প্রকৃতি সংঘ

প্রকৃতি সংঘের মিটিং বসেছে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে। সংঘের প্রায় সকল সদস্যের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে। সংঘের রয়েছে একজন পরিচালক, আর বাকিরা সাধারণ সদস্য হিসেবে পরিচিত। প্রকৃতি সংঘ কাজ করে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার জন্যে। মানুষের অবুঝ প্রলয়ংকারি হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর জন্যে তারা সর্বদা প্রস্তুত। প্রকৃতি সংঘের লক্ষ্য বলতে প্রকৃতির সুরক্ষা নিশ্চিত করা, আগুনের অঙ্গারে যাতে পুড়ে না যায় প্রকৃতির মায়াজাল।
আজকের মিটিং এ একরকম ভারী নীরবতা বিরাজ করছে। সংঘের অন্যতম সদস্য মাছগুলোকে দেখা যাচ্ছে না। তাদের পরিণতি বাতাসে হাহাকার ছড়িয়ে দিয়েছে। মানুষের বিষদাঁতে বিদ্ধ হতে হয়েছে মাছগুলোর, এ ব্যাপারে সবাই একমত। নদী ,বাতাস, দূরের ডাস্টবিন কারো মুখে কোনো কথা নেই। সংঘের গুপ্তচরের কাজ করা চঞ্চল কাকগুলো যেন শব্দ করতেই ভুলে গেছে। চারদিকে ভারী নিঃশ্বাসে বাতাস নুয়ে নুয়ে পড়ছে। এই অসহ্যকর নীরবতা প্রথম ভঙ্গ করল মাটি। সংঘের পরিচালক হিসেবে আলোচনা শুরু করাকে সে নিজের দায়িত্ব হিসেবে দেখে। পৃথিবীময় বিস্তৃত, জ্ঞানী ও অভিজ্ঞ হিসেবে সবাই মাটিকে যথেষ্ট সম্মান এবং সমীহ করে। মাটির বলিষ্ঠ কণ্ঠে শোনা গেল বাস্তবতার সুর, “আজ আমরা আমাদের বন্ধু হারানোর শোকে শোকাহিত। আজ আমাদের আলোচনার বিষয় হল- ‘মানুষের আবোঝ কর্মকান্ডে প্রকৃতির উপর কিরূপ প্রভাব।’ আমরা দেখছি যে, দীর্ঘদিন যাবত মানুষ নিজের ইচ্ছা মত প্রকৃতির উপর অত্যাচার করে চলেছে। তারা ভয়ংকরভাবে পরিবেশ দূষন করে প্রকৃতিকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আমরা প্রকৃতি সংঘের সদস্যরা আলোচনা ও বিভিন্ন কর্মকান্ডের মাধ্যমে মানুষের এই ধ্বংসজংঘ কমাতে চাচ্ছি। এমনকি পুরো পৃথিবীময় আমাদের সংঘের উদ্যোগগুলো পৌঁছে দিচ্ছি। বিভিন্ন জায়গায় আমাদের মত সংঘ তৈরি হচ্ছে। কিন্তু মানুষের ধ্বংসাত্মক কর্মকান্ড কিছুতেই কমছে না।”
কাক বলল, “ঠিকই বলছেন মহামান্য। আমাদের উদ্যোগ ও পরিকল্পনায় তো কোনো ঘাটতি নেই। আমরা কি না করছি?! বিভিন্নভাবে প্রাকৃতিক দুর্যোগ চালাচ্ছি। যাতে মানুষ ভয় পায় এবং প্রকৃতি সম্পর্কে সচেতন হয়।”
নদী বলল, “হে এই কয় মাসে আমি মেঘনা, যমুনা সহ বিভিন্ন নদীর সাথে আলোচনার মাধ্যমে বিভিন্ন জায়গায় নদী ভাঙ্গন চালিয়েছি। সাগরে জ্বলোচ্ছাস, লঞ্চ, জাহাজ ডুবি সহ বিভিন্ন পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা হয়েছে।”
বাতাস দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল, “তাতে আর কি হচ্ছে বল। কোনো লাভ কি হচ্ছে? এখন যে এতো এতো ঘূর্ণিঝড়, সিডর, আয়লা হচ্ছে তবু মানুষের কি পরিবর্তন ঘটেছে? তাদের যে ভয়ংকর ক্ষতি ঘনিয়ে আসছে তা টের পেয়েও তারা কি কিছু করে?”
ডাস্টবিন বলল, “কারণ মানুষ বড় স্বার্থপর আর অলস ও বটে! এরা নিজের ক্ষতি যতক্ষণ না হয় ততক্ষণ একচুলও নড়ে না। আর পরিবেশটা দিনে দিনে নোংরা করেই চলেছে। কিভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ময়লা ফেলে? ওরা অলস বলেই ময়লাগুলো একটু কষ্ট করে ডাস্টবিনে ফেলে না। সেজন্যইতো নষ্ট হয় না এমন জিনিস মহামান্য মাটির নিচে চাপা পরে। ফলে উনার কষ্ট হয়।” মহামান্য হতাশ মনে বলল, “এক সময় পরিবেশটা কতইনা সুন্দর ছিল। উর্বর ছিলাম আমি। সবুজ গাছপালা ছিল যার শিকড় গুলো আমার কত গভীরেই না চলে যেত। চাপা পরে থাকতো না কোন প্লাস্টিক পলিথিন। ছিল মাঠ ভরা শস্য আর শস্য, পরিষ্কার বাতাস- পানি। এসব কিছুইতো তোমরা দেখনি। এখন সব কিছুই অনুর্বর। চাপ পড়া জিনিসগুলো শুধু কষ্ট দেয়। দিনে দিনে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছি। বারবার ভূমিকম্প হয় বুকের ভেতর।”
নদী বলল, “সত্যি সত্যি মানুষগুলো চরম বোকা। এরা প্রকৃতির ক্ষতি করেও বুঝতে পারছে না নিজের ক্ষতি করছে। কেন, একটু সচেতন হলেইতো প্রকৃতিকে সুন্দর রাখা যায়। মানুষগুলো কবে বুঝবে?”
নদীর কথা শেষ হতে না হতেই আবার পিনপতন নীরবতা সংঘের সবাইকে গ্রাস করে গেল। বেশি দূরে যেতে হয় না , এইদিকে ওইদিকে তাকালেই দেখা যায় মানুষ নামক বুদ্ধিমান জীবের বিষদাঁত। ওদেরকে বুদ্ধিমান বলতে ইচ্ছে করে না কাকেদের, তারা কর্কশ কণ্ঠে কা-কা করতে থাকে। সবার দৃষ্টিতে একটা হতাশার প্রশ্নই বার বার ভেসে উঠতে থাকে। মানুষগুলো কবে বুঝবে, কবে বুঝবে? অতঃপর মাটির দীর্ঘনিঃশ্বাসে সবাই ফিরে তাকায়, সবাই আবার একমত হয় ।

“আশা ছাড়তে নেই” ।

লেখকঃ উম্মে হাফসা সায়রা
শিক্ষার্থী, এসভি সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়

Leave a Comment