সব হারানোর গল্প

কিশোর পত্রিকা কাকাড্ডা সব সময় উৎসাহিত করে কিশোর লেখকদের। এসব লেখায় হয়তো আনাড়ি ছাপটাও কখনো খুব স্পষ্ট। কিন্তু এই লেখার চর্চাটা ধরে রাখা খুব জরুরী। আজ প্রকাশিত হলো গুরুদয়াল সরকারি কলেজের একাদশ শ্রেণীর শিক্ষার্থী সাদিয়া সুলতানা রিচির লেখা একটি গল্প। 

ডায়রি লিখছিলাম। হঠাৎই ছুট্টি ঘরে ঢুকলো। আমি তাড়াহুড়ো করে একটা বই টেনে ডায়রির উপর রাখলাম। হাতে কলম আর সামনে গার্হস্থ্য বই নিয়ে টেবিলের সামনে বসে আছি দেখে ছুট্টি আমার দিকে ভূত দেখার মতো করে চেয়ে রইলো। গার্হস্থ্য বইয়ের নিচের ডায়রিটাও ও দেখেছে সেটা তার মুখ দেখেই আমি বুঝতে পারছি। আবার ছুট্টিও বুঝতে পারছে যে আমি ওর ডায়রি দেখে ফেলা ধরতে পেরেছি। তাই সে পরিস্থিতি সামলে নিয়ে বললো,
-ঘুমাস নাই?
-ঘুম আসছে না। জায়ীদ কই?
-ঘুমিয়ে গেছে।
ছুট্টি চলে গেল। আমি সাথে সাথে ডায়রি আমার ব্যাগে ঢুকিয়ে ফেললাম।

এই ডায়রিতে এতদিন র‍্যাগ ডে তে স্যার-ম্যাডামদের লিখে দেওয়া শুভ কামনা ছাড়া আর কিছুই ছিলোনা। কিন্তু, আজ হঠাৎ আমার ডায়রি লেখার ইচ্ছে হয়েছিল। তেমন কিছুই লিখিনি। নিজের সম্পর্কে দু’চার লাইন লিখছিলাম তার মাঝেই ছুট্টি চলে এলো। ও দেখলেও তেমন কিছু হতো না। কিন্তু আমি যে আমার নিজেকে প্রকাশ করতে চাই না। অন্তত আমার পরিবারের কারোর কাছে তো নয়-ই। কারণ, তাদের সাথে আমার মেলেনা। আমিও যেমন কোনোদিনই তাদের মতাদর্শ মেনে নিতে পারবোনা ঠিক তেমনি তারাও আমার মতাদর্শকে মেনে নিতে পারবেনা, একথা আমি খুব ভালো করেই জানি।
আমার এখন শুধু কয়েকটা দিনের অপেক্ষা। এস.এস.সি. পরীক্ষার রেজাল্টের জন্য।

আজ আমার রেজাল্ট হয়েছে। বাবা-মার আশা পূর্ণ করার মত ফলাফলই হয়েছে। অর্থাৎ আমি জিপিএ-৫ বা এ+ পেয়েছি। এটা আমার জন্য যে শুধু একটা রেজাল্ট তা নয়, এটা আমার জন্য অনেক বড় একটা হাতিয়ার অন্তত বাসা থেকে বের হওয়ার।

হলিক্রসের রেজাল্ট দিলো। আমি চান্স পেয়েছি। আমার জন্যে এটা যে কতটা সুখের সেটা শুধু আমিই জানি। যদিও বাসা ছেড়ে যাবো বলে খারাপ লাগছে। শত হোক আমার বাসাতো!
দু’দিন পর আমাকে বাবা আর ভাইয়া হোস্টেলে দিয়ে গেল। আসার সময় মা অনেক কান্নাকাটি করছিলো। আমিও কেঁদেছিলাম।

প্রথম প্রথম হোস্টেলে থাকতে অনেক কষ্ট হতো। কিন্তু তাও মানিয়ে নিয়েছিলাম। তারপর এমন হলো যে আমার আর বাসার কথা মনেই হতো না। খুব বেশি ছুটি না পেলে বাসায় যাওয়া হতো না। এভাবে আস্তে আস্তে দুটো বছর কেটে গেল। আমি এইচ.এস.সি. পাশ করলাম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ইতিহাস বিভাগে চান্স পেলাম। বাসার সবাই খুব খুশি হলো।

পাঁচ মাস হলো হলে উঠেছি অথচ বাসায় গিয়েছিলাম মাত্র একবার। বাবার শরীরটা খুব একটা ভালো যাচ্ছে না ইদানীং। বয়সের ভারে যেন নুইয়ে পরেছে। অবশ্য বয়স তো আর কম হয়নি। সত্তরে পরলো হয়তো। ভাইয়াও বিয়ে করে ঢাকায় স্থায়ী হয়েছে। বাবা-মাকে বলেছে তাদের সাথে এসে থাকার জন্য কিন্তু তারা রাজি হয়নি। আমি মাঝেমধ্যে ভাইয়ার বাসায় গিয়ে থাকি। ভাইয়া তার বাসায়ই থাকতে বলে কিন্তু আমার হলে থাকতেই ভালো লাগে।

আজ পাঁচ বছর হয়ে গেল বাবা-মা দুজনের কেউই আর নেই। বাবা মারা গিয়েছিলো হার্ট-অ্যাটাকে আর তার দুই বছরের মাঝেই মাও চলে গেলো। বাবা মারা যাবার পর অবশ্য মা ভাইয়া কাছেই থাকতো। তখন আমিও ওখানেই থাকতাম। কিন্তু মা মারা যাবার পরই আমি ভাইয়ার বাসা ছেড়েছিলাম। এই দুই বছরে তিনবারও তার বাসায় গিয়েছিলাম কিনা জানি না। মা-বাবা মারা যাবার পর থেকে আমার আর আমার ভাই-বোনদের সাথে খুব একটা যোগাযোগ হয় না। আমি আমার ক্যারিয়ার গড়তে ব্যস্ত হয়ে ওঠি আর তারাও তাদের পরিবার নিয়ে ব্যস্ত। মাঝেমাঝে ভাই-বোনদের কেউ ফোন দিয়ে খোঁজ-খবর নেয়। এভাবেই চলে আরকি। সময় কি কারো জন্য কখনো থেমে থাকে। সময় তার নিজের গতিতে বহমান। আর সময়ের গতির সাথে তাল মিলিয়ে আমার জীবনও বয়ে চলে।

এখন আমি ভালোই আছি। আমার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। আমি দেশের স্বনামধন্য একটি টেলিভিশন চ্যানেলের সাংবাদিক। আমাকে এখন কত লোক চেনে, দেশের স্বনামধন্য লোকেদের সাথে আমার দেখা-সাক্ষাত হয়। শুধু দেখা হয়না আমার পরিবারের কারো সাথেই। তাও আগে যা একটু ফোনে কথা-বার্তা হতো এখন আর তাও হয়না কোনো বিশেষ উপলক্ষ ছাড়া। আর এভাবেই আমার জীবনে সময়ের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে, অনেককিছু পেতে গিয়ে, অনেক কিছুই হারিয়ে ফেলেছি। যা শুধু যে হারায় সেই বুঝে।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, একাদশ শ্রেণী, গুরুদয়াল সরকারি কলেজ। 

1 thought on “সব হারানোর গল্প”

  1. এভাবেই হারিয়ে যাওয়ার মাঝেই আমরা সামনে এগুতে থাকি। নিজেকে ভালোবাসতে শিখি এবং এটাই আঁকড়ে বেঁচে থাকি। সুন্দর হোক তোর পথচলা এবং সুন্দর হোক তোর রঙীন পৃথিবী।
    বন্ধু হয়ে তোর সঙ্গী হয়ে যেন থাকতে পারি ♥

    Reply

Leave a Comment