মাংসাশী উদ্ভিদের দ্বিতীয় পর্ব

নাইমা নাসরিন নিশা

“আমি চাই মানুষ উদ্ভিদের ব্যাপারে উৎসাহী হয়ে উঠুক”, সান ফ্রান্সিসকো কনসারভেটরি অব ফ্লাওয়ারস এর এক প্রদর্শনীতে বলছিলেন লিসা ভ্যান ক্লিফ। “চিড়িয়াখানা বা পশুপাখি সম্পর্কে প্রত্যেকের আগ্রহ থাকলেও যখনি আপনি উদ্ভিদ জগতের দিকে তাকাবেন দেখবেন সেখানেও অনেক কিছু চলছে।”

বিশেষত মাংসাশী উদ্ভিদ, যারা কীটপতঙ্গকে ফাঁদে ফেলার জন্য বিভিন্ন চটকদার কৌশল অবলম্বন করে। উদাহরণ হিসেবে ব্লাডারওর্টকে নেওয়া যেতে পারে। এদের শান্ত পুকুরে জন্মানো ক্ষুদ্র উদ্ভিদ বলে মনে হতে পারে। কিন্তু এরা উদ্ভিদজগতের দ্রুততম শিকারী হিসেবে পরিচিত যা সেকেন্ডের পঞ্চাশ ভাগের একভাগ সময়ে অসতর্ক মশার লার্ভাকে ফাঁদে ফেলতে সক্ষম! ফাঁদ দরজা বন্ধ হলে, মানব পাকস্থলীর ন্যায় পরিপাক এনজাইমসমূহ শিকারকে ধীরে ধীরে হজম করে ফেলে। পরিপাকের পর উদ্ভিদটি অবশিষ্টাংশ নিঃসরণ করে ও পুনরায় ফাঁদ তৈরী করে।

বিশেষ কোনো গুনাগুণ বিহীন মাটিতে এই মাংসাশী উদ্ভিদগুলো জন্মায়। “আপনি বা আমি পুষ্টির জন্য ভিটামিন সেবন করতে পারি,” বলেন ভ্যান ক্লিফ। “কিন্তু এই বিস্ময়কর উদ্ভিদসমূহের পুষ্টির চাহিদা পূরণে হাজার বছরের বিবর্তনে তাদের পতঙ্গ ফাঁদ উন্নত করতে হয়েছে। শুধু তাকিয়ে দেখুন টিকে থাকার জন্য কতকিছুর সাথে লড়াই করতে হয়েছে।’’

শিকারের চোখকে ফাঁকি দেওয়ার জন্য ফাঁদগুলো বিশেষ ছদ্মবেশে থাকে। যেমন কলসি গুল্ম- অমৃতপূর্ণ সুন্দর কলসির মত দেখতে বলে এই নামকরণ করা হয়েছে। এশীয় কলসি গুল্মের উজ্জ্বল প্রান্তভাগ এবং প্ররোচনামূলক অর্ধ-খোলা ঢাকনী থাকে। কৌতুহলী পোকামাকড় এতে চুমুক দিতে প্রলুব্ধ হয় এবং ধীরে ধীরে পিচ্ছিল কলসির গা বেয়ে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যায়।

কলসির অভ্যন্তরীন দেয়ালের চুলের মত গঠন নিশ্চিত করে যেন কোনো শিকার হামাগুড়ি দিয়ে বেরতে না পারে এবং পরিপাক এনজাইমসমূহ হজমের কাজে নামতে পারে। একটি ক্ষুদ্র ডাঁশপোকা কয়েক ঘন্টায় পরিপাক হতে পারলেও একটি মাছির কয়েকদিন পর্যন্ত সময় লাগতে পারে।

কিছু কিছু কলসি গুল্ম দুই গ্যালন(প্রায় ৭.৫ লিটার) পর্যন্ত ধারণক্ষমতাসম্পন্নও হতে পারে। সায়েন্স ফিকশন মুভির মাংসাশী উদ্ভিদগুলো শুধু মানুষ খেতে পছন্দ করলেও খুব তাড়াতাড়ি ছোট টিকটিকি, ইঁদুর বা পাখি আবিষ্কার করতে পারে যে কলসিগুল্ম জল পান করার উপযুক্ত স্থান নয়। বিভিন্ন শিকারী উদ্ভিদের রয়েছে শিকারের অনন্য পন্থা। সানডিও বা বাটারওর্ট শিকারকে দেহনিঃসৃত আঠালো, পিচ্ছিল তরল দ্বারা আটকে ফেলে, অপরদিকে ভেনাস ফ্লাইট্র্যাপ শিকারসহ আচমকা ঢাকনাবদ্ধ হয়ে যায়।

মাংসাশী উদ্ভিদসমূহ সমুদ্রতল থেকে পর্বত পর্যন্ত যেকোনো আর্দ্র পরিবেশে জন্মাতে পারে। এরা যতই অদ্ভুদ হোক আপনি যদি যুক্তরাষ্ট্রে বসবাস করেন তবে এদের দেখা পেতে খুব বেশিদূর যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। অন্যান্য মহাদেশের তুলনায় উত্তর আমেরিকায় এদের প্রজাতি সংখ্যা বিস্তর।

সান ফ্রান্সিসকোর প্রদর্শনী ভ্রমণের সুযোগ না হলে লাইব্রেরী থেকে সংগ্রহ করতে পারেন মাংসাশী উদ্ভিদ সংক্রান্ত যেকোনো বই। হয়তো আপনার বাড়ির পাশেই পেয়ে যেতে পারেন কোনো মাংসাশী উদ্ভিদের দেখা!

জানেন কী! 

  • কোবরা লিলির (Darlingtonia californica) কলসি আকৃতির ফাঁদের পৃষ্ঠভাগে উজ্জ্বল কোষের সারি থাকে যা আলোক উৎসের ন্যায় কাজ করে। ভাবুন: আপনি কি অন্ধকার গুহায় প্রবেশ করতে পছন্দ করবেন নাকি আলোকোজ্জ্বল?
  • কিছু কলসি গুল্ম (Nepethenes) ব্যাঙ এর মত প্রাণীকে ফাঁদে ফেলতে পারে এবং পরিপাকের পর অবশিষ্ট থাকে পায়ের কিছু অংশ, কেননা ব্যাঙের পায়ের ত্বক পরিপাকে বাধা দেয়।
  • বেশিরভাগ নেপিথিন্স জাতীয় উদ্ভিদের দুইধরণের কলসি ফাঁদ থাকে- হামাগুড়ি দিয়ে চলা পতঙ্গদের জন্য ভূমির কাছাকাছি কিছু, আর কিছু উড়ন্ত পতঙ্গ শিকারের জন্য উদ্ভিদের শীর্ষভাগে।

(ন্যাশনাল জিওগ্রাফি ম্যাগাজিন থেকে অনুদিত)

অনুবাদকঃ শিক্ষার্থী, তড়িৎ প্রকৌশল বিভাগ, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

Leave a Reply