে। টানা ছয়টা বইয়ে সে খুব সাধারণ এক চরিত্র। কিন্তু সপ্তম বইতে গিয়েই হিসেব পালটে যায়। সে খুব দ্রুত তার ভুল আর সীমাবদ্ধতা বুঝে যায়। আর প্রবলভাবে চেষ্টা করে যায় সেটা অতিক্রম করতে। তার চেষ্টাই তাকে অবশেষে একজন প্রাপ্তবয়স্ক দায়িত্ববান মানুষে পরিণত করে। হারমাইওনি গ্র‍্যাঞ্জার বুঝতে পেরেছিল রনের চরিত্রের গভীরতাটা। আর সেজন্যই প্রেমে পড়েছে বেচারার। সব মিলিয়ে রনকে খুব বাস্তবের এক চরিত্র বলেই উপলব্ধি হয় শেষ পর্যন্ত।

এই ট্রেনে চড়ে যেতে হয় জাদুবিদ্যার স্কুলে

হগওয়ার্টস এক্সপ্রেস

প্রফেসর স্নেইপকে নিয়ে বলে ফেলতে চাই এখন। ধূসর চরিত্রের অন্যতম চমৎকার এক দৃষ্টান্ত সে। খুব ঠাণ্ডা, ধূর্ত, হিসেবি আর খুব তিক্ত এক ব্যক্তিত্ব সে। হ্যারি পটারকে সে একদমই পছন্দ করেননা। পরবর্তীতে জানা যায় হ্যারির বাবা জেমসের সাথে তার পূর্বশত্রুতার জের ধরে এ ধরণের আচরণ করেন তিনি। স্কুলে থাকাকালীন অন্তর্মুখী একাকী কিশোর স্নেইপকে জেমস আর তার বন্ধুরা আরো নিজের মাঝে ঢুকে যেতে বাধ্য করেছিল। সে তার শোধ নেয় রূঢ় আচরণের মাধ্যমে। সে ছিল প্রচণ্ড মেধাবী। একাকীত্ব থেকেই সে ভেবেছিল খুব আকর্ষণীয় কিছু করে ফেলতে। অন্ধকারে তার আকর্ষণ বেশি ছিল সবসময়ই। তাই সে ডেথ ইটারে যোগ দেয়, ভেবেছিল লিলিকে ইমপ্রেস করা যাবে। কিন্তু একটা সময় ভুল ভাঙার পর সে ন্যায়ের পথে অটুট থাকে। তার সামনে খারাপ হবার সুযোগ ছিল, সে খারাপ পথে গিয়েছিলও। কিন্তু পরিস্থিতি তাকে বুঝিয়ে দিয়েছে সুযোগ পেলেই বিপথে যাওয়া কোন কাজের কথা নয়। তখনই সে ফিরে এসেছে ঠিক পথে। আর সারাজীবন লালন করে গেছে তার ভালবাসাটা। সে ভালবাসতে জানত। যে গুণটা খুবই বিরল।

প্রফেসর ম্যাকগোনাগল চরিত্র হিসেবে উল্লেখযোগ্য। তিনি যেমন খুব কঠোর তেমনি খুব উদার। খুব কঠিন এক ব্যক্তিত্বের মহিলা তিনি। নিজের পূর্ণ যোগ্যতায় অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জাদুকরে পরিণত হয়েছেন তিনি। তিনি খুব জটিল সময়ে সারকাজম করতে পারেন। কিন্তু এমনিতে তাকে হাসতে দেখাটাও দুর্লভ। তিনি ন্যায়ের ক্ষেত্রে কোন ছড় দেননা। সবসময় সরাসরি কথা বলতে পছন্দ করেন। তার সামনে কেউ বোকামি করলে বিরক্ত হন। সাহসীকতাকে পছন্দ করেন তিনি। খুন কঠোর হলেও তার ছাত্রছাত্রীদের খারাপ সময়ে তাকে খুব দয়ালু রূপে পাওয়া যায়।

জাদুর দুনিয়ার বইপত্র

হারমাইওনি জিন গ্র‍্যাঞ্জারকে নিশ্চয়ই মিস করছিলেন সবাই। আর মিস করতে হবেনা। হারমাইওনিকে নিয়ে পেজের পর পেজ লিখা যাবে। তার প্রধান বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তার দুর্দান্ত বুদ্ধিমত্তা আর প্রচুর পড়াশোনা। সে লাইব্রেরিকে ব্যবহার করে তথ্য একত্রিত করত। আর সেটাই ভোল্ডেমরকে পরাজিত করতে সবচেয়ে বেশি সাহায্য করেছে। হারমাইওনির মাঝে সবকিছুতে মাতবরি ফলানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। কিন্তু সে এটার যোগ্য। তার সবচেয়ে বড় ভয় কোনকিছুতে পরাজিত হওয়া। আর এজন্যই সে সবসময় তার দায়িত্বের প্রতি ফোকাসড থাকে। যাদের আত্মরক্ষার ক্ষমতা নেই তাদেরকে সাহায্য করতে সে সবসময় প্রস্তুত। হারমাইওনি চেষ্টা করে সবসময় যেকোন সমস্যা দ্রুত ক্যালকুলেট করে ফেলতে। আর সে অনুযায়ী প্ল্যান বানাতে। সে বন্ধুদের প্রতি খুব লয়াল। বন্ধুরা তার উপর সবসময় ভরসা রাখতে পারে।

আরো অনেক চরিত্র নিয়ে বলে মনের নানা ভাব প্রকাশ করা যেত। কিন্তু আপাতত থাকুক সেটা। হ্যারি পটার নিয়ে আলোচনা শুরু হলে শেষ করা সহজ হয়না। এই জাদুকরী জগতে বারবার ঢু মারতে ইচ্ছে হয়। আর এজন্যই বোধহয় বারবার পড়া হয় হাজারটা বই থাকলেও। এই মায়া ত্যাগ করা খুব সহজ নয়।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

Leave a Reply