একটি মুক্ত
পাঠচক্র আন্দোলন

খবর

প্রকাশনা উৎসবের রঙে আর প্রাণের মেলার উচ্ছ্বাসে

গত ২ রা জানুয়ারি অনুষ্ঠিত হয়ে গেল কাকাড্ডার মুখপত্র 'বিষমিষ্টির' প্রকাশনা উৎসব। এটিই ছিল কাকাড্ডার উদ্যোগে প্রথম কোনো উৎসব। সেজন্য সবার মধ্যে উত্তেজনাটা যেন অন্য সবকিছুর চাইতে একটু বেশিই ছিল! তাইতো মঞ্চসজ্জা থেকে শুরু করে নাচ, গানের মহড়ায় ছিল প্রত্যেকের সক্রিয় অংশগ্রহণ। সেদিনের বিকেলের মত সুন্দর একটি বিকেল আমাদের সবারই স্বপ্নে আঁকা হয়েছিল!

হয়তো তুলির আঁচরে, হয়তোবা নতুন কাগজের গন্ধেভরা বিষমিষ্টির অক্ষর গুলো দিয়ে! আর সেই সফল অনুষ্ঠানটির পর যে তৃপ্তি আমাদের মনে এসেছিল, কোনো অংশেই তা রূপকথার রাজ্য জয় করে ফেলার চেয়ে কম ছিল না !
উৎসবের প্রস্তুতি, খুনসুটি এবং অন্যান্য : আমাদের কাকাড্ডার প্রথম উৎসব-তাই প্রস্তুতি টাও যে একটু দীর্ঘই হবে -তা বলার অপেক্ষা রাখেনা ! উৎসবের এক সপ্তাহ আগে থেকেই আমাদের প্রত্যেকের কাছে সকাল ১১ টা মানেই ছিল বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল প্রাঙ্গন। উত্তেজনা এতটাই বেশি ছিল যে, শীতের সকালে আড়মোড়া ভেঙ্গে কোনমত নাস্তা খেয়ে সোজা চলে যেতাম মাঠে, আর শুরু হত রিহার্সাল। রিহার্সালটা শুরু হত রাইসা আপু আর শৈলীর নেতৃত্বে আমাদের দলীয় সংগীতের মাধ্যমে।

অন্যদিকে চলত কাপড়ের ওপর ইচ্ছেখুশি মতোন রঙের ছড়াছড়িতে ব্যানার তৈরির কাজ! বিশাল সেই ব্যানারের একদিকে চলত নিঝু -অর্নবের স্কেচ, আর অন্যদিকে চলত জাহিন ভাইয়ার তুলির আঁচড়। আর সেসবের সাথে পাল্লা দিয়ে চলতো সৃজন, দীপ্র, আকাশ, রিফাতদের মঞ্চসজ্জারর জন্য কেনাকাটা। কাজের ফাঁকে ফাঁকে হঠাৎই ছেলেরা মেতে উঠত ফুটবল খেলা নিয়ে। তাদের ঝোঁক উঠলে থামায় সাধ্যি কার?
আর তাই আমরাও ব্যস্ত হয়ে উঠতাম তাদের বল কেড়ে নেয়ার ষড়যন্ত্রে ! সাথে সঙ্গী হিসেবে ছিল ফারহানের নিয়ে আসা আমাদের সবার প্রিয় দু'টো খরগোশ - 'গুলটুশ' আর 'ফুলটুশী'।

আর গল্প, খোঁচাখুঁচি তো বিরামহীন চলতেই থাকতো! তার ওপর লিরাদের বাসায় চলতো নাচের প্রস্তুতি। ঘন্টার পর ঘন্টা প্র্যাক্টিস,মুদ্রা পাল্টানো,মনমত না হলো তো আবার পাল্টাও,আবারো পাল্টাও! সেখানেও ঘুঙুর নিয়ে কত লাফালাফি আর কথার ফুলঝুরি! মাঠে প্র্যাক্টিস হয়েছে শেষের ক'দিন। নাচটা নিয়ে জাহীন ভাইয়ার সেই জনপ্রিয় ডায়ালগের কথা তো বলতেই হয় - "মাঠ ভাঙিস না যেন!"

সবকিছুর পাশেই ডিসেম্বরের শীতের নরম রোদের আবেশে প্রতিদিন নিয়ম করে রেইনট্রিতলাটায় চলতো মঞ্চ সাজানোর জন্য পাটশোলা বাঁধার কাজ,যার 'মূল হোতা' ছিল আয়াতুল্লাহ ভাই। বিকেলের দিকে যখন সবাই কাজ করে ক্লান্ত,তখন সিঙারা এনে সবাইকে খাওয়ানোর গুরুদায়িত্ব পালন করত শান্ত আর আকাশ।
এভাবেই হাসি-ঠাট্টা আর খুনসুটিতে চলতো আমাদের রোজকার মহড়া ! 


প্রকাশনা উৎসবের আদ্যোপান্ত : ২ রা জানুয়ারি, বিকাল ৩ টা। প্রস্তুত বিয়াম স্কুল রেইনট্রিতলা,প্রস্তুত আমরা - লাল সবুজ পাঞ্জাবী আর শাড়িপরা কিশোর কিশোরীদল ! এরই মধ্যে আমন্ত্রিত অতিথিরা আসতে শুরু করেছিলেন। আর তাঁদের অভ্যর্থনার দায়িত্বে ছিল ফারিহা (মানে আমাদের দুই লেখিকার একজন) আর নাবিলা।

জাতীয় সংগীতের মাধ্যমে বিকাল ৩:৩০ টায় শুরু হলো আমাদের উৎসব, সবাই প্রাণের সবটা দিয়ে পতাকার দিকে মুখ করে গেয়ে উঠলো, "আমার সোনার বাংলা আমি তোমায় ভালোবাসি!"
সম্ভবত অনুষ্ঠানের সুন্দর মুহূর্তগুলোর মাঝে সবচেয়ে আবেগপূর্ণ ছিল সেই জাতীয় সংগীত গাওয়ার সময়টা, সব অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রেই এমনটা সত্য!

রেইনট্রিতলার সেই মঞ্চে অনুষ্ঠানের উপস্থাপনায় ছিল শৈলী এবং আদৃতা। উৎসবের শুরুতেই শুভেচ্ছা বক্তব্য রেখেছিল রাইসা আপু।
এরপর বিকেলের পড়ন্ত রোদে রাইসা আপুর নেতৃত্বে ছিল দলীয় সংগীত -'মুক্তির মন্দির সোপান তলে '।

শহীদদের স্মরণে সেই আবেগঘন গানটির পর ছিল একটি আবৃত্তি, যেটি পরিবেশিত হয় ফারিন এর কন্ঠে।

তারপরই কাকাড্ডার পরিচিতিমূলক বক্তব্য রেখেছিল কাকাড্ডার সংগঠক জাহিন ভাইয়া।

গান,কবিতা চলছিল, সেইসাথে তাল মিলিয়ে বিকেলের সূর্যটা আরো পশ্চিমে হেলে পড়ছিল আর চারপাশ ভরে উঠছিল বিকেলের নরম মোহনীয় আলোয়।

সেই জাদুময়ী আলোতে আমরা মঞ্চটা ছেড়ে দিই রুদ্র ভাইয়ার গিটারের শব্দে সেরকমই কিছু গান শোনার জন্য ! রুদ্র ভাইয়া গেয়ে শোনান 'কফি হাউজের সেই আড্ডাটা আজ আর নেই ','ভালো আছি ভালো থেকো','তোমার জন্য নীলচে তারার একটুখানি আলো' সহ অসাধারণ সব গান।
গানে গানে গুনগুনিয়ে উঠেছিল বৃষ্টিবৃক্ষের তলায় সমবেত প্রতিটি মানুষ! সেই রেশ কাটতে না কাটতেই নাবিলা, ফারিহা আর লিরার ঝর্ণার মত চঞ্চল সেই নাচ -'মোরা ঝঞ্জার মত উদ্দাম'।

নেমে আসছিল সন্ধ্যা।
সৃজন,সাইমুম, স্নিগ্ধ ভাইয়ারা মিলে তখন প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের কাজ করল, জ্বললো ধূপ , আজানের বিরতির ঠিক পরপরই। প্রদীপের আলো আর ধূপের অনন্য মিশেলে মনে হলো যেন বৃষ্টি বৃক্ষের তলায় স্বর্গীয় পরিবেশ নেমে এসেছে।

ঠিক হালকা এই বিরতির পরেই মিশমিশে সন্ধ্যায় আনন্দের আগুন জ্বেলে আমরা শুরু করলাম ফানুস ওড়ানোর তোড়জোড়! এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে বেশি আগ্রহের বিষয়, আমাদের অনেকের কাছেই প্রথম ফানুস ওড়াবার অভিজ্ঞতা! সন্ধ্যার আকাশে লালচে ফানুসগুলো সত্যিই এক অন্যরকম অনুভূতির সৃষ্টি করছিল।

এতক্ষণের এত আনুষ্ঠানিকতার পর এলো আমাদের এতদিনের সেই আকাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। আমাদের প্রকাশনা বিষমিষ্টির প্রথম সংখ্যাটির মোড়ক উন্মোচন! মঞ্চে আমন্ত্রণ জানানো হলো কাকাড্ডার সব সদস্যদের।

মোড়ক উন্মোচনের পরের অনুভূতিটা যেন একটা বিশাল প্রাপ্তির, ভালোলাগার! দু'মাস ধরে লেখা সংগ্রহ,অনেক বাধা উতরানোর গল্প, সম্পাদনা, পুনরায় সম্পাদনার পর কীবোর্ড এর বিরামহীন টেপাটিপির কষ্টের পর অবশেষে আমাদের বিষমিষ্টির স্বাদ নিতে পেরে উচ্ছ্বসিত ছিলাম সবাই! সব কষ্ট সার্থক হয়ে উঠেছিল!

এর পরপরই সেই উচ্ছ্বাসের জোয়ার নতুন মাত্রা পেল অর্পনদার খঞ্জনির সাথে জুয়েল ভাইয়ের গান 'শহুরে সন্ধ্যায় উড়ে যাওয়া মেঘ' সহ আরো অনেক গানে এবং এর সাথেই গানে গানে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি।

 তারপরই ছিল আমাদের আলাদা করে ফটোসেশনের পালা!উল্লেখ্য যে,নিঝুর পা কাটা থাকায় সে আমাদের মধ্যমণি হয়ে ছিল।
এখানে বিশেষ করে বলতে হয় জাহীন ভাইয়া আর রাইসা আপুর কথা। তারা যেভাবে পুরো অনুষ্ঠানটি কে পরিচালনা করেছে, সেটা না করলে বোধহয় আমাদের অনুষ্ঠানটা এতটা সফল হত না, সাহসী উদ্যোগ নেওয়াটা কঠিন হয়ে পড়তো। তারা দুজন সবসময়ই ছায়ার মতো আগলে রাখে আমাদের এই কাকাড্ডা পরিবারকে,  এভাবেই কঠিন কাজগুলো আমাদের কাছে সহজ করে ধরিয়ে দেয়, তাদেরকেও আমরা রাখি হৃদমাঝারে,ছেড়ে দিতে চাইনা! 

বইমেলা প্রসঙ্গ : আমাদের আরেকটি অন্যতম উদ্যোগ ছিল বইমেলায় আমাদের কাকাড্ডার স্টল।আমাদের সবারই একটা সুপ্ত ইচ্ছে ছিল আমাদের সংগঠন থেকে একটা স্টল হবে। তাই এর প্রস্তাব গৃহীত হবার পর থেকেই আমরা তুমুল উৎসাহে কাজ শুরু করি। স্টল সাজানো থেকে শুরু করে বই সংগ্রহ, সবদিক দিয়েই সবার আগ্রহ ছিল দেখার মতো! তার উপর স্টলের বই সবার সামনে উপস্থাপনের ব্যাপারটি ছিল বেশ মজার।

গত ১৯ থেকে ২৩ ফেব্রুয়ারি আমাদের শিশু একাডেমী প্রাঙ্গনে (বাংলাদেশ শিশূ একাডেমী,কিশোরগঞ্জ) ৭ নম্বর স্টলটি জুড়ে ছিল আমাদের হাসিভরা উপস্থিতি। সেই স্টলের প্রতি সবার আগ্রহ,উৎসাহ আমাদের কাকাড্ডার প্রতিটি সদস্য কে অনুপ্রাণিত করেছে। সবার প্রতিই সেজন্য কৃতজ্ঞতা। আর আমরা অভিভূত এজন্য যে,আমাদের এই ছোট্ট দলের মোটামুটি বড় একটা উদ্যোগ 'বিষমিষ্টি'র প্রতি সবার আগ্রহ ছিল চোখে পরার মতো।

প্রত্যেকেই আমাদের এই প্রকাশনাটির কথা জানবার সাথে সাথে আমাদের উৎসাহিত করে গেছেন,আর সাথে নিয়ে গেছেন একটি করে 'বিষমিষ্টি'! মূলত,বইমেলা দিয়ে আমরা সবার সাহচর্য এবং উৎসাহ পাওয়ার সুযোগ পেয়েছি। সুযোগ পেয়েছি আমাদের কাকাড্ডার প্রতি সকলের মনোভাবটি জানতে পারার। আর তাই বইমেলায় স্টল দিয়ে এসব অনুপ্রেরণার জন্যই আমাদের প্রাপ্তির পাল্লাটা বেশ ভারি!  

পরিশিষ্ট : আমাদের কাকাড্ডা দলের চাওয়া আর কিছু নয়, শুধু স্বপ্ন দেখার স্বাধীনতা -সুতো ছেড়া ঘুড়ির মতো স্বপ্ন ! আর বিষমিষ্টি হলো আমাদের একটা ছোট্ট প্রয়াস। এটি আপনাদের সবার মনে এক টুকরো জায়গা করে নিতে পারলে এবং আমাদের মনের বার্তাগুলো এটার মধ্য দিয়ে সবার কাছে পৌঁছতে পারলে তবেই আমাদের সার্থকতা।

প্রকাশনা উৎসব এবং বইমেলা, দুটোই যেন আমাদের কাকাড্ডার প্রতিটি ছেলেমেয়ের স্বপ্নের আকাশে রঙিন মেঘের মতো ভেসে ওঠে! আমরা এভাবেই এগিয়ে যেতে চাই। আর সেই চলার পথটাতে পাশে পেতে চাই সব্বাইকেই!

লেখক: শিক্ষার্থী, এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

কাকাড্ডার ডাকবাক্স

কাকাড্ডা ডট কমে সাবস্ক্রাইব করলে মেইলের মাধ্যমে আমাদের সব আপডেট পাবেন

kakadda logo

ঠিকানা:
আলোরমেলা, কিশোরগঞ্জ- ২৩০০।
জিগাতলা, ধানমন্ডি, ঢাকা - ১২০৫।

ইমেইল:
info@kakadda.com
k
akadda.info@gmail.com

ফোন:
+8801859 304232
+8801971 104077

স্যোশাল লিঙ্কস