ডাকিনীদের গল্প

সাদিয়া আফরিন

বলছি ডাকিনীদের গল্প। সভ্যতার শুরু থেকেই মানুষের অতিপ্রাকৃতিক বা অবাস্তব শক্তি নিয়ে আগ্রহের কমতি নেই। সেই শক্তি কেই আয়ত্তে আনার চিন্তা থেকে এই ডাকিনীবিদ্যার চর্চার শুরু। “ডাক” হল হিন্দু পুরাণের দেবতা শিব এর অনুচর। ডাক বলতে এক ধরনের পিশাচকে বুঝানো হয়ে থাকে। ডাকের স্ত্রী-লিঙ্গ ডাকিনী। ডাকিনী থেকেই ডাইনী শব্দের উৎপত্তি।

মূলত বিভিন্ন ধরনের অতিমানবিক ক্ষমতা নিয়ে যিনি বা যারা চর্চা করেন তাদেরই ডাকিনী বা ডাইনি বলা হয়ে থাকে। পাশ্চাত্যের বিভিন্ন গোত্রের মধ্যে অদ্ভুত কিছু বিশ্বাস ও কর্মকাণ্ডের নিদর্শন পাওয়া গেলেও নানা দেশের নৃ-বিজ্ঞানীরা তাদের গবেষণার জন্য উর্বর ক্ষেত্র মনে করেন আফ্রিকাকে। ডাকবিদ্যার চর্চা সম্পর্কে নানান দেশে নানা রকম মতবাদের প্রচলন রয়েছে। যেমন খ্রিস্টান সমাজ ও সেক্যুলার প্রতিষ্ঠানগুলো মনে করত ডাকিনীবিদ্যা নগ্ননৃত্য ও মানুষের মাংস খাওয়া নিয়ে পালিত শয়তানী ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে জড়িত। এছাড়াও ইতিহাসের পাতায় আমরা অনেক বিখ্যাত বিখ্যাত ডাইনির নাম পেয়ে থাকি। যেমন- Kikimora, Circe, Morgan Le Fay, The Witch of Endor, Jenny Greenteeth সহ আর অনেকেই ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লিখে নিয়েছেন।

ইতিহাসে বিভিন্ন ডাইনিদের নাম থাকলেও একজনের নাম বরাবরই আমরা সবাই জানি- বাবা ইয়াগা। এই “বাবা” কিন্তু একটি স্লাভিক শব্দ। “বাবা ” মানে হল দাদী/ নানী আর ইয়াগা অর্থ অসুস্থ, আতঙ্ক ইত্যাদি। বাবা ইয়াগার বাসস্থান মূলত গভীর বনে। তার আছে একটি কুঁড়েঘর যা কিনা তার সাথে সাথে মুরগির পায়ের মত দুটি পায়ে ভর দিয়ে চলে। আর রাত হলেই সে ঝাড়ুতে চেপে ঘুরে বেড়ায় বনের এপ্রান্ত থেকে সে প্রান্ত, তার পরের শিকারের খোজেঁ। বাবা ইয়াগার চেহারা দেখতে নাকি লিকলিকে শুকনো, বর্শির মত বাঁকানো তার নাক আর কুৎসিত চেহারা। তাকে নরমাংস ভোজি বলা হয়ে থাকে। কিন্তু সব সময় সে মানুষের খোজঁ করে না। মানুষ নিয়ে খেলতেও ভীষণ শখ তার।

বাবা ইয়াগার আশ্চর্য কুঁড়েঘর

অনেক গল্পেই বাবা ইয়াগা কাউকে কোন চ্যলেঞ্জিং কাজের সম্মুখিন করে – জিতলে পুরস্কার আর হারলে সোজা কড়াইয়ে কারণ কড়াইতেই তো সে রান্না করে তার পছন্দের নরমাংস। বাবা ইয়াগার নাকি সাঙ্গ পাঙ্গও আছে। তারা নাকি খোদ সময়কে নিয়ে খেল দেখাতে পারে। আর আছে কোশ্চে নামে এক অমর, আকৃতি পরিবর্তনের ক্ষমতাধারী জাদুকর। কিন্তু সবই নাকি গল্প।

আবার কিছু কিছু ডাইনীরা তাদের যাদুবিদ্যার কাজে মানুষের চুল, নখ, জীবজন্তুর হাড়, চামড়া, দাঁত, মাংস,পাখির পালক, নখ, মাংস, রক্ত, গাছগাছড়ার ফুল, ফল, লতা, শিকড়, ছাল, জড়বস্তুর মধ্যে মাটি, পাথর, সোনা, রূপা, তামা, লোহা, কড়ি, ঝাড়ু ইত্যাদি ব্যবহার করে থাকে। বিভিন্ন দেশে অনেক আগে থেকেই ডাইনী নিধনের কাজ শুরু হয়েছিল। মূলত ডাইনী ভীতি থেকেই ডাইনী শিকার শুরু হয়েছে। প্রাচীন কালে ডাইনীদের ধরে পুড়িয়ে মারা হত। ডাইনী-শিকারের প্রাথমিক যুগ ছিল ১৪৮০ থেকে ১৭০০ সালের মধ্যে। প্রাচীন মিশর ও ব্যবিলনে ডাইনীদের জন্য আলাদা আইন ছিল। কিন্তু বর্তমানে অনেক সমাজেই বিনাদোষে মেয়েদের ডাইনী নামে আখ্যায়িত করে তাদের একঘরে করে রাখছে বা সম্পত্তি হরণের জন্য তাদের পুড়িয়ে মারছে। সারা ইউরোপে প্রায় ১২,০০০ ডাইনী বিচারের ঘটনা ঘটেছিল। আবার যদি একজন মানুষ আরেকজনের ওপর যাদুটোনা করে ও তা যদি প্রমাণিত না হয়; যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি পবিত্র নদীতে নামবে। নদী যদি তাকে ডুবিয়ে মারে তাহলে যাদু প্রয়োগকারী ব্যক্তি যার উপর যাদু করা হয়েছে তার সব সম্পত্তি পাবে যাদুকারী ব্যক্তি। আর যদি সে না ডুবে তাহলে যাদুকর মৃত্যুদন্ড পাবে এবং তার বাড়ীর মালিকানা পাবে ঐ যাদুতে আক্রান্ত ব্যক্তি। এছাড়াও ডাইনি নিধনে প্রাচীন কালে এক ধরনের যন্ত্র ব্যবহৃত হত। যদি কেউ ডাইনী বলে প্রমাণিত হত তাহলে সে তীক্ষ্ণ যন্ত্র তার বুকে বিধিয়ে দেওয়া হত। এছাড়া ও বিভিন্ন ধরনের চিহ্ন দেখেও ডাইনীদের সনাক্ত করা হত। সেইসব চিহ্নকে শয়তানের ছেড়ে যাওয়া চিহ্ন বলা হত। কিন্তু ডাকিনীর অবস্থান কি শুধু গল্পে নাকি সত্যি তা বুঝাই ভার।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply