কৈবর্ত্য বিদ্রোহ-ভারতবর্ষের প্রথম সফল বিদ্রোহ

আমাদের এই ভূখন্ডের ইতিহাস লড়াই সংগ্রামের, বিদ্রোহের। বিদ্রোহের এই ভূখন্ডে বিভিন্ন সময়ে শাসক শ্রেণীর অত্যাচারের প্রতিবাদে দানা বেঁধেছে অসংখ্য বিদ্রোহ। দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়াদের একত্রিত হয়ে শোষণের প্রতিবাদে দাঁড়িয়ে যাওয়া নতুন কিছুই নয়। প্রতিবাদ, প্রতিরোধ দমনে শাসকদের তোরজোড়ের মুখে সফল হতে পারে না সব বিদ্রোহ। তবে হাত দিয়ে যেমন সূর্যের আলোকে রুখা যায় না, তেমনি অধিকাংশ বিদ্রোহেই শোষিত, নিপীড়িতদের বিজয় আটকে রাখা যায় না। বাংলার প্রথম সফল বিদ্রোহ ছিলো পাল রাজাদের বিরুদ্ধে কৈবর্ত্যদের বিদ্রোহ। কাকাড্ডার পাঠকদের জন্য কৈবর্ত্য বিদ্রোহের ইতিহাস শুনিয়েছেন কাকাড্ডার নিয়মিত লেখিয়ে অনিন্দিতা সরকার প্রথা। 

ষষ্ঠ শ্রেণির পাঠ্যবইয়ের আশীর্বাদে আমাদের এই প্রজন্মের অনেকেই কৈবর্ত্য বিদ্রোহ সম্পর্কে পড়েছি। সেখানে আমাদের সংক্ষেপে কৈবর্ত্য বিদ্রোহের পরিচয় দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবিকভাবে বাংলার প্রথম সফল বিদ্রোহটিকে কি এত সংক্ষেপে বর্ণনা করে শেষ করা যায়? আমার ব্যাক্তিগত মত হলো, না। কৈবর্ত্য বিদ্রোহ শুধু মাত্র বাংলার নয় এমনকি সমগ্র ভারতবর্ষের প্রথম সফল বিদ্রোহ হিসেবে পরিগণিত হয়। এই বিদ্রোহ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনকালীন সময়ে। রাজা দ্বিতীয় মহীপাল বরেন্দ্রী শাসন করেন ১০৭০ থেকে ১০৭৭ সাল পর্যন্ত।

এ বিদ্রোহের মূল কারণ হলো পাল রাজাদের কৈবর্ত্যদের জীবিকানির্বাহে বাঁধা প্রদান। আমরা বইয়ে পড়েছি পাল রাজারা ছিলেন বৌদ্ধ ধর্মালম্বী। অপরদিকে কৈবর্ত্যরা ছিলো ধীবর জাতের বা জালুয়া কৈবর্ত্য। তাদের পেশা ছিলো মাছ ধরা। সহজ ভাষায় তারা ছিলো জেলে। বৌদ্ধ পাল রাজারা ছিলেন প্রাণী হত্যা বিরোধী। তারা কৈবর্ত্যদের এ পেশায় অনুৎসাহিত তো করতোই, এমনকি বাঁধাও দিত। জীবিকানির্বাহের পথে এমন বাঁধা কৈবর্ত্যদের ভীষণ ক্ষুব্ধ করে তোলে। এই ক্ষোভ প্রকাশ পায় রাজা দ্বিতীয় মহীপালের শাসনাধীন সময়ে। তারা বিদ্রোহ করার সুযোগ পায় কারণ তখন পালসাম্রাজ্য হয়ে পড়েছিলো অত্যন্ত দুর্বল। সমাজে নানাভাবে কৈবর্ত্যদের নির্যাতিত হতে হচ্ছিল। মহীপাল তাঁর দুইভাই দ্বিতীয় শূরপাল ও দ্বিতীয় রামপালকে বন্দী করে ফেলেন। ফলে যেই পাল শাসনকে বলা হতো ‘স্বর্ণযুগ’ সেই পাল শাসনই রাজা দেবপাল ও ধর্মপালের সময় শেষ হতেই পরিণত হলো এক অরাজকতার জগতে।

এই অত্যাচার, নিপীড়ন ও ত্রাস থেকে বরেন্দ্রীকে উদ্ধার করতে কৈবর্ত্যদের সাথে যুক্ত হয় দ্বিতীয় শূরপাল ও দ্বিতীয় রামপালের সামন্তেরা। বলা যায়, পাল রাজার বিরুদ্ধে চলে যায় তাঁর নিজেরই পরিবার। অতঃপর পাল কর্মচারী, কৈবর্ত্যদের নেতা দিব্যকের নেতৃত্বে পাল সমাজ শুরু করে তাদের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। স্বাভাবিকভাবেই বিদ্রোহী জেলেরা ছিলো নৌকা চালাতে পারদর্শী এবং প্রাধান্য দেয় নৌযুদ্ধকেই। রাজা মহীপাল আক্রমণকালীন মৃত্যুবরণ করেন, ফলে পাল সেনাদের বাধ্য হয়েই পিছপা হতে হয়। এবং এর পরই রাজা দিব্যর নেতৃত্বে এই বরেন্দ্রীকে রাষ্ট্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়। তারপর তাঁর ছোটভাই রুদোক এবং তারপর তাঁর পুত্র ভীম বরেন্দ্রী শাসন করেন। ভীম ছিলেন একজন আদর্শ শাসক। যুদ্ধ বিদ্ধস্থ বরেন্দ্রীকে তিনি সংস্কার করেন।

বাংলাদেশের দিনাজপুর এবং বর্তমান মুর্শিদাবাদে এই সমৃদ্ধতার ও বীর দিব্যকের বিজয়ের প্রতীক হিসেবে রয়েছে বিজয়স্তম্ভ। তাঁর উদারতা ও খ্যাতির প্রচারে ভীত হয়ে রাজা রামপাল ভাবতে থাকেন, কিভাবে ভীমকে পরাজিত করে বরেন্দ্রী পুণরুদ্ধার করা যায়। রামপাল ঢালাও ভাবে অর্থ খরচ করে সামন্ত রাজাদের নিজের পক্ষে আনেন এবং তাদের সাহায্যেই বরেন্দ্রীকে পুণরুদ্ধার করেন। গঙ্গার উত্তর তীরে রাজা ভীম যুদ্ধে পরাজিত হয় জীবিতাবস্থায় বন্দীত্ববরণ করেন। কারণ, এত বড় পরাশক্তির কাছে নবগঠিত রাষ্ট্র বরেন্দ্রীর পক্ষে পেরে ওঠা ছিলো অসম্ভব।

ভীমের রাজকোষকে পালসেনারা দস্যুর মতন লুট করে। ভীম বন্দী হলে তাঁর বিশ্বস্ত হরি নামে এক কৈবর্ত্য পরাজিত সৈনিকদের পুণরায় একত্রিত করেন এবং রামপালের বিরুদ্ধে সোচ্চার হন। কিন্তু তাতে কোনো লাভ হলোনা। রামপাল আবার নিজের স্বর্ণমুদ্রা অপরিমিত ভাবে কৈবর্ত্যদের সম্মুখে ঢেলে দেন এবং রাজ্য উদ্ধারে সফল হন। কৈবর্ত্যরা যেন আর কোনোদিন বিদ্রোহী না হয়ে ওঠে তা নিশ্চিৎ করতে নৃশংস ও অত্যাচারী পাল রাজা ভীমের পরিবারকে তাঁর চোখের সামনে হত্যা করে এবং তাঁকেও পরবর্তীতে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ভেঙে ফেলা হয় মুর্শিদাবাদের বিজয় স্তম্ভ। এভাবেই চিরদিনের জন্য বরেন্দ্রীর স্বাধীন রাষ্ট্র হওয়ার স্বপ্ন ধুলোয় মিশে যায়, পরিসমাপ্তি ঘটে বাংলার প্রথম সফল বিদ্রোহ ‘কৈবর্ত্য বিদ্রোহ’ এর।

 

লেখকঃ শিক্ষার্থী, কিশোরগঞ্জ সরকারী মহিলা কলেজ। 

2 thoughts on “কৈবর্ত্য বিদ্রোহ-ভারতবর্ষের প্রথম সফল বিদ্রোহ”

  1. кератиновое покрытие волос

    Кератиновое выпрямление нужно кератиновая процедура для волос пушащихся а также кудрявых волос, в часности
    со непростым завитком. Правда способно придать бледным или испорченным волосам
    крепкий, блестящий вид, сделать их в
    большей степени эластичными.

    Суть заботы состоит в насыщении локонов
    жидким кератином, который образовывает оградительный слой,
    убирающий статическое электричество
    и сглаживающий кутикулу.

    Reply

Leave a Comment