জনবিচ্ছিন্ন সংগীত ও জনসংযোগের সংগীত

ইস্ক্রা রহমান ও শাদিউল আলম জীবন কর্তৃক যৌথভাবে লিখিত।

১. বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার

জ্ঞান সংক্রান্ত যাবতীয় আলাপের গোড়ার কথা হল তন্ত্র বা লোকায়ত বনাম বেদ। বৈদিক ধারণার মূলকথা হল কর্ম থেকে জ্ঞানকে বিচ্ছিন্ন করে জ্ঞানজীবী শ্রেণী তৈরি করা তথা শাসক শ্রেণী তৈরি করা। সংগীতেও এর আছর আছে। সংগীতেরও গোড়ার কথা দুইটি – ধ্রুপদী তথা বৈদিক এবং লোকসংগীত তথা তান্ত্রিক। লালনের গানে এসেছে –

“বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার
উদয় হয় না দিনমণি।
এই দেশেতে এই লাভ হল,
আবার কোথা যাই নাজানি।”

অর্থ্যাৎ, বৈদিক শাসনে পৃথিবীতে ঘোর অন্ধকার নেমে এসেছে। লালনের এই কথাগুলো থেকে বোঝাই যাচ্ছে, বৈদিকতার এক শাসক চরিত্র আছে। সংগীতেও এটা প্রকটভাবে প্রকাশিত। ধ্রুপদী বা রাগসংগীত codified। বিশেষ গুরুর কাছে কিংবা ভাতখন্ডে স্কুলে বসে রাগসংগীতের গায়কী ঘরানা আয়ত্ত করা যায়। কিন্তু, লোকসংগীতের তেমন নির্দিষ্ট কোন code নেই। থাকতেও পারে না। নেই তার গুরুমুখী ঘরানা। যা আছে তাকে আমরা বলতে পারি ‘বাহিরানা’ বা আঞ্চলিকতা – এই মত দিয়েছেন হেমাঙ্গ বিশ্বাস।[1] হেমাঙ্গ বিশ্বাসের এই মতটি গ্রহণযোগ্য। রাগসংগীতের মত লোকসংগীতের কোনো কোড না থাকলেও আছে কিছু বৈশিষ্ট্য, যেসব তার স্বকীয়তাকে ফুটিয়ে তোলে। আর, আঞ্চলিকতার কারণেই লোকসংগীত জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি। অপরদিকে, সুকঠোর নিয়ম ও শাসনের জালে রাগসংগীত হয়ে উঠেছে বৈদিক, ঘরমুখী, শাসক-চরিত্রের জনবিচ্ছিন্ন সংগীত।

রাগসংগীত যেমন ঘরমুখী, গুরুমুখী, তাই এটা অবধারিতভাবে কর্ম থেকে জ্ঞানকে বিচ্ছিন্ন করে। ফলে, গুরু হয়ে ওঠেন প্রশ্নাতীত ব্যক্তি, তার কথা যেন “বেদবাক্য।” যেমন: রবীন্দ্রসংগীত আঁটঘাঁট ঘরানায় বাঁধা পড়েছে। ‘গীতবিতান’,’দক্ষিনী’, বা ‘রবিতীর্থে’ বসে তা আয়ত্ত করা যায় শিক্ষকের তত্ত্বাবধানে।[2] অথচ, আমরা সবাই জানি রবীন্দ্রসংগীতে আছে লোকসংগীতের প্রভাব।

জ্ঞান বনাম কর্মই হল পৃথিবীর আদিতম শ্রমবিভাজন।[3] তবে, যদি ভেবে বসি যে, লোকায়ত এবং বৈদিকতা দুটি স্বতন্ত্র্য ধারা যা সূচনালগ্ন থেকেই ছিল, তাহলে ভুল হবে। বৈদিক ঐতিহ্য অতি প্রাচীন একথা সত্য। কিন্তু, এ দুটি ধারা একসঙ্গে যাত্রা শুরু করেনি।[4] বরং, সুদূর অতীতে লোকায়তিক চিন্তাধারার সঙ্গে বৈদিক ঐতিহ্যের বিরোধ ছিল কিনা তা সন্দেহের কথা। কারণ, বৈদিক সাহিত্যের মধ্যেই লোকায়তিক ধ্যানধারণার রাশিরাশি চিহ্ন পাওয়া যায়। বিভিন্ন সংহিতা, উপনিষদ ইত্যাদি রাতারাতি তৈরি হয়নি। এর থেকে দুটি সিদ্ধান্তে আসা যায় –

১. বৈদিক যুগের পূর্বে ভারতবর্ষে শ্রমবিভাজন ছিল না এবং

২. লোকায়ত দর্শনেরই পর্যায়ক্রমিক শাস্ত্রীয় বা কোডিফাইড রূপ হল বৈদিক দর্শন।

বৈদিক শাস্ত্র জনবিচ্ছিন্নতার জন্ম দেয়। জ্ঞান থেকে কর্ম যখন বিচ্ছিন হয়ে গেল তখন জ্ঞানজীবিরা জনগণের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলেন। তারা তাদের জ্ঞানবুদ্ধি বিতরণকে পেশায় পরিণত করলেন, নিজেরা কোনো কর্মে নিয়োজিত হলেন না। তারা বলতে চাইলেন জ্ঞান বিতরণই কর্ম, অর্থ্যাৎ, তারা নিজেরাই উৎপাদন যন্ত্র এবং একইসাথে পণ্যও বটে। এর ফলে তারা স্রেফ বসে বসে খাওয়ার বন্দোবস্ত করে ফেলেন। ফলে, বৈদিক শাসনব্যবস্থার জন্ম হয়। জ্ঞান থেকে কর্মকে বিচ্ছিন্নতার এটাও একটা ফলাফল যে, এতে জ্ঞানজীবীগণ শাসক হয়ে ওঠেন। সংগীতের বেলায়ও এই চরিত্র স্পষ্ট হয়। লোকসংগীতের ‘জলীয়তা’, ‘অনুপ্রাসের ছটা’, ‘ইতরভাষা’, ’শিথিলছন্দ’ নিয়ে সমালোচনা করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ।[5] তবে, এর কারণ অনুসন্ধানে আগ্রহী ছিলেন না। এ দায় লোককবিদের নয়, এ দায় ছিল নব্য বণিক বাবুদের বিকৃতরুচির খোরাক, যার যোগান দিয়ে কবিওয়ালাদের জীবিকা নির্বাহ হত। সুতরাং, একটা বিষয় স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে যে, বৈদিক শাসনের সংস্পর্শে গেলে লোকায়তিকের দুর্দশার অন্ত থাকে না। অর্থ্যাৎ, বৈদিক সবসময়ই শাসক, এবং লোকায়িতক হলেন শোষিত। সামন্ত যুগের জমিদারেরা হলেন বৈদিক শাসক। সংগীতে তাদের শোষণের ইতিহাসের বর্ণনা পাওয়া যায় পূর্ববঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনে কবিয়াল রমেশ শীলের ভাষণ থেকে। তিনি বলেছিলেন –

“গ্রামের চাষী গরীব হইল, ফুলিয়া ফাঁপিয়া উঠিল জমিদার মহাজনের দল, চাষীরা আর গ্রাম্য কবি ও লোকশিল্পীদের অন্নসংস্থান করিতে পারে না। গ্রাম্য কবিগণ পেটের দায়ে এবং মোটা অর্থের প্রলোভনে জমিদার মহাজনদের উৎসব মণ্ডপে আসিয়া ভিড় জমাইল। বাউণ্ডুলে ইয়ারদোস্ত পরিবৃত ধনী জমিদার বাবুদের মনোরঞ্জন করিতে গিয়া গ্রাম্যকবিগণ অশ্লীল ভঙ্গীতে নাচিল, গান গাহিল। নারীজাতির কুৎসা রটনা করিয়া তথাকথিত পুরুষপুঙ্গবকে পরিতৃপ্ত করিল। আমার ব্যক্তিগত কবি-জীবনে অসংখ্যবার এইভাবে নাচিয়াছি। অশ্লীল গান গাহিয়াছি।…”[6]

বৈদিক যুগের রাজা-রাজড়াদের শাসনের সাথে বৃটিশ শাসনেরও বিশেষ ফারাক নাই। এটাও যে বৈদিক শাসনের উপর ভর করেই দাঁড়িয়েছিল। বৈদিকরা যুগে যুগেই শাসক, শাসনই তাদের দার্শনিক ভিত্তি। তারা শাস্ত্র রচনা করে। অপরদিকে, তন্ত্র হল যাবতীয় শাস্ত্রের বিরোধী। তাই লালনের গানে চলে আসে. “বৈদিক মেঘে ঘোর অন্ধকার”। লালন হলেন তান্ত্রিক। কিন্তু, তিনি কখনো একথা নিজমুখে বলেন নাই। এর একটা কারণ, এটা বলা বিপদজনক। কারণ, বৈদিক শাসনপ্রণালী নির্যাতন করে তান্ত্রিক দর্শনের উপরে। তারা মনে করে সুনির্দিষ্ট নিয়মকানুন ছাড়া শাসন করা সম্ভব নয়। তাই, তারা তান্ত্রিকদের দমন করে। কেউ তান্ত্রিক হলেই তাকে অপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে জনবিচ্ছিন্ন করার চেষ্টা করে। কিন্তু, প্রকৃতপক্ষে তারাই জনবিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। কারণ, তান্ত্রিক আশ্রয় নেয় মানুষের মাঝে আর বৈদিক থাকে প্রাসাদে। তাই, বৈদিক জ্ঞানের সবকিছুই গৃহমুখী, বিদ্যালয়মুখী, গুরুমুখী। বৈদিক শাসকের সবই আইনকানুনের বেড়াজালে বদ্ধ, সুরক্ষিত। অপরদিকে, তান্ত্রিক সাধকের সবই বাহিরমুখী, সবই উন্মুক্ত। সেখানে গান হল জনসাধারণের সঙ্গে সংযুক্ত হবার অন্যতম মাধ্যম।

তন্ত্র কোনো মতাদর্শ নয়; তাই বিচিত্র। এটাই শাসকের মাথাব্যথার মূল কারণ। এর ইউনিফর্মিটি না থাকার কারণে সকলের ক্ষেত্রে একই বিধি প্রয়োগ করা যায় না। ফলে, শাসনব্যবস্থা তৈরি হয় না, হায়ারার্কি তৈরি হয় না, জাত-পাত থাকে না, সৈন্যবাহিনী তৈরি করা যায় না। এককথায় পুরো শাসনব্যবস্থারই বিপরীতে এর অবস্থান। এতে ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানার ধারণাও অনুপস্থিত। তাই, এখানে নারীর অবস্থান ঠিক পুরুষের মতোই। যেহেতু, নারী হলেন ব্যক্তিগত সম্পত্তির আধার, তাই, বৈদিকতার চোখে তান্ত্রিকতা নিছক দূরাচার, লাম্পট্য। ব্যক্তিগত সম্পত্তির অনুপস্থিতির কারণে গান এখানে পণ্য হয়ে উঠতে পারেনি। কিন্তু, বৈদিক যুগের আধুনিকতম সময়ে গান এখন পণ্য। কিন্তু, সারা বাংলায় ছড়িয়ে থাকা লোকসংগীত আজও মানুষে মানুষে যোগাযোগের মাধ্যম, কোনো পণ্য নয়। তবে, কপিরাইট, ট্রেডমার্ক, স্টার, সেলিব্রিটি সংক্রান্ত আলোচনায় তাই বৈদিক শাসক চরিত্রের পুরোপুরি প্রভাব আছে। তাই, এসব সংক্রান্ত আলোচনায় ঢোকার আগে বেদ ও তন্ত্রের চরিত্র ও দর্শনগত পার্থক্য বোঝাটা জরুরী।

২. দেখে এলেম তারে…

আলোচনার সুবিধার্থে আমরা লোকায়ত বা তান্ত্রিক জীবনদর্শনের উদাহরণস্বরূপ ফকিরী জীবনদর্শন সম্পর্কে আমাদের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করব। যা লিখছি তা থেকে ফকিরী জীবন ব্যবস্থা বা সংস্কৃতি সম্পর্কে সম্পূর্ণভাবে জানা না গেলেও যতটুকু জানা যাবে তা থেকে এই লোকায়ত দর্শনের মূলকথাটার অন্তত একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যাবে। কেননা, ফকিরী জীবন ব্যবস্থাটাকে সম্পূর্ণভাবে জানার জন্য দীর্ঘ সময় ধরে সেই জীবন যাপন করা আবশ্যক। আমি মাত্র একটি দিন একজন ফকিরের সাথে কাটাতে পেরেছি। তাই ফকিরী জীবন ও সংস্কৃতির অনেক বিষয় নিয়েই আমি নিজেই খুব বেশি পরিষ্কার নই। তাই আমি নিজের মতামত না লিখে সেই ফকিরের সাথে আমার কথপোকথন, আমার অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি লিখে প্রকাশ করছি।

আমি যে ফকিরের সঙ্গে দেখা করেছিলাম তার নাম মনির ফকির। ময়মনসিংহ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন ব্রহ্মপুত্র নদের পশ্চিম দিকে চর কালীবাড়িতে তার দরবার ও বসবাস। তার দরবারে যাওয়ার পরে তার সাথে আমাদের প্রায় ৩-৪ ঘন্টার একটি কথপোকথন চলে। আমরা মূলত তার কাছে ফকিরী জীবন ও সংস্কৃতি সম্বন্ধে বিভিন্ন প্রশ্ন করেছি এবং তিনি সেসব প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন।

প্রথমেই আমরা প্রশ্ন করি, ”ফকিরী কি?” এ প্রশ্নের উত্তরে তিনি প্রথমেই কিছু শব্দের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেন। ফকিরী জীবন ব্যবস্থা সম্পর্কে জানার জন্য এ শব্দগুলোর সঙ্গে পরিচিত হওয়াটা খুব বেশি জরুরী। শব্দগুলো হলো – মাশুক, আশেক, মারফতি, কালাম এবং ফকির।

তিনি বলেন, আশেক মানে হলো, ভক্ত বা শিষ্য। এবং মাশুক মানে হলো গুরু, জ্ঞানী অথবা শিক্ষক। মারফতি আলাপ মানে হলো গোপন আলাপ, যা আশেক আর মাশুকের মধ্যে চলে। এবং, কালাম মানে হলো শিক্ষা, জ্ঞান, দর্শন, লেকচার, Lesson ইত্যাদি। বিভিন্ন বিষয়ের উপর তারা কালাম দিয়ে থাকেন। এবং, এই কালামের একটি অংশ হলো গান।
অর্থাৎ, তারা জ্ঞান, শিক্ষা, দর্শন প্রচারের মাধ্যম হিসাবে গানকে ব্যবহার করে থাকেন। এবং কালাম হিসেবে ব্যবহৃত এই গানগুলোকেই বলে ফকিরী বা মারফতি গান। তাদের গান করার মূল উদ্দেশ্যই হলো জ্ঞান ও দর্শনের শেয়ারিং এবং জীবনকে আরও বেশি উপভোগ্য আর জ্ঞান ও দর্শনকে মানুষের কাছে আরও বেশি আকর্ষনীয় করে তোলা। তারা অবশ্য এটাকে গান বলেন না। তারা গানকে বলেন কালাম।

সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো শুধু মাশুক বা শিক্ষকই নয়, আশেক বা শিষ্যও শিক্ষককে জ্ঞান দিতে পারে। অর্থাৎ, জ্ঞান বা শিক্ষার প্রকৃত শেয়ারিঙই তাদের উদ্দেশ্য । সবশেষে তিনি আমাদের ফকির শব্দের মানে বুঝান। ফকির শব্দের মানে হলো “নিঃস্ব”। তবে, এখানে শুধু ধনসম্পদ হারিয়ে নিঃস্ব হওয়া বোঝায় না। এ নিঃস্ব হওয়া মানে হলো যাবতীয় পিছুটান ও মানুষের খারাপ গুনাগুন এবং যা অন্য মানুষকে অশান্তি দেয় তা জীবন থেকে বাদ দিয়ে, ছেড়ে নিঃস্ব হওয়া।

এবার তিনি আমাদের প্রশ্নের আসল উত্তর দেন। তিনি বলেন ফকিরী হলো সেই জীবন ব্যবস্থা যেখানে আশেক ও মাশুকের মধ্যে একটি সম্পর্ক গড় উঠে এবং তাদের মধ্যে কালামের মাধ্যমে দর্শন ও জ্ঞানচর্চা শুরু হয় এবং সেই জ্ঞানের প্রকৃত প্রয়োগের মাধ্যমে আশেককে প্রকৃত ফকির হয়ে উঠতে হয়। দর্শনচর্চা, জ্ঞান অর্জন ও তার প্রকৃত প্রয়োগের মধ্যমে জীবন যাপনের এই ব্যবস্থাটাকেই ফকিরী বলে।

এর পরে আমরা তার কাছে তাদের দর্শন সম্পর্কে জানতে চাই। তখন তিনি বলেন যে, কোনো কিছুই যুক্তি ছাড়া বিশ্বাস করতে তারা নারাজ এবং তারা যা দেখতে পান না বা, যার বাস্তবে কোনো অস্তিত্ব নাই তা বিশ্বাসও করেন না। তবে, তারা কোনো ধর্মের অনুসারী নাকি কোনো ধর্মেরই অনুসারী নন, তা সম্বন্ধে জানতে পারিনি। তবে বিভন্ন ধর্মের আলোচ্য বিষয়গুলোকে বাস্তবসম্মত যুক্তির সাহায্যে বিবেচনা করা, বিশ্লেষন করা এবং তা থেকে গ্রহনযোগ্য বিষয়গুলোকে গ্রহন আর বর্জনীয় বিষয়গুলোকে বর্জন করাই হলো তাদের লক্ষ্য। শুধু তাই নয়, তারা তাদের চেয়ে বেশি যুক্তি সম্পন্ন মতামতও সাদরে গ্রহন করেন। অর্থাৎ, যা কিছুই যুক্তিসম্পন্ন, সেটাই তাদের কাছে গ্রহনযোগ্য; এর বিপরীত সবই বর্জনীয়।

এরপর আমরা তাকে জিজ্ঞাসা করি, ”ফকিরীর উদ্দেশ্যটা কি?” এই প্রশ্নের উত্তর শুনে যা বুঝেছি তা হলো, তারা তাদের ভক্ত বা শিষ্য এবং মানুষদের নিয়ে এমন একটা কমিউনিটি তৈরী করতে চাচ্ছেন যেখানে সবাই স্বাধীনভাবে নিজ নিজ দৃষ্টিভঙ্গি অনুযায়ী চিন্তা করতে পারবে, কাজ করতে পারবে, একে অপরের মধ্যে একটা সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক গড়ে উঠবে, সবাই সবার দায়িত্ব নিবে এবং শান্তি বজায় রাখবে। অর্থাত্‍ ধরেই নিতে পারি যে ফকিরীর মূল উদ্দেশ্যটাই হলো শান্তি। এবার আমি একটু সেখানে যাওয়ার পর আমার অভিজ্ঞতা ও উপলব্ধি সম্বন্ধে কিছু কথা বলি। অন্তত আমার কাছে ফকির মানেই হলো একজন দার্শনিক যিনি তার দর্শন অন্যের কাছে পৌছে দেওয়ার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন প্রতিনিয়ত।

সেই দরবারে যাওয়ার পর আমি সত্যিই অভিভূত হয়ে গেছি। আমি তাদের আপ্যায়ন দেখে অবাক হয়েছি। সেখানে যাওয়ার পরপরই তারা আমাদের জন্য খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেন। খুব বেশি কিছু না হলেও ক্ষুদ্র পরিসরে খাবারের একটা বন্দোবস্ত করেন। শুধু তাই নয় তিনি নিজে সারা রাত না ঘুমিয়ে তার দরবারে আমাদের ঘুমানোর ব্যবস্থা করে দেন। এতে আমি সত্যিই খুব অবাক হয়েছি। কেননা ফকির, পীরদের ব্যাপারে আমাদের সমাজে অনেক ধরনের ভুল মতবাদ আছে। আমি নিজেও এমন অনেকবার শুনেছি যে, ফকিররা নাকি মানুষের ধর্মানুভূতিকে ব্যবহার করে ব্যবসা করে। কিন্তু সেখানে গিয়ে আমি পুরোই ভিন্ন চিত্র দেখে আসলাম।

এমনকি কেউ কোনো সংকটে পড়লেও তারা তাদের সাধ্য মতো সাহায্যও করে থাকে। আর, ব্যবসার কথা তো দুরেই থাক। আমি এটা খুব ভালোভাবেই উপলব্ধি করতে পেরেছি যে, আমাদের সমাজ থেকে তাদেরকে দূরে সরিয়ে দেওয়ার জন্য ভুল এবং বিভ্রান্তকর ধারণা ছড়ানো হচ্ছে প্রতিনিয়তই। তাদেরকে প্রতিনিয়ত আমাদের সামনে যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে তা মোটেও সঠিক নয়। এবং, এসব নিয়ে তারা সর্বদাই খুব ভয়ে ভয়ে থাকে।

তারা যে শাসকের গৎবাঁধা নিয়ম-কানুন থেকে মানুষকে বের করে আনতে চাচ্ছেন তার জন্যও তাদেরকে নানা ধরনের প্রতিকূলতার মুখোমুখী হতে হচ্ছে। শাসকের বানানো নিয়ম-কানুন থেকে বাঁচবার জন্য তাদেরকে অনেক ধরনের কৌশল অবলম্বন করতে হচ্ছে প্রতিনিয়তই। এবং, এসব কারণেই তারা আমাদের থেকে দিন দিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছেন। যদিও তাদের উদ্দেশ্যই হলো সকল মানুষের নিকটে এসে তাদের দর্শন ছড়িয়ে দেওয়া। কিন্তু নানান কারণেই তারা এই কাজটি করতে ভয় পাচ্ছেন, ইতস্তত বোধ করছেন এবং আমাদের থেকে দিনদিন বিচ্ছিন্ন হতে হচ্ছে।

এবার বলি জীবিকা নির্বাহের জন্য তারা কি কি কাজ করে থাকেন। তাদের এই কাজগুলো ভৌগলিক ও সামাজিক অবস্থানভেদে পরিবর্তিত হয়। যেহেতু, মনির ফকিরের বসবাস ব্রহ্মপুত্র নদের পাশের চরে, তাই, জীবিকা নির্বাহের জন্য ব্রহ্মপুত্র নদ থেকে তিনি নিজে মাছ ধরেন, বিভিন্ন শাকসব্জি চাষও করেন, এসব বেঁচে টাকাও উপার্জন করেন। পাশাপাশি অন্যান্য কাজ করেন এবং একজন সাধারণ গ্রামের মানুষের মতোই তিনি জীবনযাপন করেন।

এবার বলি গান নিয়ে তাদের চিন্তাভাবনা কেমন। তারা তাদের গান ব্যবহারই করেন শুধুমাত্র তাদের দর্শন মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। এবং, গানকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করাটা তাদের কাছে একেবারেই ঘৃণ্য একটা ব্যাপার। তারা মনে করেন গানকে পণ্য হিসেবে ব্যবহার করা হলে গান গাওয়ার মূল উদ্দশ্যটাই ক্ষুন্ন হয়। তাদের গান গাওয়ার মূল উদ্দেশ্যই হলো গানের মাধ্যমে নিজেদের দর্শন ও জ্ঞান ছড়িয়ে দেওয়া এবং গান গাওয়ার মাধ্যমে জীবনটাকে উপভোগ করা ও নিজেকে প্রকাশ করা।

৩.শিল্পীর দায়িত্ব সমাজের

“কি কাম করলাম রে ভাই গাজীর গীত গাইয়া
পাঁচ আনা রুজি করলাম পাঁচ সিকার খাইয়া।”

সৃষ্টিকে প্রকাশের বিপক্ষে সর্বশেষ বৈদিক নিদর্শন হল কপিরাইট আইন। আইন-কানুন-কর্তৃপক্ষ এসবই মানুষের সৃজনশীলতার প্রকাশের পথে বাঁধা। সংগীতের ক্ষেত্রেও তা মোটেই ব্যতিক্রম নয়। এই আধুনিক সময়ে কমার্শিয়াল সুর নামক একটা ধারণা পৃথিবীব্যাপী চালু হয়েছে। এখন গান বাজারের commodity বা পণ্য।[7] আমরা বেশীরভাগ সময়েই একে প্রফেশনালিজম ভেবে গুলিয়ে ফেলি। কিন্তু, কমার্শিয়ালিজম ও প্রফেশনালিজম মোটেও এক জিনিস নয়। অতীতেও গ্রামে পেশাদার শিল্পী ছিল। তখন শিল্পে আর পেশায় সংঘাত ছিল না। বরং, পেশাটা শিল্পে উৎকর্ষের কারণ ছিল। কিন্তু কেন? কারণ, তখন শিল্পীর দায়িত্ব সমাজ নিতে পারতো। শিল্পী ও শ্রোতার সম্পর্কটা শুধু প্রমোদ বিতরণের জন্য ছিল না।[8] বরং, সম্পর্কটা ছিল সামাজিক দায়িত্বের। গোষ্ঠীচেতনার ঐক্য গড়তে এবং একইসাথে কর্মজীবনেরও প্রেরণা হিসেবে তখন শিল্পী-শ্রোতার সম্পর্ক ছিল। এই ঐক্য সাধিত হয়েছিল কোনো মধ্যসত্ত্বভোগীর স্থান না থাকায়। শিল্পীর সাথে শ্রোতার সংযোগ ছিল সরাসরি, কারণ, শিল্পী নিজেও যে ঐ একই শ্রেণীরই মানুষ।

সামন্তযুগেই এই পারস্পরিক সম্পর্ক বিনষ্ট হয়। কিভাবে এই সম্পর্ক নষ্ট হয়েছিল তা জানা যায় কবিয়াল রমেশ শীলের ভাষণ থেকে। ওই ভাষণের উদ্বৃতি প্রথম অধ্যায়েই দিয়েছি জন্য এখানে আর পুনরাবৃত্তি করছি না।

সামন্তযুগ থেকে এরপর এলো পুঁজিবাদের যুগ। লোকরঞ্জনের সমস্ত মাধ্যমগুলি একচেটিয়া আধিপত্যে গণরুচি তৈরিতে প্রতিযোগীতায় নেমে পড়লো। এরজন্য প্রয়োজন হল ট্রেডমার্ক, ব্র্যান্ড, কপিরাইট, স্টার, সেলিব্রিটি ইত্যাদি ধারণা ও বিধিনিষেধ তৈরি করার। আধুনিক সময়ে রেকর্ডিং যন্ত্রপাতির আবিষ্কার, বিকাশ ও সহজলভ্যতার সাথে সাথে কপিরাইট আইনের কারণেই মানুষ “পাইরেসি” ধারণারও সন্ধান পেল। বিষয়টির একটি সুন্দর ব্যাখ্যা করেছেন আমেরিকান লেখক করি ডকট্রো (Cory Doctorow).

“Creators (and, notably, their industrial investors) are notoriously resistant to new media. The composers damned the record companies as pirates; the record labels damned the radio for its piracy; broadcasters vilified the cable companies for taking their signals; cable companies fought the VCR for its recording “theft.” Big entertainment tried to kill FM radio, TV remote controls (which made it easy to switch away from adverts), jukeboxes, and so on…” [9]

অর্থ্যাৎ, শিল্পীদের এবং তাদের পেছনে যারা লগ্নি করেন তাদের নতুন মাধ্যমের প্রতি এক ধরণের প্রতিবন্ধক মনোভাব কাজ করে। সুরকারেরা একসময় রেকর্ডিং কোম্পানীগুলোকে পাইরেট বলে গালি দিত; রেকর্ডিং কোম্পানীগুলো আবার রেডিওকে পাইরেসির দায়ে অভিযুক্ত করতো; টিভিচ্যানেলগুলো ক্যাবলটিভি কোম্পানীগুলোকে তাদের সিগনাল অপব্যবহারের দায়ে দায়ী করতো; আবার ক্যাবল কোম্পানীগুলো বাড়িতে বসে ভিসিআর রেকর্ডিং কে চুরি বলে আখ্যা দেয়। বড় বড় প্রযোজনা প্রতিষ্ঠানগুলো এফএম রেডিও, টিভি রিমোট কন্ট্রোল বা জুকবক্সের মত যন্ত্রের বিরোধী ছিল।

এভাবেই যুগে যুগে বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমগুলো বাঁধা পেতে পেতে অদ্যাবধি এসেছে। মজার কথা হলো, এদের কোনোটিই শেষপর্যন্ত হারিয়ে যায়নি, বরং, বহাল তবিয়তে সব মাধ্যমই টিকে আছে। সাম্প্রতিক সময়ে কম্পিউটার আর ইন্টারনেটের যুগে পাইরেসি নিয়ে যত চিন্তা সেটাও নিতান্তই অমূলক। বরং, পাইরেসি নিয়ে যে ভয় শিল্পীদের মধ্যে কাজ করে থাকে তারজন্য বিদ্যমান কপিরাইট আইনের দৃষ্টিভঙ্গীই দায়ী। বিদ্যমান কপিরাইট আইনগুলোর সবথেকে বড় সমস্যা হলো এর দর্শনে। কপিরাইটের মুখ্য উদ্দেশ্য হওয়া উচিত দুটি – ১. সর্বোচ্চ সংখ্যক শিল্পীকে তাদের বিচিত্র সব শিল্পমাধ্যম নিয়ে কাজ করে যাওয়ার জন্য আগ্রহী করা এবং ২. সর্বোচ্চ সংখ্যক শ্রোতা বা দর্শকের কাছে তা উপস্থাপনের সম্ভাবনা সৃষ্টি করা। অবশ্যই, তা শিল্পকে পেশা হিসেবে গ্রহণ করার অন্তরায় হবে না, তবে তা শুধুমাত্র টাকার আয়ের কথা চিন্তা করেই প্রণীত হবে না। অর্থ্যাৎ, অর্থোপার্জন এর মূল লক্ষ্য হবে না, বরং, সর্বোচ্চ সংখ্যক মানুষের কাছে পৌঁছানোর সম্ভাবনা সৃষ্টি করাই হবে এর মূল লক্ষ্য। শুধুমাত্র অর্থনৈতিক লক্ষ্য অর্জনই যদি কপিরাইট আইনের মূল দর্শন হয়ে তাহলে কেমন হবে সে ব্যাপারে করি ডকট্রো আরও একটি চমৎকার উদাহরণ দিয়েছেন –

ধরুন, এমন এক কপিরাইট আইন তৈরি করা হল যেখানে, সিনেমা তৈরি করা যাবে বছরে একটি এবং তা ১৫ মিনিটের বেশী দৈর্ঘ্যের হবে না। এতে তাহলে সিনেমার “দুষ্প্রাপ্যতা” দেখা দিবে। ফলে, তা দেখার জন্য দর্শকের সংখ্যাও বেড়ে যাবে। এতে অর্থোপার্জন হবে বহুগুণ।

বর্তমান কপিরাইট আইনগুলোর লক্ষ্যও যেন উদাহরণের মত। অর্থোপার্জনকে সুরক্ষিত করতেই এর মূল দর্শন কাজ করে। আরও একটা সমস্যা বর্তমান কপিরাইট নীতিমালার ক্ষেত্রে স্পষ্ট; সেটা হল শিল্পী ও শ্রোতার/দর্শকের মাঝে সরাসরি যোগাযোগের বাজার তৈরি না করার নীতি। এতে যেমন শিল্পী আর্থিক ও মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ হন, তেমনি শ্রোতারাও ক্ষতিগ্রস্থ হন আর্থিক ও মানসিকভাবে। ফলে, শিল্পী ও শ্রোতা পরস্পর থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন। এতে, তৈরি হতে থাকে জনবিচ্ছিন্ন ভাবসর্বস্ব সংগীত। শিল্পী ও শ্রোতা মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রন্থ হন বলার কারণ হল, সৃষ্টিকর্ম প্রথমত বাক-স্বাধীনতা ও আত্মপ্রকাশের স্বাধীনতার ব্যাপার। এখানে শিল্পী ও শ্রোতার সংযোগ সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ। এটা না হলে শিল্পী যেমন স্বাধীনতার সুখ পান না, তেমনি শ্রোতাও শিল্পের স্বাদ আস্বাদন থেকে বঞ্চিত হন।

বাংলাদেশে এই সমস্যাটির পেছনে মূখ্য কারণ হল, এই দেশের শিল্পীরা এ ব্যাপারে সচেতন নন। মানসিক দিক দিয়ে এঁরা অবক্ষয়ী বীজাণুতে আক্রান্ত, সৃষ্টির ক্ষেত্রে বন্ধ্যা। আরও একটি কারণ হল কেন্দ্রীভূত বাজার ও ক্ষমতাচর্চা। রাজধানীকে ঘিরে যাবতীয় ব্যবসা বাণিজ্য ও শিল্প-সংস্কৃতি ও রাজনৈতিক ক্ষমতাকেন্দ্র গড়ে ওঠায় দেশের অন্যান্য স্থানের মানুষকে ভাগ্যান্বেষণের জন্য সেখানেই ছুটতে হয়। বিকল্প পথে হাঁটা ও বিকেন্দ্রীকরণ ছাড়া এই সমস্যাগুলো থেকে উত্তরণের কোনো পথ নাই। যাদের জন্য কপিরাইটের সুরক্ষা তারা যদি বিদ্যমান কপিরাইটের দর্শনগত সমস্যা বুঝতে না পারেন তাহলে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে মুক্তি মেলার কোনো সম্ভাবনা নাই।

৪.আছে সমাধান

ধরা যাক, স্থপতিগণ তাদের ডিজাইনের কপিরাইট ক্লেইম করতে শুরু করলেন। তাহলে কি হবে? তাহলে দেখা যাবে, আপনার তোলা কোনো ছবিতে কোনো স্থপতির নকশা করা বাড়ি ব্যাকগ্রাউন্ডে চলে এসেছে। ব্যস, ঐ স্থপতি করে বসবেন ক্লেইম! এভাবে চললে ছবি থেকে শুরু করে ভিডিও, চলচ্চিত্র, ডকুমেন্টারি এবং তদসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান যেমন, ইউটিউব, ইন্সটাগ্রাম, ফ্লিকার, ফেসবুক সহ যাবতীয় মাধ্যম ধ্বসে পড়তো। এবং, স্থপতিদেরও সারাদিন ঐ কপিরাইট ক্লেইম নিয়েই পড়ে থাকতে হতো, নতুন নতুন ডিজাইন করা উঠতো মাথায়। কিন্তু, বিদ্যমান কপিরাইট ধারণায় আপনার কি মনে হয় না, স্থপতির ডিজাইনেরও কপিরাইট আছে, তার ‘যথেচ্ছ’ প্রকাশ তার রাইটকে খর্ব করে? নিশ্চয়ই করে। এরকম হলে নিশ্চয়ই চলা যাবে না?

কিন্তু, এমনটা যে বাস্তবে হয় না, তা কিন্তু নয়! Viacom v. Youtube[10] মামলায় এমন ঘটনা দেখা গেছে। মামলাটির সংক্ষিপ্ত কাহিনী এরকম – ভায়াকম ইন্টারন্যাশনাল ইনকরপোরেশন ইউটিউবের বিরুদ্ধে কপিরাইট ভঙ্গের অভিযোগ আনে। তারা দাবী করে যে, ইউটিউব তাদের সাইটে ভায়াকমের মালিকানার ৭৯,০০০টি ভিডিও সংরক্ষণ ও প্রদর্শন করতে দিয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে কপিরাইটের ভঙ্গ করেছে।

মামলায় ভায়াকম হেরে যায়। কোর্ট রায় দেন, কোনো নির্দিষ্ট আইটেমের কপিরাইট ভঙ্গ ঠেকানোর জন্য সার্ভিস প্রোভাইডারের সচেতন থাকা আবশ্যক নয়।

সম্প্রতি আমরা, অর্থ্যাৎ, স্বরব্যাঞ্জো একটা সমস্যায় পড়েছি। ২০১৫ সালের ২৬ ডিসেম্বর স্বরব্যাঞ্জো হবিগঞ্জ আন্দোলনের সাথে একাত্বতা প্রকাশের জন্য সলিল চৌধুরীর একটি গান “হেই সামালো” কভার করে ইউটিউবে আপলোড করে। গানটি যে সলিল চৌধুরীর সেকথাও ডেসক্রিপশনে উল্লেখ করা হয়। বলাই বাহুল্য, গানটি থেকে স্বরব্যাঞ্জো কোনো অর্থ উপার্জন করে নাই।

এমতাবস্থায়, গানটির মূল সত্ত্বাধিকারী প্রতিষ্ঠান গ্রামোফোন কোম্পানি অফ ইন্ডিয়া বা ‘সারেগামা’ গানটির ‘কপিরাইট ক্লেইম’ করে এবং গানটিতে বিজ্ঞাপণ বসাতে চেয়ে ইউটিউবে রিপোর্ট করে। এক্ষেত্রে কিন্তু বিদ্যমান আইনে আমরা কোনো ছাড় হয়তো পাব না।

কিন্তু, তবুও কথা থাকে। কর্পোরেশনেরও রেসপন্সিবিলিটি থাকে। কর্পোরেশন আলাদা লিগ্যাল পার্সন। তাদের যেমন ক্লেম করার রাইট আছে, তেমনি ক্লেম না করারও সুযোগ আছে। পাবলিক ইস্যু কর্পোরেট ক্লেইমের চেয়েও বড় ব্যাপার। যে প্রতিষ্ঠান এটা বোঝে না, শুধু ব্যবসাটাই বোঝে সে প্রতিষ্ঠান আইনের দৃষ্টিতে যদি পার পেয়েও যায়, মানুষের দৃষ্টিতে যায় না। সারেগামা যখন খুঁজে পেয়েছেই তখন তাদের উচিত ছিল কারা, কোন উদ্দেশ্যে এটাকে এভাবে প্রচার করেছে সেটা জানা ও বোঝার চেষ্টা করা। হ্যাঁ, সারেগামা পুরাতন এবং বিশাল প্রতিষ্ঠান হতে পারে কিন্তু তারা ন্যারো সেন্সে বিষয়টা দেখেছে।

কেমন বিব্রতকর লাগবে বলুন তো, ধরুন, আমরা স্টেজে গানটা করছি, এমন সময় গানের মালিক এসে বললো, তোমরা থামো, তোমরা যে লোকজন জড়ো করেছ সেই ফায়দায় আমি এখন মলমের বিজ্ঞাপণ করব! এখানে লিগ্যালি সে এটা পারে, কিন্তু, এথিক্যালি এটা কি ভাল কিছু?

ফিলোসফিক্যাল পয়েন্টে যদি ঢুকি, সলিল চৌধুরীর গানটির সত্ত্ব সারেগামা কিনে নিতে পারে, সলিল এ থেকে লাভবান হতেই পারেন,তাতে দোষ নেই। ঠিক আছে। তাই বলে কি লাগসই সিচুয়েশনে লাগসই গানটা আমরা এইসব জটিলতার কারণে করতেই পারব না? মানে সিচুয়েশন ডিমান্ড করলেও শুধুমাত্র অন্যের কাছে বেচেছি, তাই গান করা নিষেধ! তাহলে, আলোচ্য গানটার কথার যে সারবস্তু সেটাকেই তো অপমান করা হল! সলিল চৌধুরী তাহলে, সাদা হাতির কালা মাহুত শুধুমাত্র বেচাবিক্রির জন্য বানিয়েছিলেন বলতে হয়। কিন্তু আসলে কি তাই? গানের কি নিজস্ব স্পিরিট নাই? তাও আবার লোক-সুরের একটা গান! যে সুরের নাকি কোনো ব্যক্তিমালিকানা নাই। যুগে যুগে যে সুর, যে কথা আমরা লিখেছি, সেটা বেচবে একটা প্রতিষ্ঠান! আমার রক্তে বোনা ধানের দুঃখের সত্ত্বাধিকারী তাহলে সারেগামা? এটা ভাবাটা শোচনীয়।
তাই, আমরা এই আইনটাকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছি। ব্যক্তিগত জীবনে আইনের একজন ছাত্র হিসেবে, আমি জানি, এই আইন কালা আইন, এটা মানুষের পারপাস সার্ভ করছে না। তবুও, আইনের বিচারে হয়তো আমরা হেরে যাব, কারণ, এই আইনের চরিত্রই শুধুমাত্র অর্থকেন্দ্রিক।

কিন্তু বিকল্প ব্যবস্থা কি নাই? অবশ্যই আছে। সে ব্যবস্থার নাম ক্রিয়েটিভ কমন্স লাইসেন্স।[11] ক্রিয়েটিভ কমন্স কেমন ধারার বন্দোবস্ত তা তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে পড়লেই জানা যাবে। সেই নিয়ে বিস্তারিত বলা আমাদের উদ্দেশ্য নয়। আমাদের উদ্দেশ্য শুধুমাত্র বিকল্প পথের দিশা দেওয়া, এটুকু জানানো যে, বিকল্প ব্যবস্থাও আছে। এই ক্রিয়েটিভ কমন্সের ভেতরেই একটি ব্যবস্থা আছে যার নাম ব্লাঙ্কেট লাইসেন্স (Blanket License). আমেরিকান সোসাইটি অফ কম্পোজারস, অথরস এন্ড পাবলিশার্স (ASCAP)[12] নামে একটি সংগঠন আছে যা কিনা আমেরিকান গাতক, বাদক, লেখক, প্রকাশনকদের একটি ঐক্যবদ্ধ সংগঠন যাদের বর্তমান সদস্যসংখ্যা প্রায় ৫৭৫,০০০ জন। এদের সবাই সৃজনশীল মানুষ। এই সংগঠন একটি লাইসেন্স প্রণয়ন করে যার ভিত্তিতে কোনো প্রতিষ্ঠান যতখুশী এই সংগঠনের সদস্যদের গান বাজাতে পারবে কিন্তু বিনিময়ে সংগঠনকে একটি বাৎসরিক চাঁদা দিতে হবে। এই চাঁদা শিল্পীদের মাঝে বন্টন করা হয় বিভিন্ন হিসাবে। বাংলাদেশেও এমন একটা বন্দোবস্ত করাই যায়। এটা বাংলাদেশের জন্যও একটি চমৎকার ব্যবস্থা হতে পারে। সেক্ষেত্রে শিল্পীর পেটের দায়ও মিটবে, শ্রোতার মনের খোরাক ও ব্যবহারের স্বাধীনতাও নিশ্চিত হবে।

এতো গেল এক ব্যবস্থা। আবার, সম্পূর্ণ উন্মুক্ত ব্যবস্থা যদি গড়তে চান সেক্ষেত্রেও রাস্তা আছে। রাস্তাটা বেশ জটিল ও সময়সাপেক্ষ, তবে আমাদের কাছে অসম্ভব মনে হয় না।

যে গান গণমানুষের হয়ে কথা বলতে চায় বা যে দল গণমানুষের হয়ে কণ্ঠ তুলতে চায় তার সবচেয়ে বড় প্রতিপক্ষ হচ্ছে মাস মিডিয়া বা মেইনস্ট্রিম মিডিয়া। এই প্রতিপক্ষ অত্যন্ত সক্রিয়, তার শক্তি ও ক্ষমতা অপরিসীম। তাই গণসংগীতকে এই প্রচার-মাধ্যমের বিরুদ্ধে মোকাবেলা করতে হবে সৃষ্টির ভিতর দিয়ে। তাই, সংগীতসাধক ও গবেষকদের ‘ছোটলোকদের’ মধ্যে নেমে এসে তাঁদের ভাঙাঘরের দাওয়ায় বসে, তাঁদের শিল্পীদের জীবন ও সুরসৃষ্টির প্রকৃতি ও পদ্ধতিটা জানতে হবে।[13] জানতে হবে তাঁদের সংগ্রামের ইতিহাস, এককথায় গান যাপন করতে হবে। তাহলে জানা যাবে তান্ত্রিক লোকশিল্পীর রাজনৈতিক সংগ্রামে কি ভূমিকা ছিল এদেশে। জানা যাবে মঘাই ওজা’র ঢোলের প্রতিবাদ কিংবা নিবারণ পণ্ডিতদের সংগ্রামময় জীবন। সেইসাথে জানা যাবে গানে-প্রাণে মিলেমিশে একাকার হওয়ার অবিকল্প উপায়।

বিদ্যমান বাজার ব্যবস্থায় আমরা এতদিন দেখে এসেছি প্রোডাক্ট যারা তৈরি করে, কাস্টমার ধরার দায়িত্ব তাদেরই। কিন্তু আমরা যারা কপিলেফট কন্টেন্ট তৈরি করার চেষ্টা করছি, মনে করি আমাদের কন্টেন্টগুলো কোনো প্রোডাক্ট নয়, তাই আমাদের তৈরি করা কর্ম প্রচারের দায়িত্ব একতরফাভাবে আমাদের নয়; বরং,পারস্পারিক।

উৎপাদক-ভোক্তা সম্পর্কে সাধারণত ভোক্তার কোনো দায় থাকেনা। পণ্যের প্রচারের দায়িত্ব থাকে উৎপাদকের। কিন্তু, আমরা যেহেতু আমাদের কর্মকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন করি না, তাই আমাদের সঙ্গে সম্পর্কে শ্রোতারও দায় থাকতে হবে। যদি না থাকে তাহলে প্রকৃত ‘ফ্রি মিডিয়া’ তৈরি করা সম্ভব হবেনা। কিভাবে, বুঝিয়ে বলছি।

আমরা যে গান তৈরি করছি সেগুলো নিরুপায় হয়ে ফেসবুক, ইউটিউবে ছাড়ছি। এই সোশাল নেটওয়ার্কগুলোকে দেখতে মনে হয় যেন ফ্রি মিডিয়া, আসলে তো তা নয়। কারণ,এতে কোটি কোটি ডলারের ব্যবসা আছে। সুতরাং, এই মাধ্যম পুরোপুরি গ্রহণযোগ্য নয় গণসংগীত শিল্পীদের কাছে।

বিকল্প উপায় হল, কাছে আসা। মানে হাতে হাতে পৌঁছানো একটা উপায় হতে পারে। সামনাসামনি শোনা আরেকটি উপায়। তবে, সেজন্য শ্রোতাদেরও দায় আছে। শোতাদেরকেও আমাদের কাছে এসে নিতে হবে, শেয়ার করতে হবে। আর, আরেকটি বিকল্প হল একেবারেই নিজেদের সত্যিকার ‘ফ্রি সোশ্যাল নেটওয়ার্ক’ তৈরি করে ফেলা যেতে পারে। অথবা, আমাদেরকে এই কমার্শিয়াল ইন্টারনেটকেই ত্যাগ করে ‘পিপলস নেটওয়ার্ক’ তৈরি করতে হতে পারে। সেজন্য অবশ্যই ক্রেতা-বিক্রেরা বা উৎপাদক-ভোক্তা সম্পর্ক মেনে নিয়ে হাত গুটিয়ে বসে থাকা চলবেনা। আমাদের সবাইকেই এগিয়ে আসতে হবে, একেবারেই নিজ গরজে, নিজ নিজ সামর্থ্য নিয়ে।

বৈদিক ঘোর অন্ধকারেও তন্ত্রমনা শিল্পীরা আন্তঃযোগাযোগের মাধ্যমে ঐক্যবদ্ধ হতে পারেন। তাতেই এই মেঘ কেটে যাবার জোরালো সম্ভাবনা আছে।

রেফারেন্স:
[1] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ৪
[2] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ৪
[3] খান, কলিম, মৌলবিবাদ থেকে নিখিলের দর্শন
[4] চট্টোপাধ্যায়, দেবীপ্রসাদ, লোকায়ত দর্শন, পৃষ্ঠা: ৬৯
[5] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ১৪১
[6] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ১৪১
[7] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ৭
[8] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ৭
[9] Doctorow, Cory, What do we want copyright to do?
[10] Viacom International, Inc. v. YouTube, Inc. No. 07 Civ. 2103, 2010 WL 2532404 (S.D.N.Y 2010)
[11] Creative Commons
[12] American Society of Composers, Authors and Publishers[13] বিশ্বাস, হেমাঙ্গ, গানের বাহিরানা, পৃষ্ঠা: ১৩০

Leave a Reply