ভ্রান্তি

১.
বিনীতার ধারণা সে আস্তে আস্তে পাগল হয়ে যাচ্ছে৷ এমন অনেক কিছুই সে দেখতে পাচ্ছে, যার কোন অস্তিত্ব আসলে নেই৷ যেমন বিনীতার সামনে এখন যে ছেলেটি বসে আছে, তার এখানে মোটেও বসে থাকার কথা নয়৷ বিনীতা ঘরের দরজার দিকে আরেকবার তাকিয়ে দেখলো৷ দরজা ভেতর থেকে বন্ধ৷ ঘরে ঢোকার আর কোনো রাস্তা নেই৷ অথচ তার সামনে সম্পূর্ণ অপরিচিত একটা ছেলে চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে৷ মুখে তার বিজয়ের হাসি৷ যেন এইমাত্র সে কোনো বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি ঘটিয়ে বীরদর্পে বিনীতার ঘরে বসে আছে৷ বিনীতা ছেলেটাকে ভালো করে পা থেকে মাথা অব্দি দেখে নিলো৷ অস্বাভাবিক তেমন কিছু চোখে পড়ছে না৷ চুলগুলো বেশ যত্ন করে আঁচড়ানো, চোখে চশমা, সামান্য খোঁচা খোঁচা দাড়ি৷ জামা কাপড়ও বেশ পরিপাটি৷ কোনোকিছুতেই অস্বাভাবিকতার কোনো লক্ষণ নেই৷ কিন্তু গোড়াতেই যে গলদ৷ একমাত্র অস্বাভাবিক ব্যাপার হচ্ছে বাইরে থেকে ঘরে ঢোকার কোনো ব্যবস্থা না থাকা সত্ত্বেও ছেলেটি ঢুকেছে৷ বিনীতা গলার স্বর যথাসম্ভব স্বাভাবিক রেখে ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে বললো, 
  – আপনি এখানে কি করছেন?
ছেলেটি চোখ না সরিয়েই বেশ আত্মবিশ্বাসের সাথে জবাব দিলো,
  – আপনার সঙ্গে গল্প করতে এলাম৷
  – আমি কি আপনাকে চিনি?
  – না চিনলে ক্ষতি কি? চিনে নেবেন৷
  – আমি আপনার সাথে গল্প করতে আগ্রহী নই৷ আপনি এখন যেতে পারেন 
 ছেলেটির মধ্যে কোনোরকমের বিচলিত হওয়ার আভাস পাওয়া গেল না৷ শুধু ঠোঁটটা বাকিয়ে মৃদু একটা হাসি দিলো সে৷ বিনীতা ই  আবার মুখ খুললো৷
  – আপনি ঘরে ঢুকলেন কিভাবে?
ছেলেটা এই প্রশ্নের জবাবের ধারের কাছ দিয়েও গেল না৷ বিনীতা যেন খুব ছেলেমানুষী একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে, এরকম একটা চাহনী নিয়ে সে বললো,
  – আপনি যদি আমার সাথে গল্প করতে না চান, তাহলে জোর করবো না৷ তবে চলে যাওয়ার আগে এক কাপ চা খাওয়াবেন?
মুখে বেশ বিরক্তির একটা ভাব নিয়ে বিনীতা গলার স্বর খানিকটা উঁচু করে ডাকলো,
  – মা, এক কাপ চা দিয়ে যাও তো ৷
তারপর আবার ছেলেটির দিকে ফিরে তাকলো৷ কিন্তু কোনো কথা বললো না৷ ছেলেটির চোখগুলোতে আগের তুলনায় একটু তীক্ষ্ম ভাব দেখা যাচ্ছে৷ মনেহচ্ছে কোনো একটা কিছু সে খুব গভীর উৎসাহ নিয়ে দেখার চেষ্টা করছে৷ বিনীতার কেমন যেন একটু অস্বস্তি লাগলো৷ সে আরেকবার অধৈর্য হয়ে জোরে করে ডাকলো,
  – মা,  তাড়াতাড়ি চা নিয়ে এসো৷ এতো দেরি হচ্ছে কেন?
  – দাড়া দাড়া৷ এতো অধৈর্য হলে চলে? আমি একা মানুষ কতদিকে সামলাবো?
  কথা বলতে বলতে চা হাতে করে বিনীতার মা ঘরে ঢুকলেন ৷ টেবিলের ওপর চা টা রাখতে রাখতে বললেন,
  – চা নিজে বানিয়ে খেতে পারিস না? এই সামান্য কাজের জন্য আবার আমাকে ডাকতে হয়? 
বিনীতা অদ্ভূতভাবে দেখলো দরজা ভেতর থেকে লাগানো সত্ত্বেও কিভাবে যেন তার মা ও ঘরে ঢুকে পড়েছেন৷ তাহলে কি ঘরে ঢোকার অন্য কোনো রাস্তা আছে? আর এই ছেলেটা কি তাহলে সেদিক দিয়েই ঢুকেছে?  বিনীতা কেমন একটা অপরাধীর মতো মুখ করে বললো,
  – চা আমার জন্য না ৷ ঐ লোকটার জন্য ৷ সে চা খেয়ে চলে যাবে বলেছে।
 বিনীতার মা সামনের চেয়ারটার দিকে তাকালেন ৷ দেখলেন চেয়ারটা খালিই পড়ে আছে ৷ তিনি বেশ বিরক্ত হলেন বিনীতার এই আচরণে ৷
  – এরকম উল্টোপাল্টা পাগলের মতো আচরণ করবি না ৷ ফের এরকম করলে কিন্তু তোর বাবাকে বলে দেব৷ সে কেমন রাগী মানুষ, তা কিন্তু তুই ভালোই জানিস৷
বিনীতা আর এ বিষয়ে উচ্চবাচ্য করলো না৷ তার ধারণা পাকাপোক্ত হলো৷ আসলে তার হ্যালুসিনেশন হচ্ছে৷ সুতরাং এই ছোকরাটিকে অতটা গুরুত্ব দেবার কোনো কারন নেই৷ তাই চায়ের কাপটি হাতে নিয়ে সে নিজেই চুমুক দিলো৷ বিনীতা দেখলো ছেলেটা এখনো পাশের চেয়ারেই বসে আছে৷ মুখের ভাবটা পাল্টে গেছে৷ যেন সে খুব বিস্ময়বোধ করছে৷ বিনীতা ব্যাপারটায় বেশ মজা পাচ্ছে৷
  – এটা কি হলো? চা খেতে চাইলাম আমি আর খাচ্ছেন আপনি?
  – খাচ্ছি না৷ পান করছি৷ আর হ্যা, আপনাকে আমি চা খাওয়াবো না৷ আপনি এখন যেতে পারেন৷
কথাটা বলে বিনীতা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিলেও, আড়চোখে সে দেখার চেষ্টা করলো ছেলেটা চলে যায় কিনা৷ ছেলেটা চেয়ারটা ঠেলে উঠে আর কোনো কথা না বলে দরজা খুলে সোজা বাইরে চলে গেলো৷ বিনীতা খুব আগ্রহের সাথে চা খেয়ে শেষ করলো৷ দরজার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলো সেটা কিভাবে যেন আবার আপনাআপনি বন্ধ হয়ে গেছে৷ মনে মনে বিনীতা ভাবলো খুব দ্রুতই তার একজন সাইক্রিয়াট্রিস্ট দেখানো উচিত৷
 ২.
ছেলেটি রুম থেকে বেরিয়ে আসতেই আর একজন তার দিকে এগিয়ে এলো৷ দেখে মনেহলো বেশ উৎকন্ঠার সাথে সে অপেক্ষা করছিলো৷ এগিয়ে এসেই জিজ্ঞাসা করলো,
  – কেমন দেখলেন ডক্টর?
  – অবস্থা খুব ভালো নয়৷ আপনার স্ত্রীর ভয়ংকর রকমের হ্যালুসিনেশন হচ্ছে৷ আচ্ছা, আপনার শ্বশুর-শাশুড়ী, আই মিন বিনীতার বাবা-মা মারা যান কবে?
  – সে তো অনেক আগের কথা৷ বিনীতার বয়স বোধহয় তখন এগারো বছর৷ দুজনে একসাথে মারা যান গাড়ি এক্সিডেন্টে৷
ডাক্তার সাহেবকে খানিকটা চিন্তিত দেখালো৷ কয়েক মিনিট চুপ থেকে সে বললো,
  – আচ্ছা আপনি ঘন্টা দুয়েক পর আমার চেম্বারে একবার আসুন৷
  – আচ্ছা৷ আমি কি এখন বিনীতার সাথে দেখা করতে পারি?
  – পারেন তো অবশ্যই৷ তবে যদি আপনাকে চিনতে না পারে, তাহলে কিন্তু হিতে বিপরীত হবার সম্ভাবনা আছে৷
  ডাক্তার সাহেব চলে যাবার পর, ইমন সাহেব জানালার পর্দাটা সামান্য সরিয়ে উঁকি মারলেন৷ বিনীতা একটা টেবিলের সামনে পাতা চেয়ারে বসে পা দোলাচ্ছে৷ আর ডানহাতটা মাঝে মাঝে মুখের একটু কাছে নিয়ে যাচ্ছে ৷ মনেহচ্ছে যেন চা খাচ্ছে৷ শুধু হাতে চায়ের কাপটা নেই৷
লেখকঃ শিক্ষার্থী, চারুকলা অনুষদ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়। 

Leave a Comment