আব্রাহামিক ধর্মের বিস্তার

বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারী। পৃথিবীর সব অঞ্চলে রয়েছে এই ধর্মগুলোর অনুসারী। মানবতা, সাম্য ও সমতার যেই বাণী নিয়ে উৎপত্তি ঘটেছিল বিভিন্ন আব্রাহামিক ধর্মের তা অনেকটা বিতর্কিত হলেও এখনো পৃথিবীর সব অঞ্চলে প্রতাপশালীভাবে টিকে আছে একেশ্বরবাদী এই আব্রাহামিক ধর্মগুলো। আব্রাহামিক ধর্মগুলো বিস্তার নিয়ে কাকাড্ডা ডট কমে লিখেছেন মেহেদী হাসান নিলয়। 

 

 

মানব সভ্যতার ক্রমবিকাশে ধর্ম খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। বিভিন্ন তথ্যমতে বর্তমানে পৃথিবীতে প্রায় চার হাজারেরও বেশি ধর্ম আছে। মানুষের ভাষার মতো উৎপত্তি ও বিকাশ অনুযায়ী ধর্মগুলিও কয়েকটি প্রধান শ্রেণিতে বিভক্ত। যেমন : আব্রাহামিক ধর্ম, ভারতীয় ধর্ম, পূর্ব এশীয় ধর্ম, ইরানীয় ধর্ম। তুলনামূলক ধর্মতত্ত্বের এই ধর্মগত শ্রেণিবিন্যাসের মাঝে আব্রাহামিক ধর্ম অন্যতম। 

আব্রাহামিক ধর্ম বলতে ইব্রাহিম এর সাথে সম্পর্কিত একেশ্বরবাদী ধর্মগুলিকে বোঝানো হয়। এজন্য একে ইব্রাহিমীয় ধর্মও বলা হয়। আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারীরা নবী ইব্রাহিমকে তাদের পূর্বপুরুষ হিসেবে মানে। এই ধর্মগুলির মাঝে উৎপত্তিগত ধারাবাহিকতাও বিদ্যমান। বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারী। প্রভাব বিস্তারকারী প্রধান তিনটি আব্রাহামিক ধর্ম হচ্ছে – ইহুদীধর্ম, খ্রিস্টধর্ম এবং ইসলামধর্ম। এছাড়া বাহাই, ইয়াজিদি এবং দ্রুজ প্রচলিত কয়েকটি আব্রাহামিক ধর্ম।

উৎপত্তি অনুযায়ী আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মাঝে সবচেয়ে প্রাচীন হচ্ছে ইহুদী ধর্ম। আজ থেকে চার হাজার বছরেরও বেশি সময় পূর্বে আরবের উত্তরে ইজরাইল অঞ্চলে পৃথিবীর প্রথম একেশ্বরবাদী ধর্ম ইহুদীধর্মের সূচনা হয়। তখনকার আরবের নানা শাসকগোষ্ঠীর মাঝে রাজ্য ও ক্ষমতা দখলের রক্তাক্ত লড়াই চলতো। এইরকম পরিবেশে ইহুদীদের নানা ধর্মীয় অনুশাসনের স্রষ্টা মোজেস শক্তির অধিষ্ঠাতা দেবতা হিসেবে “ইয়াহুয়া” প্রতিষ্ঠা করেন। পরবর্তীতে ইজরায়েলের যাযা

প্রভুর সন্তুষ্টির জন্য আব্রাহাম (ইব্রাহিম) এর পুত্রকে কোরবান করতে রাজি হন

বর ইহুদিরা প্যালেস্টাইনের কৃষি অঞ্চল দখল করে ব্যাপক আধিপত্য বিস্তার করে এবং ইহুদী ধর্মের পরিধি বৃদ্ধি পায়। খ্রিস্টপূর্বাব্দ ৫৩৮ এর দিকে কঠোর একেশ্বরবাদ এবং ধর্মীয় গ্রন্থগুলিকে সুসংহত করে ইহুদিধর্ম পরিপূর্ণ রূপ লাভ করে। ওল্ড টেস্টামেন্টের প্রথম পাঁচটি বইকে এই ধর্মের মূল ধর্মগ্রন্থ হিসেবে ধরা হয়। একসময়কার আধিপত্য বিস্তারকারী এই ধর্মের বর্তমান অনুসারী মাত্র ০.২৩ ভাগ লোক।

 

ইহুদী ধর্মের ধারাবাহিতায় খ্রিস্ট ধর্মের উৎপত্তি হয় এবং সবচেয়ে বড় আব্রাহামিক ধর্ম হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। বিংশ খ্রিস্টাব্দের পরে প্যালেস্টাইনে খ্রিস্ট ধর্মের গোড়াপত্তন হয়। রোম সম্রাজের আগ্রাসন খ্রিস্ট ধর্মের উৎপত্তিতে প্রভাবক হিসেবে কাজ করে। রোম সম্রাজ্যের আগ্রাসনে ইউরোপ, এশিয়া ও আফ্রিকার বিশাল অঞ্চলের অনেক মানুষ দাস হিসেবে নিপীড়িত জীবন কাটাতে বাধ্য হয়। এই বিপুল সংখ্যক মানুষের কাছে এমন একটি ধর্মমতের প্রয়োজন হয় যা তাদের শাসকগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে সাহসী করে তুলবে। খ্রিস্ট ধর্মের প্রতিষ্ঠাতা যিশু সাধারণ মানুষের মধ্যে ঈশ্বরের কথা প্রচার করেন, তিনি সমাজের উঁচুনিচু ভেদ না করে সবাইকে ঈশ্বরের সন্তান হিসেবে অভিহিত করেন। যা শোষিত সাধারণ মানুষের মাঝে অনেক জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। খ্রিষ্ট ধর্মের প্রধান ধর্মগ্রন্থ নিউ টেস্টামেন্ট। বিভিন্ন সংস্কারক আন্দোলন ও ধর্মীয় মতপার্থক্যের কারণে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীরা কয়েকভাগে বিভক্ত। যেমন : রোমান ক্যাথলিক, প্রোটেস্ট্যান্ট, অর্থোডক্স। অনুসারীর সংখ্যা হিসেবে খ্রিস্টধর্ম হচ্ছে বর্তমান পৃথিবীর সবচেয়ে বৃহত্তম ধর্ম। প্রায় ৩৩ ভাগ এর বেশি মানুষ এই ধর্মে বিশ্বাসী।

আব্রাহামিক ধর্মগুলোর মাঝে অন্যতম ইসলাম ধর্মের গোড়াপত্তন ঘটে আরব অঞ্চলে খ্রিস্টীয় সপ্তম শতকে। তখন আরবের গোষ্ঠীগত ও ব্যবসায়িক অন্তর্দ্বন্দ্ব প্রবল আকার ধারণ করে। সমাজের অধিকাংশ মানুষ ছিল হতদরিদ্র, সম্পদ ছিল কিছু মুষ্টিমেয় মানুষের হাতে। সামাজিক অনাচার ও অমানবিক পরিবেশ চরম এক আকার ধারণ করে। আরবের এইরকম পরিবেশে ইসলাম ধর্মের প্রবর্তক মুহাম্মদ মানুষের মাঝে সাম্য, সমতার আর ঈশ্বরের আরাধনার বাণী প্রচার শুরু করেন। প্রথম দিকে আরবের শাসকগোষ্ঠীর নানা বাধার সম্মুখীন হন। একসময় অনুসারীদের নিয়ে মক্কা ছেড়ে মদিনায় চলে যেতে বাধ্য হন। মক্কার মানুষের মাঝে মুহাম্মদের জনপ্রিয়তা এবং মদিনা জয়ের পর সম্পূর্ণ আরব আঞ্চলে ইসলাম ধর্ম ব্যাপক প্রসার লাভ করে। বর্তমানে পৃথিবীর দ্বিতীয় বৃহত্তম ধর্ম হচ্ছে ইসলাম।

বর্তমান পৃথিবীর অর্ধেকেরও বেশি মানুষ আব্রাহামিক ধর্মের অনুসারী। পৃথিবীর সব অঞ্চলে রয়েছে এই ধর্মগুলোর অনুসারী। মানবতা, সাম্য ও সমতার যেই বাণী নিয়ে উৎপত্তি ঘটেছিল বিভিন্ন আব্রাহামিক ধর্মের তা অনেকটা বিতর্কিত হলেও এখনো পৃথিবীর সব অঞ্চলে প্রতাপশালীভাবে টিকে আছে একেশ্বরবাদী এই আব্রাহামিক ধর্মগুলো।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ইংরেজি বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। 

1 thought on “আব্রাহামিক ধর্মের বিস্তার”

Leave a Comment