বসন্তের টিকা

বসন্ত ছিলো একসময়ের মহামারী রোগ। ইউরোপের বড় বড় নগর-বন্দর, গ্রামে শত শত মানুষ প্রতিদিন আক্রান্ত হতো এই রোগে। তখন লন্ডনের ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার গাইয়ের বাঁট থেকে আবিষ্কার করেন বসন্তের প্রতিষেধক। নতুনদের কাছে বিজ্ঞানকে জনপ্রিয় করতে বিখ্যাত বিজ্ঞান লেখক সুধাংশু পাত্রের লেখা কাকাড্ডায়। 

 

তখন লন্ডন শহরে বসন্ত মহামারীরূপে আত্মপ্রকাশ করেছে। ডাঃ এডওয়ার্ড জেনার নামে জনৈক দরদী ও মরমী চিকিৎসক চিকিৎসার জন্য ঘুরে বেড়ান কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রে ব্যররথতা বরণ করেন। বসন্তের প্রতিষেধক জানা না থাকায় মনে মনে হা-হুতাশ করেন আর প্রত্যক্ষ করেন প্রতিদিন শত শত মানুষকে বসন্তের শিকার হতে।
ডাঃ জেনার সেই অতি ভয়ঙ্কর ও বীভৎস পরিবেশে একেবারে দিশেহারা হয়ে উঠলেন যেন। রাত দিন শুধু ভাবেন-ভাবেন আর ভাবেন। কেমন করে বসন্তের হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করা যায়!এক গোয়ালিনী প্রতিদিন সকালে জেনারকে দুধ দিয়ে যেত। একদিন হঠাৎ তার হাতের দিকে দৃষ্টি পড়ায় জেনার একটু বিস্মিত হলেন। গোয়ালিনীর হাতে ফোস্কা উঠে শুকে যাওয়ার মত এক ধরণের দাগ। তখনই তার মনে এলো, শহরের এত মানুষের বসন্ত হচ্ছে অথচ এই গোয়ালিনীর বসন্ত হচ্ছে না কেন? সে কী ঐ দাগটা থাকার জন্য?

তৎক্ষনাৎ আর এক ভদ্রমহিলার কথাও মনে পড়লো তাঁর! সেই ভদ্রমহিলাটির হাতেও দেখেছিলেন অনুরূপ একটি দাগ এবং বহু বসন্ত রোগীর মধ্যে থাকলেও তাঁকে বসন্ত আক্রমণ করতে পারেনি।

জেনার কৌতূহলী হয়ে গোয়ালিনীকে জিজ্ঞাসা করলেন- তোমার হাতের আঙ্গুলে ফোস্কা পড়ার  মতো দাগটা কিসের বলতে পারো?

গোয়ালিনী তাচ্ছিল্যের সুরে বললো- ও কিছু না। গোয়ালাদের হাতে এমন দাগ প্রায় সবারই আছে। প্রথমে একটা ফোস্কার মত উঠে, পুঁজ হয়, তারপর শুকে গেলে রেখে যায় এ ধরণের একটি দাগ।

কী ভেবে ডাক্তার জিজ্ঞাসা করলেন- যাদের হাতে ঐ দাগ আছে, তাদের বসন্ত হয়নি?

গোয়ালিনী বললো- না।

ডাক্তার কথায় কথায় আরো জানতে পারলেন, মাঝে মাঝে গাইর বাঁটে বিশেষ একধরণের ঘা হয়ে পুঁজ হয়। দুধ দুইতে গেলে সেখানকার পুঁজ হাতে লেগে যায় এবং কয়েকদিন পরে হাতেও গাইর বাঁটের অনুরূপ ফোস্কা উঠে।

সারাদিন ও সারারাত ধরে ঐ ফোস্কার ওঠার কথা ভাবলেন জেনার। তাঁর ধারণা হলো, ঐ ফোস্কার সাথে বসন্ত হওয়া বা না হওয়া নির্ভর করছে। পরদিন সকালে গোয়ালিনী পুনরায় এলে ডাঃ জেনার তাকে অনুরোধ করে বললেন- তুমি তোমাদের খাটালে গাইয়ের বাঁটে ফোস্কা ওঠাটা আমাকে একবার দেখাও না!

গোয়ালিনী হেসে বললে- সে কী আর সব সময় উঠে থাকে! তবে যখনই উঠবে তখনই আপনাকে ডেকে নিয়ে যাবো।

অপেক্ষা করলেন জেনার। একদিন গোয়ালিনী এসে জানালো, খাটালের একটা গাইর বাটে সবে ফোস্কা উঠেছে। ইচ্ছা করলে তিনি দেখে আসতে পারেন।

একরাশ আগ্রহ নিয়ে ছুটে গেলেন ডাক্তার। খাটালে গিয়ে দেখলেন, গোয়ালিনীর কথাই ঠিক। বাঁটটা একটু ভালোভাবে পরীক্ষা করতে আরও বিস্মিত হলেন ডাক্তার। ঠিক যেন একটা বসন্তের গুঁটি ঢলঢল করছে। জেনার অনেক ভেবে সেই বাঁট থেকে কিছু পুঁজ সংগ্রহ করে ফিরে এলেন বাসায়।

ডাক্তারের বাসায় টুকিটাকি কাজকর্ম করার জন্য থাকতো এক কিশোর।  ছেলেটার স্বভাব খুবই ভালো। ডাক্তার যেমন ওকে পিতার স্নেহ দিয়ে আগলে রেখেছিলেন তেমনই কিশোরটির ডাক্তার ছাড়া আর কাউকে জানতো না। ডাক্তারের ওপর অগাধ বিশ্বাস ছিলো তার। ডাক্তার যখন ঐ পুঁজকে কোন সুস্থ দেহে প্রবেশ করিয়ে পরীক্ষার কথা চিন্তা করছিলেন তখন ঐ ছেলেটিই স্বেচ্ছায় এগিয়ে এলো। ডাক্তার প্রথমত দ্বিধা করলেও শেষে ঐ কিশোরটির কথায় সম্মত হলেন এবং তার বাহুতে সেই পুঁজের কিছু অংশ প্রয়োগ করলেন।

কয়েকদিন পরে কিশোরটির গায়ে এলো ভয়ানক জ্বর। আর পুঁজ যেখানে প্রবেশ করানো হয়েছিল সেখানে দেখা দিল বসন্তের গুঁটির মত একটা গুঁটি। কিশোরটির অবশ্য কোন ক্ষতি হলো না। কয়েকদিন পরে আপনা হতে জ্বর ছেড়ে গেল এবং গুটিটি শুকিয়ে একটা স্থায়ী দাগ রেখে গেল।

আসল পরীক্ষাটি এখনও বাকি। কিশোরের গায়ে প্রয়োগ করতে হবে তীব্র বসন্তের বীজ। ডাক্তার এবার খুবই ইতস্ততঃ করতে লাগলেন। অথচ কিশোরটি সাহস হারালো না। সেই প্ররোচিত করলো ডাক্তারকে এবং সাহসও দিল। আর ডাক্তার সত্যই একদিন তার দেহে প্রবেশ করিয়ে দিলেন রোগীর দেহ থেকে সংগ্রহ করা মারাত্মক বসন্তের তীব্র হলাহল। 

ডাক্তার দুরুদুরু বুলে অপেক্ষা করতে লাগলেন এবং পক্ষীমাতার মতো আগলে রইলেন কিশোরটিকে। প্রচন্ড ভয়ে রাতে ঘুমাতেও পারলেন না কয়েকটা দিন। 

ধীরে ধীরে রোগ আক্রমণের সম্ভাব্য দিনগুলি অতিক্রান্ত হয়ে গেল। কিন্তু বালকটির বসন্ত হলো না। এতদিনে স্বস্তির নিশ্বাস ফেললেন ডাক্তার। বুঝতে পারলেন, গো-বসন্তের বীজ সীমিতভাবে সুস্থ দেহে প্রবেশ করালে শরীর বসন্ত রোগের প্রতিষেধক ক্ষমতা লাভ করে। 

সেই প্রথম বসন্তের ভয়াবহতা দূরীকরণের জন্য মানুষের হাতে আসে ব্রহ্মাস্ত্ররূপে টিকা দেওয়ার পদ্ধতি। যদিও জেনারের আমলে পদ্ধতিটি আদৌ জনপ্রিয় হয়ে উঠতে পারেনি। পরবর্তীকালে জীবাণুবিশেষজ্ঞদের হাতে পড়ায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে নতুন এক সম্ভাবনার দ্বার খুলে গেছে। 

 

  • সুধাংশু পাত্রের একশত বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের কাহিনী থেকে। 

Leave a Comment