একটি মুক্ত
পাঠচক্র আন্দোলন

সাহিত্য

বিষমিষ্টি

সাম্প্রতিক সময়ে কাকাড্ডা পাঠচক্রের জন্য একটি ছোট কাগজ বের করেছি। নাম বিষমিষ্টি।
দীপ্র, ক্লাস নাইনে পড়ুয়া ছেলে, এই ছোট কাগজের সম্পাদক। দীপ্রসহ তার বয়সী এক হাজার ছেলেকে যদি প্রশ্ন করা যায়, 'বড় হয়ে কি হতে চাও?' আমার মনে হয় দীপ্র’র উত্তরটি বাকি নয়শ' নিরান্নব্বই ছেলেটির থেকে সবচেয়ে ভিন্নতর হবে। পাঠচক্রের প্রথম দিনে সে বলেছিলো, সে লেখক হতে চায়। আজ কালের দিনে এমন নিপাট সত্যাকাঙ্খা কেউ আদৌ করে কি? নিজের ক্ষেত্রে দেখেছি , কেউ যদি জিজ্ঞেস করে কি হতে চাও তবে বেশ বিব্রতই হই। আসলে যা হতে চাই, তাকে সমাজ কিছু হওয়া বলে না। এই যে দীপ্র বললো, সে লেখক হতে চায়, আপনারমনে নিশ্চয়ই একটা পালটা প্রশ্ন ঘুরঘুর করছে যে, 'লেখক ছাড়া আর কি হতে চাও?' একদম খাঁটি প্রশ্নটা হলো- পেট চালানোর দায়ে সে কি হতে চায়!
এই পেট চালানোর দায় আমাদের পনেরো-ষোলো বছর বয়সীদের স্বপ্নটাকে গোঁড়াতেই ছেটে দেয়।
যখন পাখির ডানায় ভেসে বেড়াবার সময়, বল নিয়ে দাপাদাপির সময় তখন ছেলে-মেয়েগুলো
জীবনের কঠিন কঠিন সব প্যাঁচ কষতে থাকে, ত্রিশোর্ধ্ব একজন বেকার যুবকের ভাবনাগুলো ভেবে
নেয়া শিখতে হচ্ছে এই ধাপে এসেই। একেকটা পরীক্ষা সে ভাবনাকে আরো আরো জটিল করে দেয়। পিএসসি, জেএসসি এই দুটো পরীক্ষা যারা দেয়, তারা একেবারেই অল্প বয়সী। তাদের সামনে কি কঠিন সমীকরণ, একটা বিষয়ে আশির নিচে পাওয়া মানে হাজার হাজার জনের পিছনে পড়া। যারা কিনা সারাটা জীবন ভালো রেজাল্ট করে আসে, তারাও যদি কোনো একটা পাবলিক পরীক্ষায় কোনো কারণে, কোনো একটা কারণে এ প্লাস না পায়, তার দিকেও ছুটে আসে হাজারটা প্রশ্ন, সন্দেহ, নিন্দা। এদের কেউ কেউ কোনো একটা পরীক্ষায় ব্যর্থ হয়ে সারা জীবনের মতো শেষ হয়ে যায়। সচেতনরা যেটাকে বলেন, বখে যাওয়া। এই বখে যাওয়ারা নিজেদের হালের জন্য সব সময় দায়ী করে নিজেকেই। যেটা তাকে আরো অন্ধকারে ঠেলে দেয়। অপসংস্কৃতি, অপচর্চার সমাজকে আমরা কখনোই দায়ী করি না। আমরা যে স্বপ্ন দেখতে পারি না, সেটা নিয়ে ভাবার কেউ নেই। পনেরো থেকে সতেরো বছর বয়সীদের আমরা অনেক দ্বায়িত্ব দিয়ে ফেলেছি। অনেকে বলবেন, এটা
তো ভবিষ্যতের প্রস্তুতি। চরম প্রতিযোগীতামূলক পৃথিবীর সাথে মানিয়ে নিতে হলে এটুকু যে করতেই হবে। যারা এমনটা ভাবেন, তাদের জন্য একটা সুন্দর তথ্য আমার এই লেখনীর শেষে জুড়ে দিবো।
আমি ভাবছিলাম এই যে আমাদের সমাজ, হাইস্কুল পড়–য়া শিক্ষার্থীদেরকে যে এই রকম 'ম্যাচিউর'
করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে, সে 'ম্যাচিউরটি'টা আসলে কেমন? এজন্যই কাকাড্ডার এই ম্যাগাজিনটির জন্য আমরা যখন লেখা সংগ্রহ করতে গিয়েছিলাম তখন লেখার কোনো বাঁধাধরা ক্যাটাগরি রাখিনি। বলেছিলাম ইচ্ছে মতো লেখা দিতে। পেছনের কারণটা হলো, আমরা দেখতে চেয়েছিলাম পনেরো থেকে সতেরো বছর বয়সী ছেলে-মেয়েরা আসলে ভাবছেটা কি!
'ম্যাচিউরিটি' কিন্তু সত্যিই এসেছে। যারা লেখা দিয়েছে তাদের লেখাগুলো যদি অভিভাবকদের
দেখানোর সুযোগ হতো তবেই তারা বুঝতে পারতেন যে, এই 'ম্যাচিউর' করে দেয়ার প্রক্রিয়াটা
আসলে কতোটুকু যৌক্তিক! যে ছেলেটা জেএসসি পরীক্ষা দিয়ে ত্রিশ বছর বয়সী বেকার যুবকের ভাবনাটা ভেবে ফেলেছে, স্বপ্ন ভঙ্গের স্বাদ পেয়ে গেছে, সে যে ত্রিশ বছর বয়সী যুবকের আবেগের স্বাদ নিতে চাইবে না সে গ্যারান্টিকে দিতে পারে?
দ্বায়িত্ব নেয়ার জন্য কাঁধটাকে চওড়া হতে দিন, দূর্বল কাঁধে হাজারো প্রত্যাশার বোঝা চাপিয়ে দিলে
কেবল কাঁধটাই ক্ষতিগ্রস্থ হবে। মন, শরীর আর দ্বায়িত্ববোধ সবগুলো একসাথে বাড়তে দিতে হবে।
জীবনের সব জটিলতা কেনো অতো ছোটো বয়সেই জেনে যেতে হবে?
অনেক ছেলে-মেয়ের লেখাতেই বন্ধুত্ব আর প্রেম উঠে এসেছে। এ সময়ে একটু আধটু প্রেমের জোয়ার আসাটা স্বাভাবিকই। কিন্তু লেখাগুলোতে একরকম ক্রাইসিস আছে। একদম মধ্যবয়সীদের জীবনের ক্রাইসিস। এধরণের ক্রাইসিস কিশোরপ্রেমের গল্পে আমি কখনো পড়িনি। সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাপার, গল্পের খাতিরেই হোক আর ভাবনার সীমাবদ্ধতাই হোক, ক্রাইসিসের জন্ম টিনএজ লেখক দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু তার টিনএজ মন এই ক্রাইসিস থেকে উত্তরণের রাস্তা খুঁজে পায়নি। আমি চাইলে এই লেখায় কিছু ওই ধরণের কিছু লেখার খন্ডক অংশ জুড়ে দিতে পারতাম, দিচ্ছি না এই ভেবে যে, কাকাড্ডায় লেখা পাঠিয়েছে কেবল কিশোরগঞ্জের শিক্ষার্থীরা, যারা সবাই অন্তত মুখচেনা। আমি কারো লেখা নিয়ে এতো কাঁটাছেড়া করছি, এটা সে লেখকের পছন্দ নাও হতে পারে!
একটা তথ্য পাওনা রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রথম পাবলিক পরীক্ষাটি হলো-ও লেভেল। আর আমেরিকাতে বিভিন্ন রাজ্যের শিক্ষা সংস্থা নাইনথ থেকে টুয়েলভ গ্রেডে পাবলিক পরীক্ষা নেয়। আর আমাদের দেশে? প্রাথমিকেই পিএসসি! তাও যদি পরীক্ষা হতো কোনো উৎসবের নাম! পরীক্ষা আমাদের দেশের শিক্ষার্থীদের কাছে বিভীষিকা। পিএসসি থেকে এইচএসসি, আট বছরে চার-চারটি বোর্ড পরীক্ষা। এর মধ্যে কোনো একটির একটি বিষয়ে এ প্লাস না পেলেই আমাদের স্বপ্ন ভেঙ্গে যায়। পদার্থ বিজ্ঞানে ক্লাসে সেরা ছাত্রটি বাংলায় এ প্লাস না পেয়ে ভর্তি হতে পারে না স্বপ্নের প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে!
আমরা কাকাড্ডা পাঠচক্র, এই স্বপ্নহীনতার যুগে শুধুমাত্র একটু স্বপ্ন দেখতে চাই। আর হতে চাই,
স্বপ্নের মতো। স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতাটুকুই আমাদের দাবী-দাওয়া । যে চোর, সে স্বপ্নে কখনো চোর হতে চায় না। যে দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোর, সে স্বপ্নে কখনো দুর্নীতিবাজ-ঘুষখোর হতে চায় না। আদতে, কোনো অপরাধীই, স্বপ্নে কোনদিন অপরাধী হতে চায় না। আমাদের স্বপ্ন দেখতে দিন, স্বপ্নের মতো হওয়ার একটা সুযোগ দিন। লুটপাট-দুর্নীতি-ঘুষ সহ সামাজিক সমস্যা যে কখন জাদুর মতো 'ভ্যানিশ' হয়ে যাবে, টেরও পাবেন না। স্বপ্ন দেখার, স্বপ্নকে লালন করার একটিমাত্র সুযোগ গোটা সমাজ ব্যবস্থাকে করতে পারে অপরাধ মুক্ত। আমাদের কাকাড্ডা পাঠচক্রের লক্ষ্য আর উদ্দেশ্য বলতে গেলে এটাই। স্বপ্নকে জিইয়ে রাখা। শুধুমাত্র কাকাড্ডা নয়, স্বপ্ন দেখানোর দ্বায়িত্বটা সবাইকেই নিতে হবে।

কাকাড্ডার ডাকবাক্স

কাকাড্ডা ডট কমে সাবস্ক্রাইব করলে মেইলের মাধ্যমে আমাদের সব আপডেট পাবেন

kakadda logo

ঠিকানা:
আলোরমেলা, কিশোরগঞ্জ- ২৩০০।
সেন্ট্রাল রোড, ধানমন্ডি, ঢাকা - ১২০৯।

ইমেইল:
info@kakadda.com
k
akadda.info@gmail.com

ফোন:
+8801859 304232
+8801971 104077

স্যোশাল লিঙ্কস