জিডিপির ভালো-মন্দ, হিসাব-নিকাশ!

জিডিপি নিয়ে কতোই না হইচই। জিডিপির উর্ধ্বমুখী গ্রাফ দেখিয়ে কেউ কেউ বলছেন চমৎকার আগাচ্ছে দেশ। কেউ বা বলছে জিডিপিই কি সব? বড়রা জিডিপি নিয়ে কথা বলতে বলতে বাংলাদেশ থেকে ইউরোপ-আমেরিকা, চীন-রাশিয়া ঘুরে চলে আসেন। এই জিডিপি কি চিজ তা ছোটদের একটু সহজ করে জানিয়ে দিতে চায় কাকাড্ডা। জিডিপি কী, কিভাবে হিসাব করা হয় জিডিপি, এই নিয়ে পড়ুন জাহীন হাসানের লেখা। 

কিছুদিন আগেই স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশের কাতারে ওঠার যোগ্যতা অর্জনের শর্ত পূরণ করেছে বাংলাদেশ। অর্থনীতিবিদদের মতে, সব কিছু ঠিক থাকলে ২০২৪ সালে উন্নয়নশীল দেশ হবে বাংলাদেশ। জাতিসংঘ তার সদস্য দেশগুলোকে স্বল্পোন্নত, উন্নয়নশীল ও উন্নত—এ তিন শ্রেণিতে বিভক্ত করে। যেসব দেশের মাথাপিছু জাতীয় আয় ১২৩০ ডলার অতিক্রম করেছে তাদেরকে উন্নয়নশীল দেশের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অর্থাৎ, একটি দেশের অর্থনীতিকে বুঝতে সে দেশের জাতীয় আয়কে বুঝতে হবে।

কোনো একটি দেশে নির্দিষ্ট সময়ে (সাধারণত এক বছরে) উৎপাদিত দ্রব্য ও সেবার মোট মূল্যমানকে সে দেশের জাতীয় আয় বলে। 

দ্রব্য বলতে বিভিন্ন প্রকার শস্য, পোশাক, যন্ত্রপাতি সহ অন্যান্য দৃশ্যমান পণ্যকে বোঝায়, যেগুলোর বিনিময় আছে। অন্যদিকে সেবারও বিনিময় আছে, তবে সেবা অদৃশ্য পণ্য। যেমন- উকিলের ওকালতি দিয়ে আইনত সেবাপ্রদান, ব্যাংকারের ব্যাংকিং সেবা প্রদান ইত্যাদি।

জাতীয় আয় থেকেই একটি দেশের অর্থনৈতিক অবস্থা ও জনগণের জীবনধারণের মান সম্বন্ধে একটা ধারণা পাওয়া যায়। এতে করে সে দেশের অর্থনৈতিক পরিকল্পনা তৈরী করার কাজটিও করা যায়। কারণ, জাতীয় আয়ই বলে কোথায় কোথায় কাজ করলে দেশের অর্থনীতি সামনের দিকে যাবে।

একটি দেশের জাতীয় আয় বের করা সহজ কথা না। এর জন্য বিভিন্ন ধারণা আছে। যেমন- জিডিপি(Gross Domestic Product) , জিএনপি (Gross National Product) , এনএনপি (Net National Product) ইত্যাদি।  এর মধ্যে জিডিপি বেচারাকে নিয়েই একটু বেশী শোরগোল শোনা যায়। কাকাড্ডার অর্থনীতি সিরিজে আজকের আলোচনা এই জিডিপিকে নিয়েই।

একটি নির্দিষ্ট সময়ে, একটি দেশে উৎপাদিত সকল চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবার বাজার মূল্য কে সে দেশের জিডিপি বলে।

  জিডিপির বাংলা হলো- স্থুল দেশজ উৎপাদন।

চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা কি বস্তু সেটা পরিষ্কার করা খুব জরুরী। ধরি, একটি দেশে ১০০ কুইন্টাল ধান উৎপাদিত হয়। সে ধান থেকে চাল, চিড়া, খই ইত্যাদি তৈরী হয়। তাই জিডিপি পরিমাপের সময় চাল, চিড়া ও খই এর বাজার মূল্য হিসেব করতে হবে। আর বাজার মূল্য বলতেও সেই চূড়ান্ত মূল্যকেই বোঝানো হয়। অর্থাৎ, যে দামে আমরা দোকান থেকে চাল কিনি। 

যেভাবে জিডিপি হিসাব করা হয়

এখন জিডিপি হিসেব করতে দুই রকম পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। এরা হলো- আয় পদ্ধতি (Income Approach)ব্যয় পদ্ধতি (Expenditure Approach)। এখানে আয় আর ব্যয় সব সময় সমান হবে। কেননা, আমি যখন দুই টাকা খরচ করে মুদি দোকান থেকে একটা চকলেট কিনি, তখন মুদি দোকানীর দুই টাকা আয় তৈরী হয়। এজন্যই জিডিপি পরিমাপের দুইটি পদ্ধতি রয়েছে। একে, দেশজ উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ অর্থাৎ মূলধন, ভূমি, শ্রম ও সংগঠনের মাধ্যমে মোট আয়ের পরিমাণ। অন্যটি, দেশের অভ্যন্তরে উৎপাদিত চূড়ান্ত দ্রব্য ও সেবা কিনতে মোট ব্যয়ের পরিমাণ।

আয় পদ্ধতি বা Income Approach – এ জিডিপি হলো উৎপাদনের মৌলিক উপকরণ (Factors of Production)–  মূলধন(Capital), ভূমি (Land),  শ্রম (Labor), সংগঠন(Enterprise) থেকে প্রাপ্ত আয়ের (যথাক্রমে সুদ, খাজনা, মজুরী ও মুনাফা) সমষ্টি।

জিডিপি= সুদ+ খাজনা+ মজুরী+ মুনাফা

আর ব্যয় পদ্ধতি বা Expenditure Approach -এ জিডিপি হলো মোট ব্যয়। এর চারটি উপাদান হলো-

  • ভোগ (Consumption)
  • বিনিয়োগ (Investment)
  • সরকারি ব্যয় (Government Purchases)
  • নিট রপ্তানি (Net Export)

অর্থাৎ,

জিডিপি= ভোগ+ বিনিয়োগ+ সরকারি ব্যয়+ নিট রপ্তানি

দেশের মোট রপ্তানি থেকে মোট আমদানি বাদ দিলে নিট রপ্তানি পাওয়া যায়। অন্যদিকে, ভোগ হলো গৃহস্থালি(Household) কর্তৃক সেবা ও দ্রব্যের জন্য মোট ব্যয়। বিনিয়োগ হচ্ছে বিভিন্ন মূলধন উপাদানের সমষ্টি। আর সরকারি ব্যয় হলো সরকার কর্তৃক বিভিন্ন সেবা ও পণ্যের ক্রয়। সরকারি চাকুরীজীবীদের বেতন-ভাতা প্রদানও সরকারের ব্যয়ের অন্তর্ভূক্ত।

জিডিপির পরিমাপে কিছু জিনিস হিসাবে আসে না। যেমন- মূলধনে লাভ-ক্ষতি, মাধ্যমিক পণ্য ও সেবা, বিনামূল্যে প্রদত্ত পণ্য ও সেবা, অনৈতিক উপায়ে আয় ও ব্যয় ইত্যাদি। কোনো দ্রব্য বা সেবার ডাবল কাউন্টিং, লেনদেনহীন সেবাকে জিডিপির বাইরে রাখতেই এগুলোকে হিসেব করা হয় না।

জিডিপির আর কিছু মজার ব্যাপার আছে। যদি দেশে কোনো এক বছরের জিডিপি, আগের বছরের চাইতে বেশী হয় তাহলে দু’টো ব্যাপার ঘটতে পারে। হয়, সে দেশে আগের বছরের তুলনায় বেশী পণ্য উৎপাদন হয়েছে অথবা পণ্যের দাম বেড়ে গেছে। ধরো ২০১৭ সালে ১০০ কুইন্টাল ধান উৎপাদিত হয়েছিলো, ২০১৮ তে হলো ১২০ কুইন্টাল ধান উৎপাদন হয়েছে। এক্ষেত্রে যেমন জিডিপি বাড়বে, তেমনি ২০১৮ তে ধানের দাম কুইন্টাল প্রতি ১০০ টাকা করে বেড়ে গেলেও জিডিপি বাড়বে। তাই অর্থনীতিবিদেরা একটা ধ্রুবক দাম ধরে নিয়ে জিডিপি পরিমাপ করেন। একে প্রকৃত জিডিপি (Real GDP) বলে। আর স্বাভাবিক গণনায় যে জিডিপি নির্ণয় করা হয় তাকে নামেমাত্র জিডিপি (Nominal GDP) বলে।

মাথাপিছু জিডিপি

এবার আসি মাথাপিছু জিডিপিতে। কোনো বছরের জিডিপিকে ঐ বছরের মধ্যকার সময়ের জনসংখ্যা দিয়ে ভাগ করলে মাথাপিছু জিডিপি পাওয়া যায়।

মাথাপিছু জিডিপি= কোনো নির্দিষ্ট বছরের জিডিপি/ ঐ বছরের মধ্যকার সময়ের জনসংখ্যা

এই মাথাপিছু জিডিপি হিসেব করেই উচ্চ-আয়ের দেশ, মধ্য-আয়ের দেশ, নিম্ন আয়ের দেশ পরিমাপ করা হয়।  ইদানিংকালে, মাথাপিছু জিডিপিতে বাংলাদেশ বেশ এগিয়ে গেছে। জাতিসংঘের হিসেব অনুযায়ী ২০১৭ সালে বাংলাদেশের নমিনাল (নামেমাত্র) জিডিপি ১৩৫৫ মার্কিন ডলার। যা বিশ্বের মধ্যে ১৫২ তম।[1]

 

জিডিপিই তবে সব!

উপরের আলোচনা থেকে একটা জিনিস পরিষ্কার যে, দেশের অভ্যন্তরে টাকার লেনদেন যত বাড়বে জিডিপি ততোই বাড়বে। আমরা যতো বাসার বাইরে বের হবো, রেস্টুরেন্টে খাবো ততো বেশী টাকার লেনদেন হবে, ততো বেশী জিডিপি বাড়বে। 

জিডিপি দিয়েই নির্ধারণ করা হয় কোন দেশের অর্থনীতির কি অবস্থা।
জিডিপিই কি তবে সব?

শুরুতে আমরা বলেছিলাম যে, জিডিপি দিয়ে একটি দেশের অর্থনীতি কেমন চলছে তা বোঝা যায়। প্রকৃত অর্থে, শুধু জিডিপি বাড়লেই যে দেশের অবস্থা ভা লো হয়, বৈষম্য কমে যায় তা না। কারণ, লেনদেন বাড়লেই জিডিপি বাড়ে। ফি বছর একই রাস্তা কাটাকুটি করলেও লেনদেন বাড়ে, বাচ্চাদের খেলার মাঠ দখল করে বিল্ডিং বানালে লেনদেন বাড়ে,  বিভিন্ন স্থাপনা তৈরী তে বিশাল অঙ্কের টাকা দূর্নীতি হলেও লেনদেন বাড়ে। অর্থাৎ, জিডিপিও বাড়ে। [2]

তাই পৃথিবীর বড় বড় সব অর্থনৈতিক সংস্থা নড়েচড়ে বসেছে। জিডিপির পাশাপাশি কোনো দেশের সার্বিক অবস্থা সম্পর্কে জানতে পরিবেশ, স্বাস্থ্য, আইনের শাসন, বৈষম্যের পরিমাণ ইত্যাদি মাপকাঠিকেও বিবেচনা করছে। 

 

রেফারেন্সঃ

[1] List of countries by GDP – Wikipedia

[2] উন্নয়ন, দুর্নীতি ও জিডিপি: একসঙ্গে বাড়ার রহস্য কী? – মাহা মির্জা – প্রথমআলো – ৩ এপ্রিল ২০১৮

[3] Principles of Macroeconomics – N. Gregory Mankiw

[4] Secondary Economics for Class 9-10 – Edited by Dr. M.M Akash – NCTB

লেখকঃ শিক্ষার্থী, ফিন্যান্স বিভাগ, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়।  

Leave a Comment