বারমুডা ট্রায়াঙ্গলঃ সমুদ্রের এক অনন্য রহস্যপুরী

তাইমিয়ান তামজিদ

“রহস্য” শব্দটা শোনামাত্র নড়েচড়ে বসাটা যেন মানুষের সহজাত প্রবৃত্তি। আমাদের এই মহাবিশ্বে এমন প্রচুর ঘটনা রয়েছে যা কিনা অসম্ভব রহস্যময়। মহাবিশ্বের রহস্য নিয়ে গবেষণার কমতি নেই বিজ্ঞানীদের মাঝে। তবে কি পৃথিবীর সব রহস্যের ভেদ খোলা শেষ? অবশ্যই না। আমাদের এই পৃথিবীতে যত রহস্যঘন ব্যাপার আছে তার মধ্যে সবচেয়ে রহস্যপূর্ণ হচ্ছে সমুদ্র। হাজার হাজার কিলোমিটার বিস্তৃত হাজার হাজার কিলোমিটার গভীর এই সমুদ্রের মধ্যে কল্পিত হয়েছে অন্য এক জগৎ, আবিষ্কৃত হয়েছে অদ্ভুত কিছু প্রাণী, এখনো অজানায় ঘিরে রয়েছে বিশাল এলাকা। “বারমুডা ট্রায়াঙ্গল” সমুদ্রপৃষ্ঠের উপর অবস্থিত এমনই এক রহস্যময় এলাকা।

“বারমুডা ট্রায়াঙ্গল” সমুদ্রপৃষ্ঠাবস্থিত প্রায় ৫০০,০০০ বর্গ মাইল বিশিষ্ট ত্রিকোণাকার এলাকা যার শীর্ষ তিনটি বারমুডা, মায়ামি এবং পোর্তা রিকোতে অবস্থিত। এটা আটলান্টিক মহাসাগরের একটা অংশ, যার মধ্যে আটলান্টিক মহাসাগরের গভীরতম স্থানটিও অন্তর্ভুক্ত। জায়গাটার এতটা পরিচয় পাবার কারণ হলো, রহস্যজনক ভাবে সেখানে উড়োজাহাজ, জাহাজের হারিয়ে যাওয়া। এই কারণেই হয়তো জায়গাটার আরেক নাম “শয়তানের ত্রিভুজ” (Devil’s Triangle)। আর এই রহস্যের ভেদ খোলার জন্য নিয়ে আসা হয়েছে অনেক তত্ত্ব; যার বেশির ভাগেরই কোনো সুনির্দিষ্ট প্রমাণ নেই। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল সর্বপ্রথম নজর কাড়ে ১৯৪৫ সালে, যখন ৫টা নেভি বম্বার কোনো হদিস ছাড়াই হারিয়ে যায়। পরবর্তীতে উদ্ধার অভিযান চালিয়েও এদের কোনো অবশিষ্টাংশ পাওয়া যায়নি। এরপর এমন আরো কিছু ঘটনার প্রেক্ষিতে ১৯৬৪ সালে “আরগোসি ম্যাগাজিন” একটা আর্টিকেল প্রকাশ করে যার শিরোনাম ছিল “The Deadly Bermuda Triangle” এবং এখান থেকেই এই জায়গাটির এমন নামকরণ হয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে ঘটে যাওয়া উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটনার মধ্যে রয়েছেঃ ১৯৪৮ সালে DC-3 Flight NC-16002 হারিয়ে যাওয়া, যা কিনা মায়ামি থেকে মাত্র ৫০ কি.মি. দূরে থাকতে শেষ রেডিও সিগন্যাল পাঠিয়েছিল; ১৯৬৩ সালে The S.S. Marine Sulpher Queen এর অজ্ঞাত কারণে বিস্ফোরণ, ১৯৬৫ সালে Plane 680 এর কোনো প্রকার SOS সিগন্যাল ছাড়াই হারিয়ে যাওয়া এবং পরে এর ধ্বংসাবশেষ খুঁজে পাওয়া, ১৯২০ সালে The Carrol A. Deering এর একই ভাবে হারিয়ে যাওয়া, যদিও প্রায় এক বছর পর জাহাজটিকে অক্ষত অবস্থায় পাওয়া যায় কিন্তু এর ১১ ক্রু মেম্বারদের কাউকে পাওয়া যায়নি; একই ঘটনা ঘটে The Marie Celeste এর সাথে। এভাবে প্রতি বছর প্রায় ৪টা উড়োজাহাজ এবং ২০টা ইয়ট (বিশেষ প্রকারের বড় নৌকা) নিখোঁজ হয় এই ট্রায়াঙ্গলে।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে ঘটে যাওয়া ঘটনার ব্যাখ্যা দেয়ার জন্য অনেক তত্ত্বই এসেছে। কারো মতে, সেখানে আছে এক ওয়ার্ম হোল, যা ব্যবহার করে ভিনগ্রহী প্রাণিরা পৃথিবীতে এসে তুলে নিয়ে যায় ট্রায়াঙ্গলে পাওয়া মানুষজনদের। আবার, অনেকের বিশ্বাস সভ্যতার চরম শিখরে পৌঁছতে পারা আটলান্টিসদের নগরী এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গলেই ছিল। প্রযুক্তির দিক দিয়ে তারা এতটাই এগিয়ে ছিল যে, ডেথ রে নামক এমন এক রশ্মি তৈরি করেছিল যা নিমেষেই গুড়িয়ে দিতে পারতো গোটা কয়েক শহর। এছাড়াও কথিত আছে, তাদের শক্তির উৎস ছিল এক ধরণের ক্রিস্টাল। এই বিশ্বাস আরো দৃঢ় হয় যখন ১৯৭০ সালে ড. রে ব্রাউন বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে স্কুবা ডাইভিং এর সময় সমুদ্রের তলদেশে একটা পিরামিড খুঁজে পান, যার ভেতরে তিনি বহুভুজাকৃতির লাল ক্রিস্টাল আবিষ্কার করেন। অনেক পাইলট এবং নাবিকদের দাবী বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে তারা চৌম্বক অসামঞ্জস্যতার মুখোমুখি হয়েছেন। সেখানে নাকি চুম্বকের কাঁটা স্থির থাকেনা, ফলে দিক বোঝাটাই মুশকিল হয়ে পড়ে। এভাবেই হয়ত অনেক নৌযান আর উড়োজাহাজ হারানো গিয়েছে বলে অনেকের বিশ্বাস। এছাড়াও বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে সমুদ্রের তলদেশে প্রচুর মিথেন গ্যাস উৎপন্ন হবার খোঁজ পাওয়া গেছে। হয়ত সমুদ্রের তলদেশে হঠাৎ এ গ্যাসের ধাক্কায় সৃষ্টি হত বড় কোনো জলোচ্ছ্বাস যাতে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হত জলযান। সবচেয়ে নতুন যে তত্ত্ব এসেছে তাতে বিজ্ঞানীরা বলছেন যে, বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের উপরে তারা স্যাটেলাইটের দ্বারা ষড়ভুজাকৃতির মেঘ আবিষ্কার করেছেন। সাধারণত মেঘের কোনো নির্দিষ্ট আকার বা আকৃতি থাকেনা। কিন্তু সেখানে পাওয়া কিছু কিছু মেঘের এমন নির্দিষ্ট আকৃতি পাওয়া গেছে যেগুলো কিনা ব্যাসে প্রায় ২০ থেকে ৫৫ মাইল পর্যন্ত চওড়া। আর এ মেঘগুলি সৃষ্টি করতে পারে বড় ধরণের এয়ার ব্লাস্ট (Air Blast)। আর এই এয়ার ব্লাস্ট বড় বড় জাহাজ বা উড়োজাহাজে এমন ভাবে আঘাত হানতে পারে যে, সেগুলোর ধ্বংসাবশেষও শত চেষ্টাতেও খুঁজে পাওয়া যাবেনা।

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল যদিও প্রচন্ড রকমের রহস্যজনক কিন্তু চাইলেই এটাকে খুঁজে বের করা সম্ভব নয়। কারণ কোনো মানচিত্রেই এটাকে আলাদা করে দেখানো হয়নি। কেউ মানচিত্র ধরে এগোতে থাকলে কখনো টেরও পাবেনা কখন সে বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে প্রবেশ করেছে। U.S. মিলিটারি বা কোস্ট গার্ড জায়গাটিকে অন্য সব সামুদ্রিক এলাকার মতই সাধারণ হিসেবে তুলনা করে। অনেকে এটাকে সাধারণ নৌ রুট হিসেবেও ব্যবহার করে এবং অনেকেই এখানে কোনো অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পাননা। তবে তাই বলে মানুষের মাঝে বারমুডা ট্রায়াঙ্গল এতটুকুও আকর্ষণ হারায়নি। আর হ্যাঁ, ট্রায়াঙ্গলটা এক্সপ্লোর করতে ইচ্ছে হলে জানালা দিয়ে বাইরে নজর রাখতে কিন্তু অবশ্যই ভুলবেননা!

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, যন্ত্র প্রকৌশল বিভাগ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply